Skip to main content

Ridge Bangla

কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত দ্বন্দ্ব: উপনিবেশিক মানচিত্রের ছায়ায় আধুনিক উত্তেজনা

একসময় যাদের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক আস্থার প্রতীক, সেই থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া আজ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। মাসের পর মাস ধরে চলা উত্তেজনা অবশেষে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যেখানে কমপক্ষে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে গেছেন ।

গোলাগুলি, রকেট হামলা ও যুদ্ধবিমানের আঘাতে সীমান্ত অঞ্চল রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দুই দেশই সহিংসতার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করছে।

থাইল্যান্ডের এক হাসপাতালের ওপর আঘাতকে থাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সোমসাক থেপসুথিন প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এই সংঘাত, কিভাবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে?

কী ঘটছে?

বৃহস্পতিবার সকালে প্রথম সংঘর্ষের সূচনা হয় থাইল্যান্ডের সুরিন প্রদেশ এবং কম্বোডিয়ার ওদ্দার মিনচেই সীমান্তের কাছে অবস্থিত প্রাচীন তা মুয়েন থম মন্দির এলাকা ঘিরে। উভয়পক্ষের সেনাবাহিনী ভারী গোলাবর্ষণ চালায়, চলে রকেট হামলা। থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই আক্রমণে অন্তত ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন পাঁচ বছরের শিশু। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৪ জন।

প্রত্যুত্তরে থাইল্যান্ড তাদের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করে। ছয়টি বিমানের মধ্যে একটি কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশের পর একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে। থাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, ছয়টি সীমান্ত এলাকায় এখনো সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

কেন এই সংঘাত?

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নতুন নয়। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া দীর্ঘদিন ধরে ৮০০ কিলোমিটারের সীমান্ত নিয়ে বিরোধে জড়িত। এই সীমান্তের উৎস ১৯০৭ সালের একটি মানচিত্র, যা ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে তৈরি হয়েছিল। কম্বোডিয়া এই মানচিত্রের ভিত্তিতে ভূখণ্ড দাবি করলেও থাইল্যান্ড বরাবরই একে ভুল ও অগ্রহণযোগ্য বলে আসছে।

এই বিরোধের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও রক্তক্ষয়ী কেন্দ্র পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ১০০০ বছরের প্রাচীন প্রাহ উইহেয়ার নামক এক হিন্দু মন্দির। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এই মন্দিরের মালিকানা কম্বোডিয়াকে দিলে সেটি থাইল্যান্ডের কাছে এক বিশাল রাজনৈতিক আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয় ।

২০১১ সালে এই অঞ্চল ঘিরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হলে, প্রাণ হারান প্রায় ২০ জন এবং সহস্রাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এরপর আবারও বিষয়টি আদালতে গড়ালে ২০১৩ সালে আদালত পূর্বের রায় বহাল রাখে। তবে এবার কম্বোডিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে নতুনভাবে মামলা করলেও থাইল্যান্ড সে আদালতের এখতিয়ার মানতে অস্বীকৃতি জানায় ৷

মে মাসে দুই দেশের সেনাবাহিনী এক বিতর্কিত এলাকায় সংঘর্ষে জড়ায়, যেখানে উভয় পক্ষই ওই অঞ্চল নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। তৎকালীন সংঘর্ষেও উভয় দেশ একে অপরকে আগ্রাসনের জন্য দায়ী করে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়।

পরে সংঘাত প্রশমনের প্রতিশ্রুতি দিলেও দুই দেশের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা পদক্ষেপ চলতে থাকে। থাইল্যান্ড সীমান্তে জরুরি অবস্থা আরোপ করে, যার ফলে শুধু শিক্ষার্থী, চিকিৎসা রোগী ও অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বৃহস্পতিবার সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা আসে।

অন্যদিকে, কম্বোডিয়া থাই চলচ্চিত্র ও টিভি অনুষ্ঠান সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে, থাই জ্বালানি, ফলমূল ও সবজি আমদানি বন্ধ করে দেয় এবং প্রতিবেশী দেশের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বয়কটের পদক্ষেপ নেয়। মূল বিরোধ ‘এমারাল্ড ট্রায়াঙ্গেল’ নামক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে, যেখানে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও লাওসের সীমান্ত মিলেছে।

থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক অস্থিরতা

সীমান্ত সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন শিনাওয়াত্রাকে ১ জুলাই তার পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়, কারণ তিনি একটি ফোনালাপে কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনকে ‘চাচা” বলে সম্বোধন করেন এবং থাই সামরিক নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। ফোনালাপটি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিবাদ শুরু হয়।

এই ঘটনার জেরে পায়েতংতার্নের দল ‘ফেউ থাই’ এর নেতৃত্বাধীন জোট দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, দ্বিতীয় ‘বৃহত্তম অংশীদার দল ‘ভুমজাইথাই পার্টি’ তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। প্রধানমন্ত্রীর পদে এখন অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে আছেন তার ঘনিষ্ঠ সহচর ও সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই।

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘর্ষ এখন কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নয়, বরং তা একটি আঞ্চলিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসের রক্তাক্ত ছায়া, আধুনিক ভূরাজনীতি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিলতা মিলে এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে প্রয়োজন হবে দুই দেশের সদিচ্ছা, আন্তর্জতিক মধ্যস্থতা এবং সর্বোপরি জনগণের কল্যাণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমাধান, যা অশান্তির নয়, শান্তির বার্তা বহন করবে।

This post was viewed: 42

আরো পড়ুন