Skip to main content

Ridge Bangla

চীনের রোবট গেমস আমাদের যা শেখাল

বেইজিংয়ের ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে পাঁচ দিনের এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছে। সেখানে প্রতিযোগীদের কেউই মানুষ ছিল না, বরং সবাই ছিল হিউম্যানয়েড রোবট বা মানবসদৃশ রোবট। কেউ ১০০ মিটার রেসে দৌড়েছে, কেউ বক্সিং করেছে, কেউ ফুটবল খেলেছে, কেউ ভার তুলেছে, আবার কেউ ছোট একটি বস্তু টেবিল থেকে তুলতে গিয়েই ঝামেলায় পড়েছে!

দৃশ্যগুলো কখনো চমক জাগানিয়া, কখনো হাস্যকর, আবার কখনো কিছুটা অস্বস্তিকরও ছিল। দ্রুতগতিতে ছুটতে থাকা একটি রোবট ফিনিশ লাইন পার হওয়ার পর দেয়ালে গিয়ে আছড়ে পড়েছে। কোনোটি ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আবার মার্শাল আর্টের লড়াইয়ে কিছু রোবট এমন নিখুঁত কিক দেখিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।

এই বৈপরীত্যই সম্ভবত ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। চীন হিউম্যানয়েড রোবটের শরীরকে দ্রুতই শক্তিশালী ও আরও দক্ষ করে তুলছে, কিন্তু মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা, অভিযোজনক্ষমতা ও সূক্ষ্ম কাজ করার দক্ষতার জায়গায় এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

পাঁচ দিনে দুই হাজারের বেশি রোবট

২২ থেকে ২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ২য় ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে ৬৬৬টি দল এবং ২ হাজারের বেশি রোবট অংশ নেয়। ১৬টি দেশের দল অংশ নিলেও অধিকাংশ রোবট ও দলই ছিল চীনের। প্রতিযোগিতা মোট ৫১টি বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে দৌড়, মার্শাল আর্ট ও নাচের মতো দর্শকপ্রিয় ইভেন্টের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, গৃহস্থালি কাজ, জরুরি উদ্ধার ও লজিস্টিকসের মতো বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত পরীক্ষাও ছিল।

চীনের জন্য এই আয়োজন শুধু একটি প্রযুক্তি প্রদর্শনীই ছিল না। এটি দেশটির দ্রুত বর্ধনশীল হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পের সক্ষমতা মাপার একটি পরীক্ষাগারও ছিল বলা যায়। এবং সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায়, এই ইন্ডাস্ট্রির পরিধি ইতিমধ্যেই বিশাল হয়ে গেছে।

Image source: Achmad Ibrahim/AP
Achmad Ibrahim/AP

MERICS (Mercator Institute for China Studies)-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে তৈরি হিউম্যানয়েড রোবটের প্রায় ৯০ শতাংশই চীনে উৎপাদিত হয়েছিল। দেশটি ওই বছর প্রায় ১২,৮০০ হিউম্যানয়েড তৈরি করে। তবে একই সময়ে ইন্ডাস্ট্রির জন্য রোবট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৬ হাজারের মতো। অর্থাৎ আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও হিউম্যানয়েড রোবট এখনো সামগ্রিক রোবট শিল্পের বেশ ছোট একটি অংশ।

সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য: ১০০ মিটারে ৮.৬৪ সেকেন্ড

এবারের গেমসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায়।

তিয়াঙ্গং আল্ট্রা (Tiangong Ultra) নামের একটি হিউম্যানয়েড রোবট ফাইনালে ১০০ মিটার শেষ করে ৮.৬৪ সেকেন্ডে। সময়টি দ্রুততম মানব উসাইন বোল্টের ৯.৫৮ সেকেন্ডের বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও কম। আগের বছরের প্রতিযোগিতায় একই ধরনের রোবটের সেরা টাইমিং ছিল ২১.৫০ সেকেন্ড। এক বছরের ব্যবধানে এই উন্নতি রোবোটিক হার্ডওয়্যারের অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। রোবটের ৮.৬৪ সেকেন্ডকে মানুষের অ্যাথলেটিক বিশ্বরেকর্ডের সরাসরি সমতুল্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রোবটের শরীর, মোটর, ওজন বণ্টন এবং শক্তি ব্যবস্থাপনা মানুষের মতো শারীরবৃত্তীয় সীমাবদ্ধতার অধীনে নেই।

তবু এই অর্জন প্রযুক্তিগতভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুতগতির মোটর, উন্নত ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, শক্তিশালী অ্যাকচুয়েটর এবং লিকুইড কুলিং ব্যবস্থার কারণে আগের তুলনায় রোবটগুলো অনেক বেশি শক্তি উৎপাদন করতে পারছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দাঁড়িয়ে লাফ দেওয়ার সর্বোচ্চ উচ্চতাও গত বছরের ০.৯৬ মিটার থেকে বেড়ে ৩.৪০ মিটারে পৌঁছেছে!

দ্রুত দৌড়ানো আর ‘বুদ্ধিমান’ হওয়া এক জিনিস নয়

গেমসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। একটি রোবট দ্রুত দৌড়াতে পারে, আরেকটি ভালো বক্সিং করতে পারে। কিন্তু একই রোবটকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জটিল কাজ দিলে সে প্রায়ই সমস্যায় পড়ে যায়। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা এসব রোবটকে এখনো মূলত ‘স্পেশালিস্ট’ হিসেবে দেখছেন, ‘জেনারেলিস্ট’ হিসেবে না।

দৌড়ানোর জন্য তৈরি একটি রোবটের অ্যালগরিদম, শরীরের কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য অপটিমাইজড হতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে একটি রোবটকে একই দিনে দরজা খুলতে, কাপ তুলতে, মানুষের নির্দেশ বুঝতে, বাধা এড়িয়ে চলতে এবং নতুন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এই সাধারণ অভিযোজনক্ষমতাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাধা।

Image source: Lintao Zhang / Getty
Image source: Lintao Zhang / Getty

দ্য গার্ডিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, এআই মডেলগুলো এখনো বাস্তব পৃথিবীর সম্পূর্ণ জটিলতা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে প্রক্রিয়া করতে পারে না। ফলে একটি রোবট দ্রুত দৌড়াতে পারে বা ভালো ঘুষি মারতে পারে, কিন্তু দুটো কাজেই সমান দক্ষ হওয়া কঠিন।

আসল পরীক্ষা ছোট কাজে

গেমসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিওগুলো ছিল দৌড়, কিক বা বক্সিংয়ের। অথচ প্রযুক্তিগত দিক থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিযোগিতা নিয়ে তেমন একটা আলোচনাই হয়নি।

রোবটদের বোতল খোলা, বাক্স থেকে জিনিস বের করা, ছোট বস্তু চিমটা দিয়ে ধরা, নির্দিষ্ট পরিমাণ গুঁড়া মাপা, যন্ত্রাংশ জোড়া দেওয়া কিংবা পানি ঢালার মতো কাজ করতে হয়েছিল। এই সাধারণ কাজগুলোতেই অনেক রোবটকে বেশি সমস্যায় পড়তে দেখা গেছে। একটি ছোট জিনিস তুলতে রোবটের দীর্ঘ সময় লাগছিল, আবার পানি ঢালতে গিয়ে পানি চারদিকে ছড়িয়ে ফেলছিল।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এই বৈপরীত্যকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় মার্শাল আর্টের দৃশ্যের তুলনায় সূক্ষ্ম হাতের কাজের প্রতিযোগিতা অনেক কম জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অথচ বাস্তব জীবনে রোবটকে কার্যকর করতে হলে এই ধরনের ‘ডেক্সটারিটি’ বা সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণই বেশি দরকার।

কারখানায় এখনো মানুষকে সরাতে পারছে না রোবট

চীনের হিউম্যানয়েড ইন্ডাস্ট্রির বাস্তব অবস্থাও প্রায় একই। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, চীনা রোবটগুলো নাচ, কুংফু বা প্রদর্শনীতে দ্রুত উন্নতি করলেও কারখানার নানা কাজের ক্ষেত্রে এখনো এগুলোর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নির্ভুলতা, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, পরিবেশ বদলালে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া এবং সূক্ষ্ম কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে ব্যবধান রয়ে গেছে এগুলোর।

MERICS-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, চীনের হিউম্যানয়েড রোবটগুলো মূলত সীমিত ও নির্দিষ্ট কাজে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন- পণ্য বহন, সাধারণ যন্ত্রাংশ সাজানো বা গুণগত মান পরীক্ষা করা। অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট একটি হিউম্যানয়েড রোবটের চেয়ে সুলভ মূল্যের, দ্রুততম এবং নির্ভুল।

‘চ্যাটজিপিটি মোমেন্ট’ এখনো আসেনি

রোবট শিল্পে এখন বহুল আলোচিত একটি ধারণা হলো ‘ChatGPT moment’। এটি এমন একটি পর্যায়, যখন হিউম্যানয়েড রোবটও জেনারেটিভ এআইয়ের মতো দ্রুত সাধারণ মানুষের কাজে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে।

চীনের শীর্ষস্থানীয় হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি (Unitree)-এর প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং শিংশিংয়ের মতে, একটি সত্যিকারের সাধারণ রোবট এমন হবে, যাকে শুধু কথা বা লিখিত নির্দেশ দিয়ে একটি অপরিচিত বাড়িতে পাঠালেও সে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সফলভাবে করতে পারবে।

Image source: Pedro Pardo / AFP / Getty
Image source: Pedro Pardo / AFP / Getty

কিন্তু সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো সময় লাগবে। ওয়াংয়ের অনুমান- কয়েক বছরের মধ্যে বড় অগ্রগতি আসতে পারে, আবার পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ে পৌঁছাতে এক দশকও লাগতে পারে। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবটের সবচেয়ে বড় বাধা হার্ডওয়্যার না, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তব পরিবেশ বোঝার সীমাবদ্ধতা।

যেখানে এগিয়ে আছে চীন

রোবটের ‘মস্তিষ্ক’ এখনো সীমিত হলেও এর বডি তৈরির ক্ষেত্রে চীনের কিছু চমৎকার সুবিধা রয়েছে। দেশটির বিশাল ইলেকট্রনিকস, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট সরবরাহব্যবস্থা হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পকেও দ্রুত এগিয়ে দিচ্ছে। মোটর, সেন্সর, ব্যাটারি, গিয়ারবক্স ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে বড় পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকায় দ্রুত প্রোটোটাইপ তৈরি করা এবং খরচ কমানো সহজ হচ্ছে।

২০২৪ সালে শুধু চীনের কারখানাগুলোতেই প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট স্থাপন করা হয়, যা ওই বছরের বৈশ্বিক চাহিদার অর্ধেকের বেশি।

রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং বিপুলসংখ্যক কোম্পানির প্রতিযোগিতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। রয়টার্সের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই চীন রোবট খাতে ২৩ কোটি ডলারের বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় করেছে।

তাহলে গেমসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?

বেইজিংয়ের ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস দেখিয়েছে, হিউম্যানয়েড রোবটের উন্নতি এখন আর শুধু গবেষণাগারের ধীরগতির পরীক্ষার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। দৌড়ানো, লাফানো, ভারসাম্য রাখা এবং শক্তি উৎপাদনের মতো শারীরিক সক্ষমতায় অগ্রগতি খুব দ্রুত হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই গেমস এটাও দেখিয়েছে যে রোবটের দেহ আর রোবটের বুদ্ধিমত্তা একই গতিতে এগোচ্ছে না।

একটি রোবট ১০০ মিটার মানুষের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারে, কিন্তু টেবিল থেকে একটি ছোট বস্তু তুলতে গিয়ে সেটিই হিমশিম খেতে পারে। দর্শককে মুগ্ধ করা এবং কারখানা, হাসপাতাল কিংবা বাড়িতে প্রতিদিন নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করা এক বিষয় নয়।

হিউম্যানয়েড রোবটের আসল অগ্রগতি হবে তখন, যখন একটি রোবট নতুন পরিবেশ বুঝতে পারবে, ভুল থেকে শিখতে পারবে, সূক্ষ্মভাবে জিনিস ধরতে পারবে এবং মানুষের নির্দেশ অনুযায়ী দীর্ঘ সময় নিরাপদে কাজ করতে পারবে। চীনের রোবট গেমস সেই ভবিষ্যতের এক ট্রেইলার দেখিয়েছে। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছে- ফিনিশ লাইন এখনো অনেক দূরে!

ফিচার ইমেজ: evin Frayer/Getty Images

তথ্যসূত্র

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন