Skip to main content

Ridge Bangla

ডাক্ট টেপ: রণক্ষেত্র থেকে দৈনন্দিন জীবনে

কাপড়ের তৈরি একধরনের আঠালো টেপ। অন্যান্য টেপের থেকে ডাক্ট টেপ বেশি টেকসই হয়। আবার সহজেই ছিড়ে যেকোনো জায়গায় লাগিয়ে দেয়া যায় বলে বহুল ব্যবহৃতও বটে। বিশ্বের অনেক দেশেই ডাক্ট টেপ দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। তবে প্রথম ডাক্ট টেপের প্রচলন হয়েছিলে কেন জানেন? সৈনিকদের গোলাবারুদের বাক্স বেঁধে রাখার জন্য!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেছে তখনকার কথা। রণক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই গুলির প্রয়োজন হতো, আর সেই গুলি সরবরাহ করা হতো বড় বড় বাক্সে। সেই বাক্স সিল করা থাকত মোম আর কাগজের টেপ দিয়ে। দরকার হলে টেপ খুলে সিল ভেঙে তারপর বের করতে হতো গুলি। মাঝে মাঝেই খুব সহজে কাজটা করা যেত না, তখন বাক্স ভাঙতে হতো। এতে চলে যেত ২-৩ মিনিট। যুদ্ধের মধ্যে এই সময়টুকু অনেকসময় জীবনমরণের ফয়সালা করে দিতে পারে।

সৈনিকদের এই অসুবিধা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেলেও নজর এড়ায়নি ছেলেদের চিন্তায় উদ্বিগ্ন এক মায়ের। তার নাম ভেস্টা স্টাড (Vesta Stoudt)। তার দুই ছেলে কাজ করছিল নৌবাহিনীতে। তিনি নিজেও কাজ করতেন ইলিনয়ের গোলাবারুদের কারখানা, গ্রিন রিভার অর্ডন্যান্সে (Green River Ordnance)। যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর আগে গোলাবারুদের বাক্স ঠিকভাবে সিল করা হয়েছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতেন তিনি। এসব বাক্স সিল করতে প্রথমে কাগজের টেপ মেরে এরপর তা তরল মোমে ডুবানো হতো।

নিয়ম ছিল কাগজের যে টেপ বাক্সে লাগানো হবে তার একটা অংশ বেরিয়ে থাকবে, যাতে সেটা ধরে টান দিলেই টেপ খুলে আসে। এরপর সিল ভেঙে সৈন্যরা গুলি বের করতে পারবে। ভেরা লক্ষ্য করলেন- যখন টেপ লাগিয়ে বাক্স মোমে ডোবানো হচ্ছে, তখন অনেক সময় বেরিয়ে থাকা টেপের এই অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে টেপ খোলার উপায় থাকত না। তখন গোলাগুলির মধ্যে একজন সৈনিককে জানবাজি রেখে মনোনিবেশ করতে হতো বাক্স যেকোনো প্রকারে ভাঙার জন্য।

সৈনিকদের জন্য দুশ্চিন্তা অনুভব করলেন ভেস্টা। কে জানে কতজনের জীবন এভাবে নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে! তিনি চিন্তা করলেন- কাগজের বদলে কাপড়ের টেপ ব্যবহার করার। কাপড় স্বাভাবিকভাবেই বেশি মজবুত হবে, ফলে মোমে ডুবালেও বেরিয়ে থাকা অংশ নষ্ট হবার ভয় থাকবে না। তিনি ঊর্ধ্বতনদের তার আইডিয়ার কথা জানালেন, তবে কোনো লাভ হল না। ভেস্টা দমে না গিয়ে ১৯৪৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের কাছে চিঠি লিখলেন। কীভাবে বাক্স সিল করার চিন্তা করছেন সেটা বোঝাতে অপটু হাতে একটা ছবিও এঁকে দিলেন তিনি। ছেলেদের জীবন বাঁচাতে পারে এই পদ্ধতি, রুজভেল্টের কাছে আর্তি জানালেন ভেস্টা।

কতজনেই তো প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি পাঠাতো, তবে ভেস্টার চিঠিটা ঠিকই তার হাতে পড়েছিল। এবং রুজভেল্ট তার আইডিয়ায় যে প্রভাবিত হয়েছিলেন তা বোঝা যায় যখন তিনি বিষয়টি সামরিক উৎপাদন বোর্ডের কাছে প্রেরণ করেন। সেখান থেকে মার্চে ভেস্টাকে জানিয়ে দেয়া হয় সরকার তার পদ্ধতিটি নিয়ে কাজ করছে।

