Skip to main content

Ridge Bangla

মেটার জন্য কি খেলার নিয়ম বদলে যাচ্ছে?

মাত্র চার দিন চলেছিল বিচার। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে বিশাল অঙ্কের সমঝোতায় গেল ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা। অভিযোগ ছিল, শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখার মতো ফিচার ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি, এবং এসব ব্যবস্থার সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে ব্যবহারকারীদের যথেষ্ট সুরক্ষা দেয়নি।

সমঝোতার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অর্থের অঙ্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মেটার দেওয়া কিছু ছাড়। যুক্তরাষ্ট্রে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে সময়সীমা, রাতে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বাধা এবং আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করতে রাজি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি বড় একটি আইনি সাফল্য। মেটার জন্যও ফল পুরোপুরি বিপর্যয়কর বলা যাবে না। কোম্পানিকে বিচারের শেষ পর্যন্ত যেতে হয়নি, প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকেও সাক্ষ্য দিতে হয়নি। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিশ্ব নিয়ে।

কেনিয়া থেকে নেদারল্যান্ডস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মিয়ানমার, বিভিন্ন জায়গায় মেটার অ্যালগরিদম, কনটেন্ট মডারেশন ও প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতা কি সেসব লড়াইয়ের গতিপথ বদলে দেবে?

কী মেনে নিয়েছে মেটা?

এই মামলার কেন্দ্রে ছিল শিশু-কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের আর্কিটেকচার। অভিযোগকারীদের বক্তব্য ছিল, ইনফিনিট স্ক্রল, নোটিফিকেশন, পার্সোনালাইজড সাজেশন এবং এনগেজমেন্ট বাড়ানোর বিভিন্ন কৌশল এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা যত বেশি সম্ভব সময় প্ল্যাটফর্মে থাকেন।

সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য দিনে দুই ঘণ্টার ব্যবহারসীমাসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ চালু করা হবে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাও থাকবে। বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কিছু ক্ষেত্রে লাইক সংখ্যা গোপন রাখা এবং কিশোরদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ডিফল্টভাবে চালু রাখার মতো পদক্ষেপও রয়েছে। এই চুক্তির মেয়াদ ১০ বছর।

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কি অন্য দেশেও প্রভাব ফেলবে?

আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার শর্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য দেশে কার্যকর হবে না। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

যখন মেটা একটি বড় মার্কেটে শিশু-কিশোরদের জন্য দুই ঘণ্টার সীমা বা রাতের ব্যবহার বন্ধ করার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু করতে রাজি হয়েছে, তখন অন্য দেশের সরকারও প্রশ্ন তুলতে পারে, একই সুরক্ষা তাদের নাগরিকদের জন্য কেন থাকবে না।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধের দিকে এগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা তাদের আরও কঠোর ব্যবস্থা চাওয়ার যুক্তিও দিতে পারে।

তবে এখানেই একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সমঝোতা মূলত শিশুদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় ও কিছু ফিচার নিয়ন্ত্রণ করছে। মেটার মূল রিকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, সেই মৌলিক প্রশ্নটির সমাধান এটি করেনি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অ্যালগরিদম

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে একজন ব্যবহারকারী কী দেখবেন, তার বড় অংশই নির্ধারণ করে মেটার রিকমেন্ডেশন সিস্টেম। ব্যবহারকারী কোনো বিষয়ে আগ্রহ দেখালে অ্যালগরিদম সেই আগ্রহের সঙ্গে মিল আছে এমন আরও কনটেন্ট সামনে আনে। ব্যবসায়িক দিক থেকে এর উদ্দেশ্য ব্যবহারকারীকে প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় রাখা, যাতে তাকে আরও বিজ্ঞাপন দেখানো যায়।

কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ, একই ব্যবস্থা ক্ষতিকর বা চরমপন্থী কনটেন্টকেও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ইথিওপিয়ার অধ্যাপক মেয়ারেগ আমারে আব্রাহার ঘটনা এই বিতর্কের অন্যতম গুরুতর উদাহরণ হিসেবে এসেছে।

২০২১ সালে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তাকে নিজ বাড়ির বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার ছেলে আব্রাহাম মেয়ারেগের অভিযোগ, হত্যার আগে তার বাবার ছবি, ঠিকানা এবং তাকে হত্যার আহ্বানসংবলিত পোস্ট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিবার সেসব পোস্ট সরাতে অনুরোধ করলেও যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

