ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আভিজাত্য এক বিন্দুতে এসে মিলেছে যে শহরে, তার নাম ঢাকা। আজকের ঢাকা হতে পারে যান্ত্রিক। হতে পারে রসকষহীন। কৃত্রিমতায় ছেয়ে যেতে পারে চারপাশ। কিন্তু, এই ঢাকা একসময় ছিল রূপ-রস-রঙে ভরা। ছিল বাগানের সমাহার। নানা দেশের, নানা জাতের মানুষের বাণিজ্যিক ও বসবাসের অভয়স্থল। আজকের ঢাকা যে রূপে আছে, শতবর্ষ পেরিয়ে তা পেয়েছে নানা রূপান্তরের দেখা। ব্যস্ত পুরান ঢাকা থেকে ঝলমলে হাতিরঝিল কিংবা ফার্মগেট-ধানমন্ডি, জায়গাগুলোর নামেরও আছে ইতিহাস। ঢাকার কিছু জায়গার নামকরণের ইতিহাস অবাক করবে আপনাকেও।
হাতিরঝিল
অধুনা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হাতিরঝিল। শহরের প্রাণকেন্দ্রে হলেও বেশ নিরিবিলি জায়গাটি হয়ে উঠেছে বিকেলের আড্ডার অন্যতম প্রিয়। লেক ধরে হেঁটে চলা, বিশ্রামের জন্য বেঞ্চে বসা, সবুজের সঙ্গে খানিক মিতালি, পরিচ্ছন্ন রাস্তা—যন্ত্রনগরীতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যায় হাতিরঝিলে। বহুকাল আগে মানুষের মতোই জায়গাটি হাতিদের জন্য আনন্দের জায়গা ছিল। হাতি নিয়ে মাহুতরা হাতিরঝিলে যেত। এখানে ছিল বিরাট জলাশয়। পিলখানার হাতিগুলোকে নিয়ে আসা হত গোসল করানোর জন্য। সময়ের পালাবদলে হাতি না থাকলেও জায়গাটি পরিচিতি পায় হাতিরঝিল নামে।
পিলখানা
পিলখানার নাম সবার জানা। নামের পেছনের গল্প জানি? পিল একটি পার্সি শব্দ। যার অর্থ হাতি। হাতি পোষার জন্য মুঘল আমল থেকে ঢাকা ছিল বিখ্যাত। ১৮ শতকের শেষ দিকে হাতিকে ঘিরে চলত জমজমাট বাণিজ্য। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ছিল ব্যবসায়ের নিয়ন্ত্রণ। তারা ত্রিপুরা ও চট্রগ্রাম থেকে বুনো হাতি ধরে এনে প্রশিক্ষণের জন্য পিলখানায় পাঠাত যা ছিল সেই সময় হাতি প্রশিক্ষণের প্রধান স্থান। এভাবেই জায়গার নাম হয়ে যায় পিলখানা।
আরমানিটোলা
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, সতেরো শতকের শেষ দিকে পার্সিয়ান শাহ আব্বাস আর্মেনিয়া দখল করেন। সেই সময় প্রায় চল্লিশ হাজার আর্মেনিয় ব্যবসায়ীকে নির্বাসিত করা হয়। ১৭৮১ সালে নির্বাসিত ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আসেন। ঢাকায় তারা বাণিজ্য শুরু করে। আঠারো শতাব্দীতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন ব্যবসায়ের ঠিকাদার হিসেবে আর্মেনিয়রা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। লবণ ও পোশাক শিল্প এর মধ্যে অন্যতম। ঢাকায় তারা গড়ে তোলে ক্যাথলিক চার্চ, গির্জা। আজকের পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ছিল তাদের বসবাস। আর্মেনিয়দের আবাসস্থলের নাম ক্রমে হয়ে ওঠে আরমানিটোলা।
ধানমন্ডি
ঢাকার অন্যতম অভিজাত অঞ্চল ধানমন্ডি। হালের আধুনিক, অভিজাত এলাকাটি মোগল আমলে ছিল কৃষিপণ্যের বিশাল হাট। বিশেষত ধান। ধানমন্ডি নামের প্রথমটুকু এসেছে ধান থেকেই। কারণ এই এলাকা বেশ বড়সড় হাট বসতো, যেখানে ধান ও অন্যান্য শস্য বিক্রি হতো। মন্ডি একটি উর্দু শব্দ, যার অর্থ বাজার। ধান বাজার থেকেই ধানমন্ডি নামটি এসেছে। ১৯৪৬ সালে ধানমন্ডি ঈদগাহর পেছনে জীর্ণ একটি পুল ছিল। উনিশ শতকের দিকে খালটি শুকিয়ে যেতে শুরু করে এবং হাট হিসেবে ধানমন্ডির গুরুত্ব কমতে লাগে। পরবর্তীতে হাটের জায়গাটি জঙ্গলে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান আমলের শেষ দিক থেকে অভিজাতদের আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে ধানমন্ডি।
গেন্ডারিয়া
ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা গেন্ডারিয়া। পুরান ঢাকার এই জায়গায় একসময় ছিল ধনী লোকের বসবাস। বিখ্যাত গেন্ডারিয়ার নামকরণ নিয়ে দুটি আলাপ প্রচলিত আছে। দুটিই প্রসিদ্ধ। কারও কারও মতে, ধনীদের এলাকা হওয়ায় একে বলা হতো গ্র্যান্ড এরিয়া। স্থানীয়দের মুখে মুখে যা পরে পরিণত হয় গেন্ডারিয়ায়। আবার অনেক ইতিহাসবিদের মতে, জায়গাটিতে প্রচুর আখ বা গেন্ডারি চাষ হতো। আজেকের দয়াগঞ্জ, মীরহাজিরবাগসহ আশপাশের এলাকাজুড়ে গেন্ডারির ফলনি ছিল ব্যাপক। লোকালয় গড়ে ওঠার পর ধীরে ধীরে এটি গেন্ডারিয়া নামে পরিচিত হয়।
ফার্মগেট
আজকের ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকা কোনটি, এমন প্রশ্ন ছুঁড়লে অনেকের উত্তর হবে ফার্মগেট। কেউ কেউ তো ঢাকার রাজধানী হিসেবে ফার্মগেটকে আখ্যা দিয়েছেন। কোচিং থেকে শুরু করে ব্যবসা, পুরো ঢাকার সবদিকে যাওয়ার সুবিধা নিয়ে ফার্মগেট আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছে প্রাণকেন্দ্র। এই প্রাণকেন্দ্রের নামকরণের কেন্দ্রে কী আছে, তা জানেন? মূলত কৃষি উন্নয়ন, কৃষি ও পশুপালন গবেষণার জন্য ব্রিটিশ সরকার এখানে একটি ফার্ম বা খামার তৈরি করেছিল। সেই ফার্মের মূল ফটক বা গেটটি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ফার্মগেট হিসেবে। সেখান থেকে এলাকার নাম হয় ফার্মগেট।
রমনা
যান্ত্রিক ঢাকার কোলে এক টুকরো প্রশান্তির অপর নাম রমনা পার্ক। বিশাল জায়গাজুড়ে যেখানে অবস্থিত পার্কটি, সেই এলাকার নাম যে রমনা, সেটি কারও অজানা নয়। সবুজে ঘেরা রমনারও আছে নামের ইতিহাস। তা নিয়ে আছে ভিন্নমত। অনেকে মনে করেন, এলাকাটির নামকরণ করেছেন মোঘলরা। মোঘলরাই গোড়াপত্তন ঘটান এলাকার, গড়ে তোলেন পার্ক। ফার্সি ভাষা থেকে আসা রমনা শব্দের অর্থ সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর। যারা ভিন্নমতের তারা মনে করেন, রমনার নামকরণের অন্য ইতিহাস রয়েছে। এখানে থাকতেন রমনাথ বাবু নামে এক বিশাল ধনাঢ্য বাবু। তিনি নিজের নামানুসারে তৈরি করেছিলেন রমনা কালী মন্দির। মন্দিরের পাশে ছিল ফুলের বাগান ও পার্ক। সময়ের স্রোতে গোটা এলাকার নাম হয়ে যায় রমনা এবং পার্ক হয়ে যায় রমনা পার্ক।