ভেরার পরিকল্পনামতো টেপ তৈরি দায়িত্ব পায় জনসন অ্যান্ড জনসনের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান, পার্মাসেল (Permacel)। সার্জিক্যাল টেপ বানিয়ে ইতোমধ্যেই প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল পার্মাসেল। বাজারে বেশ কিছু কাপড়ের টেপ পাওয়া যেত, তবে পার্মাসেল নতুন করে কিছু তৈরির চিন্তা করে। তাদের বৈজ্ঞানিকেরা গুলির বাক্সের জন্য ভেরার দেখানো পথে বিশেষ একরকম টেপ ডিজাইন করেন। কাপড়ের একপাশে পলিইথাইলিন এবং আরেকপাশে রাবারের আঠা লাগিয়ে তৈরি হল এই টেপ। যে কাপড় তারা ব্যবহার করেছিলেন তার নাম ছিল কটন ডাক (cotton duck)। এই ডাক মানে কিন্তু হাঁস নয়, বরং ডাচ শব্দ ডয়েক (doek) থেকে উদ্ভূত। ডয়েক নাবিকদের কাপড়ে ব্যবহৃত একপ্রকার ক্যানভাস এবং কটন ডাকের একটি উপকরণ। সফল পরীক্ষা শেষে ভেস্টাকে জানানো হল সাফল্যের কথা।

ডাক্ট টেপের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল যত শক্ত করে চাপ দিয়ে লাগানো হবে, তত শক্তভাবে এঁটে থাকবে (pressure-sensitive)। এই টেপ ব্যবহারের ফলে গোলাবারুদের বাক্স খোলা সহজ হয়ে যায় সৈন্যদের জন্য। এই টেপের নানা বৈশিষ্ট্যের জন্য অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করতে থাকে সৈনিকেরা। জুতা থেকে শুরু করে ক্যাম্পের আসবাব মেরামতের জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ডাক্ট টেপ। আহত সৈনিকদের ক্ষতস্থান বন্ধ করতেও ডাক্ট টেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের মুখে ডাক টেপ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটা। কেন সেটা বলা কঠিন। অনেকের মতে, কটন ডাক দিয়ে তৈরি বলে, আবার কেউ কেউ বলেন এই টেপের ওপর পানি গড়িয়ে পড়তে দেখলে সৈনিকদের নাকি মনে হতো হাঁসের পিঠ বেয়ে পানি পড়ার কথা।

যুদ্ধ শেষ হলেও ডাক্ট টেপের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। সাধারণ মার্কিন নাগরিকরাও এর বহুবিধ ব্যবহার খুঁজে পান। বাসাবাড়ির নানারকম মেরামতে দেদারসে বিক্রি হতে থাকে ডাক্ট টেপ। পঞ্চাশের দশকে নির্মাণ শিল্পের উপকরণ হিসেবে নাম লেখায় ডাক্ট টেপ। গরম বা ঠাণ্ডা বাতাসের পাইপ ডাক্ট টেপ দিয়ে প্যাঁচানোর চল আরম্ভ হয়। তখন থেকেই ডাক থেকে এর নাম হয়ে যায় ডাক্ট টেপ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় শত্রুর গুলিতে হেলিকপ্টারের পাখায় তৈরি ফুটো সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পাইলটেরা ডাক্ট টেপ কাজে লাগায়। ষাট-সত্তরের দশকে নাসার কাজকর্মেও স্থান করে নেয় ডাক্ট টেপ। প্রতিটি মহাকাশ অভিযানে মালামালের তালিকায় ডাক্ট টেপ থাকতই যাতে ছোটখাট মেরামত করতে অসুবিধে না হয়। ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো থার্টিন মিশনে নভোচারীদের প্রাণ বাঁচানোর কৃতিত্ব দেয়া হয় এই টেপকে।

কী হয়েছিল অ্যাপোলো অভিযানে? এর উদ্দেশ্য ছিল চাঁদে নামা, কিন্তু অভিযানের একপর্যায়ে অক্সিজেন ট্যাংক ফেটে যায়। মেরামতের জন্য ব্যবহৃত জিনিসগুলোর একটি ছিল ডাক্ট টেপ। দু’বছর পর অ্যাপোলো সেভেন্টিনের নভোচারীরা ডাক্ট টেপ দিয়ে লুনার রোভার বা চাঁদের গাড়ির ভাঙা একটি অংশ জোড়া লাগান।

অন্তত আটটি কোম্পানি এখন ডাক্ট টেপ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশেও বহুল প্রচলিত এই টেপ। তবে ব্যবহারের দিক থেকে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের থেকে এগিয়ে নেই কেউ। মিসৌরি অঙ্গরাজ্যকে তো বলাই হয় পৃথিবীর ডাক্ট টেপ রাজধানী।

কিন্তু ভেস্টা স্টাডের কী হলো? ভেস্টার অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তাকে চিঠি দিয়েছিলেন। শিকাগো ট্রিবিউন সংবাদপত্র তাকে পুরস্কৃত করে আলাদাভাবে। ১৯৬৬ সালে মারা যান তিনি। তবে সৈনিকদের জীবন বাঁচাতে তার অবদান ভুলে যায়নি কেউ।

Reference
This post was viewed: 47

আরো পড়ুন