২০২২ সালে কেনিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন আব্রাহাম মেয়ারেগসহ কয়েকজন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ফেসবুকের অ্যালগরিদম সহিংসতা ও বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট ছড়াতে ভূমিকা রেখেছে এবং আফ্রিকায় পর্যাপ্ত কনটেন্ট মডারেশন ছিল না। মেটা কেনিয়ার আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি তুললেও ২০২৫ সালে হাইকোর্ট মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার পথ খুলে দেয়।

মামলার মূল অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

ইউরোপেও চাপ বাড়ছে

মেটার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় চাপের একটি আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় কমিশন প্রাথমিকভাবে জানায়, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ‘অ্যাডিক্টিভ ডিজাইন’ ইউরোপের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (Digital Services Act বা DSA) লঙ্ঘন করছে বলে তাদের তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তের লক্ষ্য ইনফিনিট স্ক্রল, অটোপ্লে, পুশ নোটিফিকেশন এবং অত্যন্ত পার্সোনালাইজড রিকমেন্ডেশন সিস্টেম। কমিশনের প্রাথমিক মূল্যায়ন হলো, এসব ব্যবস্থার কারণে ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে শিশু ও ঝুঁকিতে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, মেটা তা যথেষ্ট কার্যকরভাবে মোকাবিলা করেনি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে যে বিষয়টি অঙ্গরাজ্যগুলোর মামলার কেন্দ্রে ছিল, ইউরোপেও প্রায় একই প্রযুক্তিগত ডিজাইন এখন নিয়ন্ত্রকদের নজরে রয়েছে।

এ কারণে মার্কিন সমঝোতা ইউরোপীয় কমিশনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে মেটা যদি নির্দিষ্ট ফিচার পরিবর্তন করতে পারে, ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকেরা আরও বিস্তৃত পরিবর্তন চাইতে পারেন।

নেদারল্যান্ডসে ভিন্ন ধরনের অভিযোগ

নেদারল্যান্ডসে বিতর্ক আবার আলাদা। সেখানে রিপ্রো আনসেন্সর্ড, বিটস অব ফ্রিডম এবং কয়েকটি কুইয়ার সংগঠন মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।

তাদের অভিযোগ- ইনস্টাগ্রামে কুইয়ার, যৌনস্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক ও প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট হঠাৎ বন্ধ বা রিচ লিমিটেড করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীরা স্পষ্ট কারণ জানতে পারেননি বা কার্যকরভাবে আপিলের সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই বিরোধ একটি ভিন্ন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে: মেটার স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থা কি সব ধরনের ব্যবহারকারীর প্রতি সমান আচরণ করে?

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে রিপ্রো আনসেন্সর্ডের নির্বাহী পরিচালক মার্থা দিমিত্রাতু বলেছেন, ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতার আলোচনা শুধু অ্যাডিক্টিভ ডিজাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অ্যালগরিদম, বৈষম্যমূলক মডারেশন এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণও এর আওতায় আসতে হবে।

কেন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের মামলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ?

মেটা একটি মার্কিন কোম্পানি হলেও ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের প্রভাব জাতীয় সীমানায় আটকে নেই। কোটি কোটি মানুষের রাজনৈতিক আলোচনা, সংবাদ গ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগ এবং ব্যবসার একটি বড় অংশ এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

ফলে মৌলিক প্রশ্ন শুধু একটি কোম্পানি শিশুদের কত ঘণ্টা অ্যাপে এনগেজড রাখছে, তা না। প্রশ্ন হলো, একটি বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির অ্যালগরিদম যখন বিশ্বজুড়ে মানুষের দেখা তথ্য নির্ধারণ করছে, তখন তার জবাবদিহির কাঠামো কেমন হবে?

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সমঝোতা অন্তত একটি বিষয় দেখিয়েছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্ল্যাটফর্মের ডিজাইন অপরিবর্তনীয় না। আদালত ও সরকার যথেষ্ট চাপ তৈরি করতে পারলে কোম্পানিকে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা সম্ভব।

কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে যুদ্ধক্ষেত্রে ঘৃণামূলক কনটেন্ট ছড়ানো, কোনো জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দমন করা কিংবা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার মতো জটিল সমস্যার সমাধান দিনে দুই ঘণ্টার ব্যবহারসীমায় হবে না।

ফিচার ইমেজ: Kyle Grillot/Bloomberg/ Getty Images

তথ্যসূত্র

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন