Skip to main content

Ridge Bangla

নেপাল-চীন সীমান্তে যেভাবে নেমে এলো ভয়াবহ বিপর্যয়

হিমালয়ের উঁচু পাহাড়ে মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘটনার সূত্রপাত হয়। নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছের একটি হিমবাহের নিচের বিশাল অংশ আচমকা ভেঙে পড়ে। কয়েক হাজার মিটার উচ্চতা থেকে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের সেই বিপুল ভর প্রচণ্ড গতিতে নিচের উপত্যকার দিকে ছুটতে থাকে।

এরপর যা ঘটে, তা আর শুধু পাহাড়ধসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরফ ও পাথরের ধস নদীতে নেমে ভয়াবহ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি করে। সেই স্রোত কয়েক মিনিটের মধ্যে আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়। পাহাড়ি নদীপথ ধরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ছুটে যায় পানি, কাদা, পাথর ও বরফের মিশ্রণ। পথে ভাসিয়ে নেয় মানুষ, ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র।

২৬ আগস্টের এই বিপর্যয় নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকাকে কার্যত তছনছ করে দিয়েছে। কিন্তু এত বড় দুর্যোগের সূত্রপাত কীভাবে হলো?

শুরুটা লাংটাং লিরুংয়ের হিমবাহে

স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর দিকের একটি খাড়া হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়েছে। ঘটনার মাত্র দুদিন আগের স্যাটেলাইট ছবিতে যে বরফের অংশটি অক্ষত দেখা যাচ্ছিল, ২৬ আগস্টের ছবিতে সেখানে স্পষ্ট বিশাল ভাঙন দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, ধসের উৎস ছিল প্রায় ৭,২০০ মিটার উঁচু লাংটাং লিরুংয়ের একটি হিমবাহঘেরা খাড়া পাহাড়ি অংশ। ভেঙে যাওয়া বরফ ও পাথর কয়েকশ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে।

লাংটাং লিরুং; Image source: Wikimedia Commons
লাংটাং লিরুং; Image source: Wikimedia Commons

প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণেই হয়তো হিমবাহটি ভেঙেছে। কারণ ওই সময় ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে শক্তিশালী কম্পনের সংকেত ধরা পড়েছিল। ঘটনাটি প্রথমে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবেও নথিভুক্ত করা হয়।

কিন্তু পরে ইউএসজিএস জানায়, কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। বরং বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ ভেঙে নিচে পড়ার সময় যে বিপুল শক্তি তৈরি হয়েছিল, সেটিই ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি করেছিল। সেই কম্পনের শক্তি ছিল প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান।

বরফের ধস যেভাবে কাদার সুনামির রূপ নিলো

হিমবাহের অংশ ভেঙে যাওয়ার পর বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে আসে লেন্দে খোলা নদীর দিকে। কিন্তু নিচে নামার সময় ধসটি শুধু নিজের সঙ্গে থাকা বরফ ও পাথরই নিয়ে আসেনি।

পাহাড়ি ঢাল থেকে আরও মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিয়ে আসে সেটি। বরফের একটি অংশ গলে পানি তৈরি করে। এরপর নদীর পানিও এর সঙ্গে মিশে যায়। ফলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ একটি বরফ-পাথরের ধস ভয়াবহ ‘ডেব্রিস ফ্লো’ বা কাদা, পানি ও পাথরের অতি দ্রুতগামী স্রোতে পরিণত হয়।

Image source: Niranjan Shrestha/AP Photo
Image source: Niranjan Shrestha/AP Photo

চীনা সরকারি ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেংয়ের হিসাবে, কোনো কোনো জায়গায় এই স্রোতের গতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত ছিল।

এত দ্রুতগতির স্রোতের সামনে থাকা মানুষের পক্ষে পরিস্থিতি বুঝে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ধ্বংসাবশেষের মূল স্রোতই ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকা পেরিয়ে যায়। পরে এর সঙ্গে তৈরি হওয়া আকস্মিক বন্যা আরও বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ে।

সীমান্তে প্রথম বড় আঘাত

ধস নেমে প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেসবের মধ্যে ছিল নেপাল-চীন সীমান্তের গাইরং বন্দর ও অভিবাসন এলাকা।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে বাদামি রঙের বিশাল কাদার স্রোত এগিয়ে আসছে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্রোত পুরো এলাকা গ্রাস করে ফেলে।

Image source: Pariyar/NurPhoto/Getty Images
Image source: Pariyar/NurPhoto/Getty Images

নেপাল ও চীনের অভিবাসন ও শুল্ক ভবনগুলো লেন্দে খোলা ও ভোটে কোশি নদীর সংযোগস্থলের কাছেই অবস্থিত। দুই দেশের সীমান্ত স্থাপনাকে যুক্ত করেছে একটি সেতু। ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা ধ্বংসস্রোতের প্রায় সরাসরি পথে পড়ে পুরো সীমান্ত এলাকা।

বন্যার পর স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখেছে, ওই এলাকার প্রায় সব ভবনই কোনো না কোনোভাবে ধ্বংসাবশেষের স্রোতের মধ্যে পড়েছিল।

