Skip to main content

Ridge Bangla

ম্যানহাটান প্রকল্প: এক গোপন অস্ত্রযুদ্ধের ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ‘ম্যানহাটান প্রকল্প’ ছিল সরকারিভাবে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের এক গোপন উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল নাৎসি বাহিনীর আগেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করা। ১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের উপর এই বোমা প্রয়োগ কেবল যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে দেয়নি, সেই সাথে এটি ছিল বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনার একটি। এর মাধ্যমে ঘটে পারমাণবিক যুগের সূচনা।

পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা

১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে জার্মান বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক বিভাজন বা ফিশন আবিষ্কার করেন। হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত পদার্থবিদ লিও সিলার্ড তখনই উপলব্ধি করেন, নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন ব্যবহার করে এমন এক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব, যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ধ্বংস আনতে পারে।

১৯৩৯ সালের আগস্টে সিলার্ড এক চিঠি লেখে স্বাক্ষরের জন্য পাঠান আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে। এই চিঠিতে আইনস্টাইন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টকে সতর্ক করেন, নাৎসি জার্মানি দ্বারা শিগগিরই এক অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা তৈরি হতে পারে। এই হুঁশিয়ারির প্রেক্ষিতে রুজভেল্ট ১৯৩৯ সালের ২১ অক্টোবর “অ্যাডভাইজরি কমিটি অন ইউরেনিয়াম” গঠন করেন।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে জাপানি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়। যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু উপদেষ্টা কমিটি বিশ্বাস করতে শুরু করে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই পারমাণবিক বোমা নির্মাণ এবং প্রয়োগ সম্ভব। এই উদ্দেশ্য সফল করতে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ ম্যানহাটান ইঞ্জিনিয়ার ডিস্ট্রিক্ট গঠন করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল লেসলি গ্রোভস। প্রকল্পটি জুড়ে কয়েক লাখ মানুষ কাজ করলেও, পুরো ব্যাপারটি ছিল গভীর গোপনীয়তায় আচ্ছাদিত।

দুই পথের সম্ভাবনা

বিজ্ঞানীরা পরমাণু বোমা তৈরির দুটি সম্ভাব্য পথ কল্পনা করেছিলেন। প্রথমটি ছিল ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা, যা স্বাভাবিকভাবে পাওয়া ইউরেনিয়ামের মধ্যে গড়ে এক শতাংশেরও কম। দ্বিতীয় পথটি ছিল প্লুটোনিয়াম ব্যবহার, যা ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক চুল্লিতে তৈরি করা সম্ভব।

উভয় পথেই প্রয়োজন ছিল জটিল ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তি। ফলে নিশ্চিত সাফল্যের নিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার তাগিদে উভয় পথেই একযোগে কাজ শুরু হয়। এর ফলে গড়ে ওঠে তিনটি প্রধান কেন্দ্র। এই তিনটির বাইরেও দেশে ও বিদেশে অসংখ্য ছোট ছোট সাইটে চলতে থাকে গবেষণা ও নির্মাণকাজ।

তিন কেন্দ্রের কার্যক্রম

ম্যানহাটান প্রকল্পের সূচনায়, মার্কিন সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পস সারাদেশে খুঁজে বেড়ায় এমন তিনটি প্রত্যন্ত এলাকা, যা বিশেষ কিছু কৌশলগত শর্ত পূরণে সক্ষম। ১৯৪২ সালের সেকেন্ড ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট-এর অধীনে সরকারের ইমিনেন্ট ডোমেইন আইনের মাধ্যমে এসব জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। এতে করে স্থানচ্যুত হয় আদিবাসী গোষ্ঠী, কৃষক সম্প্রদায়, ও সাধারণ গৃহস্থরা। অনেককে মাত্র ৩০ দিনের নোটিশে নিজেদের বসতি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়।

এই তিনটি কেন্দ্র ছিল

ওক রিজ, টেনেসি

টেনেসির ওক রিজে গড়ে তোলা হয় প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শিল্প কমপ্লেক্স। এখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য চালানো হয় তিনটি ভিন্ন প্রযুক্তির সমান্তরাল পরীক্ষা। একইসঙ্গে এখানে নির্মিত হয় একটি পরীক্ষামূলক পারমাণবিক চুল্লি এবং রাসায়নিক বিভাজন কেন্দ্র। একসময় এই স্থানটি ম্যানহাটান প্রকল্পের সদর দফতর হয়ে ওঠে।

হ্যানফোর্ড, ওয়াশিংটন

ওক রিজে প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের প্রাথমিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার মাত্র ছয় মাস পর, ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ডে তৈরি করা হয় বিশাল এক শিল্প অঞ্চল। ওখানে পূর্ণমাত্রার চুল্লি, রসায়ন বিশ্লেষণ কেন্দ্র ও জ্বালানি প্রস্তুতকারক কারখানা গড়ে ওঠে।

লস আলামোস, নিউ মেক্সিকো

তবে কেবল উপাদান থাকলেই তো বোমা তৈরি হয় না। সেই উপাদানের নির্দিষ্ট গঠন, আকার, ও বিস্ফোরণ ত্বরণের জন্য প্রয়োজন হয় নিখুঁত গণনা ও নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা। ১৯৪৩ সালের শুরুতে জেনারেল লেসলি গ্রোভস নিউ মেক্সিকোর উত্তরে পারাজিতো মালভূমিতে স্থাপন করেন লস আলামোস ল্যাবরেটরি নামে এক গোপন গবেষণাগার, যার নেতৃত্বে ছিলেন রবার্ট ওপেনহাইমার।

ইউরেনিয়াম-ভিত্তিক বোমার জন্য গান-টাইপ ম্যাকানিজম উপযুক্ত মনে হলেও, ১৯৪৪ সালে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এই কৌশল প্লুটোনিয়ামের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হবে। ফলে তারা নতুন ও অত্যন্ত জটিল ‘ইমপ্লুসন’ পদ্ধতির দিকে এগিয়ে যান।

এই পদ্ধতি কার্যকর কি না, তা যাচাই করতে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর দক্ষিণে ট্রিনিটি সাইটে প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরীক্ষা চালানো হয়, যা ইতিহাসে পরিচিত হয়ে ওঠে “ট্রিনিটি টেস্ট” নামে। সেই বিস্ফোরণ দিয়েই শুরু হয় মানব ইতিহাসের পারমাণবিক যুগ।

পরমাণু বোমা নিক্ষেপ ও তার পরিণতি

মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ম্যানহাটান প্রকল্প তার লক্ষ্যে পৌঁছায়। তবে প্রকল্প যতই বাস্তব প্রয়োগের দিকে এগোতে থাকে, ততই নৈতিক প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে কিছু বিজ্ঞানীর মনে, যাঁরা প্রকল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু যুদ্ধশেষের তাড়না ছিল প্রবল। নীতি-নৈতিকতা নয়, তৎকালীন সময়ের বিজ্ঞানী ও রাজনীতিকরা অধিক মনোযোগ দিচ্ছিলেন কীভাবে দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটানো যায় সেই লক্ষ্যে। ১৯৪৫ সালের ৮ মে জার্মানির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

৬ আগস্ট, ১৯৪৫। যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা শহরে নিক্ষেপ করে ইউরেনিয়ামভিত্তিক লিটল বয় পরমাণু বোমা। তিন দিন পর, ৯ আগস্ট, নাগাসাকিতে ফেলা হয় প্লুটোনিয়ামভিত্তিক ফ্যাট ম্যান বোমাটি। এর ঠিক আগের দিন, ৮ আগস্ট, জাপানকে চমকে দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

এই দুই ঘটনা জাপানের সম্রাট হিরোহিতোকে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিতে বাধ্য করে। ২ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিসমাপ্তি ঘটে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের।

ম্যানহাটান প্রকল্পের উত্তরাধিকার

এই ম্যানহাটান প্রকল্প ভবিষ্যতের স্নায়ু যুদ্ধের রূপরেখা নির্ধারণ করে দিয়ে যায়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠা তিনটি শহর আজও সক্রিয় ও সমৃদ্ধ। বর্তমানে এই স্থানগুলো ‘ম্যানহাটান প্রকল্প ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্ক’-এর অংশ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

পারমাণবিক বিজ্ঞানের উন্নয়ন যেমন জ্বালানি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে আশাব্যঞ্জক দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি এনেছে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি, ও পরিবেশগত সংকট। ম্যানহাটান প্রকল্পের উত্তরাধিকার সেই অর্থে এক দ্বিধান্বিত বাস্তবতা। এর বৈজ্ঞানিক সাফল্য এবং নৈতিক প্রশ্নাবলি আজও সমানভাবে মানবমনে প্রশ্ন তোলে: প্রযুক্তি কি সত্যিই মুক্তি দেয়, নাকি নির্মাণ করে নতুন শৃঙ্খল?

তথ্যসূত্র
  1. Manhattan Project – National Park Service
  2. Manhattan Project Background Information and Preservation Work
  3. What Was the Manhattan Project? | Scientific American
  4. Manhattan Project – Encyclopedia of the History of Science
  5. The Manhattan Project and the Invention of the Atomic Bomb
This post was viewed: 48

আরো পড়ুন