Ridge Bangla

জব্বারের বলীখেলা: চট্টগ্রামের প্রাণের ঐতিহ্য

বাংলার লোকজ সংস্কৃতির ইতিহাসে চট্টগ্রামের নাম উচ্চারিত হয় গৌরবের সঙ্গে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামীণ জনপদে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত বলীখেলা, গরুর লড়াই, ঘোড়দৌড়, নৌকাবাইচ এখনো বাঙালির প্রাণের বিনোদন। এই অঞ্চলের মাটিতে যেমন জন্ম নিয়েছে অসংখ্য বীরপুরুষ, তেমনি এখানেই বিকশিত হয়েছে বলী বা কুস্তির মতো খেলা। তারই উজ্জ্বল নিদর্শন হলো জব্বারের বলীখেলা। প্রতি বছর বৈশাখের ১২ তারিখে চট্টগ্রামের লালদিঘীর ময়দানে অনুষ্ঠিত এই খেলা বয়ে আনে উৎসব, ঐক্য ও আনন্দের আবহ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষের সমাগমে লালদিঘী হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা।

চট্টগ্রামকে বলি খেলার দীপ্ত পরিবেশ হিসেবে পরিচিত করা যায়। এ খেলায় অংশ নেওয়া কুস্তিগীরদের বলা হয় ‘বলী’। এখানে, কর্ণফুলী নদী ও সাঙ্গু নদীর মধ্যবর্তী গ্রামগুলোতে বহু যুগ ধরেই “মল্ল” উপাধিধারি সুদৃঢ় দেহভঙ্গি ও বলিষ্ঠ শরীরধারী পুরুষদের বসবাস ছিল। তারা ওই অঞ্চলের প্রতিভাবান যুবকদের বলি খেলার প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করত। প্রতিটি গ্রাম-পরিবারে একজন বলি গৌরবের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতেন। রাজা-বাদশা ও জমিদারদের নজরও পড়তো তাদের দিকে। এই কারণে বলিখেলা অনেক ক্ষেত্রেই বংশগত পেশার মতো পরিনত হয়েছিল।

চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার-সওদাগর ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সংগঠক। তিনি বুঝেছিলেন, যুবসমাজের দৈহিক শক্তি ও সাহসিকতা দেশপ্রেমের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেই ভাবনায় তিনি ১৯০৯ সালে (১৩১৬ বঙ্গাব্দের ১২ বৈশাখ) নগরীর লালদিঘী ময়দানে বলিখেলার আয়োজন করেন। পরে তার নামানুসারে খেলার নাম হয় ‘জব্বারের বলীখেলা’।

এরপর ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের রেশ ধরে এ অঞ্চলে বলিখেলার পরিবেশ আরও শক্ত হয়। ব্রিটিশ সরকার তার এই উদ্যোগে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি দিতে চাইলেও, তিনি তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, তার লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার প্রেরণা ছড়িয়ে দেওয়া, ব্রিটিশ তোষণ নয়।

প্রথমদিকে খেলা সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে এটি রূপ নেয় বিশাল লোকউৎসবে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে চট্টগ্রাম ছাড়াও আরাকান (বর্তমান মিয়ানমার) অঞ্চল থেকেও খ্যাতনামা বলীরা এসে অংশগ্রহণ করতেন। সত্তরের দশকের পর থেকে এটি জাতীয় পরিসরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, একবার ফ্রান্স থেকে দুজন বিদেশি কুস্তিগীরও এখানে অংশগ্রহণ করেন।

খেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর স্থানীয় বলীরা মাসখানেক আগে থেকেই লালদিঘীর আশপাশে অবস্থান নিতেন। জব্বার মিয়ার বাড়ির বিশাল বৈঠকখানাই তখন তাদের আবাস ও প্রশিক্ষণস্থল হয়ে উঠত। সেখানে তারা কসরত করতেন, নিয়মিত অনুশীলন চালাতেন এবং বলী প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে যখন প্রথমবারের মতো বলীখেলার সম্প্রচার শুরু হয়, তখনই এটি শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যমের কভারেজ এবং পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনের কারণে দেশজুড়ে মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও অনলাইন নিউজপোর্টালের মাধ্যমে জব্বারের বলীখেলা এখন সারা বিশ্বের বাঙালিদের কাছেও পৌঁছে গেছে।

বর্তমানে প্রতি বছর চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে দেশের এই সবচেয়ে বড় কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ‘আব্দুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখী মেলা কমিটি’-র উদ্যোগে প্রতি বাংলা সনের ১২ বৈশাখে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ৫০ জন বলী এতে অংশ নেন। প্রাথমিক পর্ব শেষে সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় সেই বছরের চ্যাম্পিয়ন।

প্রতিযোগিতা চলাকালীন লালদিঘী ময়দান হয়ে ওঠে উৎসবের নগরী। চারদিকে দর্শকের ঢল, তুমুল উৎসাহ আর করতালিতে মুখরিত থাকে পরিবেশ। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কক্সবাজারের দিদার বলী টানা বারোবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজের নাম স্থায়ীভাবে খোদাই করেছেন এই ঐতিহ্যের ইতিহাসে।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দোকানিরা এখানে পসরা সাজিয়ে বসেন। কেউ শামিয়ানার নিচে, কেউ খোলা আকাশের তলে বিক্রি করেন কুটিরশিল্পের নানা নিদর্শন। নকশীকাঁথা, শীতলপাটি, বেতের চালুনি, মাছ ধরার চাঁই, হাতপাখা ইত্যাদি সামগ্রী পাওয়া যায় এখানে। পাশাপাশি রুটি বেলার বেলুনি, পিঠার ছাঁচ, ফুলদানি, কলস, মাটির খেলনা ও মটকাও দেখা যায়। স্থানীয় গৃহিণীরা এই সুযোগে গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেন।

মেলায় থাকে নাগরদোলা, সার্কাস, বাচ্চাদের খেলার কসরত। বিক্রির জন্য সাজানো থাকে মুরালি, বাঁশি, মাটির ঘোড়া, মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু ও মৌসুমি ফল ইত্যাদি। শিশুরা আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে পড়ে, বাবা-মায়ের কাছে বায়না ধরে খেলনা বা মিষ্টি কেনার জন্য। পরিবারগুলো পরস্পরের বাড়িতে মেলার বিশেষ খাবার বিলিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। এমনকি দূরে থাকা মেয়েরাও বাবার ঘরে নাইওর হয়ে আসে, আর ফেরার সময় নিয়ে যায় মেলার স্মৃতি ও উপহার।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলীখেলার জৌলুস কিছুটা ম্লান হয়েছে। আধুনিক বিনোদনের আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফলে ঐতিহ্যবাহী কুস্তির চর্চা সীমিত হয়ে এসেছে। তবুও কয়েকটি পরিবার এখনো বংশানুক্রমে এই খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যের হারিয়ে না যায়।

সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু চট্টগ্রামের মাটি এখনো সেই ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে রেখেছে। প্রতি বছর নতুন বলীরা পুরোনোদের উত্তরাধিকার বহন করে মাঠে নামে, আর লালদিঘী ময়দান আবারও সাক্ষী হয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার।

Source:
  1. ১১০ বছর আগে যেমন ছিল জব্বারের বলীখেলা – প্রথম আলো
  2. লোকসংস্কৃতির মেলা, জব্বারের বলীখেলা – দেশ রূপান্তর
  3. চট্টগ্রামে জব্বারের বলীখেলা শুরু, লাখো মানুষের সমাগম – আজকের পত্রিকা
  4. বাংলাদেশের খেলাধুলা, রশীদ হায়দার, বাংলা একাডেমী
This post was viewed: 46

আরো পড়ুন