চার হাজার মিটারের বেশি নিচে নামল ধ্বংসস্রোত

বিপর্যয়টির ভয়াবহতা বোঝার জন্য হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। ধসের সূচনা হয়েছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায়। এরপর পানি ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীগুলো ধরে ক্রমাগত নিচে নামতে থাকে।

লেন্দে খোলা থেকে স্রোত প্রবেশ করে ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীব্যবস্থায়। পথে পড়ে তিমুরে, স্যাপ্রু বেসি, হাকুবেসি, বেত্রাবতী, ত্রিশূলী ও দেবীঘাটের মতো এলাকা।

প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে স্রোত যখন আরও নিচু এলাকায় পৌঁছায়, ততক্ষণে উচ্চতার পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ৪,৫০০ মিটার! ইউএসজিএসও জানিয়েছে, ধ্বংসাবশেষ ও বন্যার প্রভাব উৎসস্থল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র বা আইসিমডের তথ্যানুযায়ী, শক্তিশালী স্রোত বিপুল পরিমাণ পানি, পলি ও বড় বড় পাথর বহন করে ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীতে ঢুকে পড়ে। ভাটির গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়!

নদীও বদলে দিয়েছে বন্যা

পাহাড়ি অঞ্চলের আকস্মিক বন্যা সাধারণ বন্যার তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। কারণ এতে শুধু পানিই থাকে না। এর সঙ্গে থাকে বিশাল পাথর, গাছ, কাদা, বালি এবং পাহাড় থেকে ছুটে আসা নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষ।

এসব উপাদান নদীর তলদেশে জমে কোথাও নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে, আবার কোথাও নদীকে পুরনো গতিপথ থেকে সরিয়েও দিতে পারে।

Image source: The Guardian
Image source: The Guardian

এবারও তেমনটাই হয়েছে। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, বহু জায়গায় নদীপথের আকার বদলে গেছে। তিমুরে, স্যাপ্রু বেসি, বেত্রাবতী ও দেবীঘাটের মতো এলাকায় শত শত ভবন ধ্বংসাবশেষের বিস্তৃত এলাকার মধ্যে পড়ে যায়।

রেড ক্রস জানিয়েছে, কোনো কোনো জায়গায় পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়েছে। সড়ক ও সেতু চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বহু জনগোষ্ঠী বাইরের এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

কেন ভাঙল হিমবাহ?

এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকেই সরাসরি এই একটি হিমবাহ ধসের একমাত্র কারণ বলা ঠিক হবে না। পাহাড়ের ঢাল, পাথরের গঠন, বরফের ভেতরের ফাটল, পানি প্রবেশ, তাপমাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনসহ একাধিক বিষয় এমন ধসের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উষ্ণায়ন যে হিমালয়ের পরিবেশকে ক্রমেই অস্থিতিশীল করে তুলছে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ বাড়ছে।

আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানী সাইমন কক্সের ভাষ্যমতে, তাপমাত্রা বাড়লে পাহাড়ের খাড়া ঢালে থাকা বরফের সহায়তা কমে যেতে পারে। গলিত পানির পরিমাণ বাড়ে। একই সঙ্গে বরফ জমা, গলা এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে পাথরের স্তরও দুর্বল হতে পারে। ফলে কোনো কোনো এলাকায় বড় ধরনের ধসের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে হাজার হাজার হিমবাহ রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এসব হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে শুধু হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিই নয়, বরফধস, ভূমিধস, হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যা এবং একের পর এক দুর্যোগ তৈরির ঝুঁকিও বাড়ছে।

নেপাল-চীন সীমান্তের এবারের বিপর্যয় তারই ভয়াবহ একটি উদাহরণ। একটি হিমবাহের মাত্র একটি অংশ ভেঙে পড়েছিল পাহাড়ের ওপর থেকে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই ধস নদীতে মিশে এমন এক ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দেয়, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত।

ফিচার ইমেজ: ABC News

তথ্যসূত্র

  1. How a glacier collapse triggered a deadly landslide and flooding along the Nepal-China border – 27 August 2026 – Reuters
  2. 2026 Nepal Debris Avalanche and Flash Flood – 17 August 2026 – U.S. Geological Survey (USGS)
  3. Nepal-China border flood and glacier-collapse seismic event – August 26, 2026 – U.S. Geological Survey (USGS)
  4. Standing in solidarity with the tragic Kyirong-Rasuwa flash flood victims – 27 August 2026 – International Centre for Integrated Mountain Development (ICIMOD)
  5. Climate change boosted risk of devastating Himalayan flood, experts say – August 27, 2026 – Reuters
  6. Nepal, China warn of fresh flood risks with lakes threatening to burst – August 27, 2026 – Reuters
  7. Over 90,000 affected by Himalayan landslide, Red Cross says – August 28, 2026 – Reuters –
  8. Himalayan glacier collapse highlights growing risks from warming mountains – August 2026 – Associated Press
This post was viewed: 31

আরো পড়ুন