মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটি যেন তিনি আল্লাহর জন্য কুরবানি করেন। ইব্রাহিম (আ.) তার পুত্রকে কুরবানি করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার এই ত্যাগে খুশি হয়ে যান। তাঁর পুত্রের বদলে একটি দুম্বা কুরবানি হয়ে যায়।
ইব্রাহিম (আ.) এর এই অতুলনীয় ত্যাগকে মহিমান্বিত করতেই পরবর্তীতে সামর্থ্যবান মুসলমানদের উপর কুরবানির বিধান আরোপ করা হয়। বছরের নির্দিষ্ট দিনে মুসলমানদের মধ্যে যারা সামর্থ্যবান, তারা পশু কুরবানি করেন। এই পশুর মাংসে যেমন তাদের তাদের অধিকার থাকে, তেমনই প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের গরীব-দুঃখীদেরও অধিকার থাকে এই মাংসে। কুরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা বাংলাদেশের একটি গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব হলেও এটি একইসাথে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ঘটনা।
প্রতি বছর এই ঈদ জাতীয় আর্থিক লেনদেনে ভালো গতি সঞ্চার করে। অনুমান করা হয়, এর পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ আমাদের কুরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার বেশ বড়। এই ঈদ গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিশেষভাবে চাঙ্গা করে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করে, যেটি আমাদের জিডিপিতে বেশ ভূমিকা রাখে।
তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বেকারত্ব যেখানে আমাদের একটি বড় সমস্যা, সেখানে এ ধরনের অস্থায়ী কর্মসংস্থান জোরালো ভূমিকা রাখে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যেসব খাত বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পশুপালন ও পশু বাণিজ্য, চামড়া শিল্প, রেমিট্যান্স প্রবাহ, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভোগ্যপণ্য এবং অনানুষ্ঠানিক খাত। তবে এই বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুতর পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তথ্যের অস্বচ্ছতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা গ্রামীণ কৃষকদের শোষণ, পশু পরিবহনে অদক্ষতা ও দুর্নীতি, চামড়া শিল্পের সংকট ইত্যাদি।
ঈদুল আজহা মূলত পশু কুরবানির ধর্মীয় বিধানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ২০২৪ সালে কোরবানির জন্য প্রায় ১ কোটি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ পশু বিশেষভাবে এই উৎসবের জন্য লালন-পালন করা হয়েছিল। এ বছরের হিসাব অনুযায়ী ৯১ লাখেরও বেশি পশু কুরবানি করা হয়েছে। ঈদের সময় পশুর উল্লেখযোগ্য চাহিদা গ্রামীণ অর্থনীতিকে গভীরভাবে উজ্জীবিত করে। এটি প্রায় ১৭ লাখ খামারের জন্য সরাসরি আয়ের সুযোগ তৈরি করে, যার বেশিরভাগই ছোট আকারের এবং পারিবারিক মালিকানাধীন। এই খামারগুলো গ্রামীণ অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খামারিরা সারা বছর ধরে বিশেষভাবে এই উৎসবের জন্য পশু লালন-পালনে নিয়োজিত থাকেন। কুরবানি ঈদের মাধ্যমে তাদের হাতে যে অর্থ আসে, সেটির একটি অংশ তারা দৈনন্দিন খরচের জন্য রেখে দেন। আর বাকিটুকু পরের ঈদের জন্য বিনিয়োগ করেন।
দ্রুত পরিবর্তনশীল ভোগ্যপণ্য খাত ঈদের সময় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। মাংস রান্না এবং অতিথি আপ্যায়নের কারণে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে অ্যান্টিসেপটিক, হ্যান্ড ওয়াশ এবং টিস্যু পণ্যের বিক্রি সাধারণত প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। রান্নার তেল, ঘি, মসলা এবং কোমল পানীয়ের বিক্রি সাধারণত ২০-৩৩% বৃদ্ধি পায় এই কয়েকদিনে।
সুগন্ধি চাল এবং খাবার তৈরির বিভিন্ন মশলার বিক্রি আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা কখনও ৪০% পর্যন্ত বেড়ে থাকে। মাংস ও অন্যান্য খাবার প্রস্তুতকরণের জন্য অপরিহার্য গরম মসলার বাজারে এই সময়ে বিশাল এক জোয়ার সৃষ্টি হয়। খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিধি ছাড়াও অন্যান্য খাতও উপকৃত হয়। পশুর মাংস দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার জন্য ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটর একটি অপরিহার্য জিনিস। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আনুমানিক তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার ফ্রিজ বিক্রি হয়, যা উৎপাদন ও খুচরা খাতকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। কুরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে লবণ শিল্পে উৎপাদন ও চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। পোশাক শিল্পের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের উৎস এটি। শিল্প আয়ের দিক থেকে ২%, রপ্তানিতে ৩.৮% এবং জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ০.৬০% অবদান রাখে। চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কুরবানির ঈদ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। দেশের বার্ষিক সরবরাহের প্রায় ৫০-৬০% মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা হয়। চামড়াশিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য এই ঈদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য লবণ অত্যন্ত দরকারি একটি জিনিস। কুরবানি ঈদের সময় লবণশিল্পেও বিশাল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়।
কুরবানির ঈদ রেমিটেন্স প্রবাহেও দারুণ ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে। প্রবাসীরা ঈদ উপলক্ষে দেশে টাকা পাঠান। এ বছরের মে মাসে ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রেমিটেন্স প্রবাহের মাইলফলক। একইভাবে এ বছরের মার্চ মাসেও ৩.২৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ পরিমাণের রেকর্ড ভেঙেছে। সামগ্রিকভাবে, গত বছরের জুলাই থেকে এউ বছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে মোট রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৭.৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮.৭% বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
তবে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও ঈদের সময় দীর্ঘ ব্যাংক ছুটি (যেমন- ঈদুল আজহার জন্য ১০ দিনের ব্যাংক বন্ধ) অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিকে অর্থ পাঠাতে গুরুতর অসুবিধায় পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। আনুষ্ঠানিক রেমিটেন্স চ্যানেলে এই সমস্যা প্রায়শই প্রবাসীদের ‘হুন্ডি’র মতো অনানুষ্ঠানিক এবং অবৈধ পদ্ধতির উপর নির্ভর করতে বাধ্য করে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে এই ধরনের দীর্ঘ ছুটি মাসিক রেমিটেন্সের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
কুরবানির ঈদ অর্থনীতির জন্য বিশাল একটি ঘটনা। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ যেহেতু মুসলমান, তাই দুই ঈদই অর্থনীতিতে বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনে। সরকারের পক্ষ থেকে আরও কিছু উদ্যোগ নেয়া গেলে সামগ্রিক দিক থেকে অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
১) জাতীয় অর্থনীতিতে কোরবানির প্রভাব
৩) ঈদুল আজহা ও কোরবানির অর্থনীতি