Skip to main content

Ridge Bangla

আঙ্কারার যুদ্ধ: উসমানী সাম্রাজ্যের দুর্যোগকাল

এশিয়া মাইনর আর ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস অত্যন্ত ঘটনাবহুল। এই সালতানাত বিখ্যাত সব যুদ্ধজয়ের গৌরবে যেমন উদ্ভাসিত, তেমনি সময়ে সময়ে পরাজয়ের কালো ছায়ার করাল থাবা থেকেও মুক্ত নয়।

সেই তালিকায় আঙ্কারার লড়াই সম্ভবত ওপরেই থাকবে। এটাই একমাত্র সময় যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শত্রুর হাতে ধৃত হয়েছিলেন উসমানী সুলতান। এই সুলতান কিন্তু দুর্বল কেউ নন, তিনি বায়েজিদ দ্য থান্ডারবোল্ট (Bayezid the Thunderbolt/ Yıldırım), ইউরোপীয়রা যার ভয়ে ছিল থরহরিকম্প। তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন আরেক ইতিহাসবিখ্যাত সেনাপতি, তৈমুর লং (Tamerlane)।

প্রেক্ষাপট

চতুর্দশ শতকের শেষ এবং পঞ্চদশ শতকের সূচনাকাল ছিল উসমানী সাম্রাজ্যের বিস্তারের সময়। সুলতান বায়েজিদের হাত ধরে বল্কান আর আনাতোলিয়াতে সম্প্রসারিত হয়েছিল সালতানাত। কন্সট্যান্টিনোপোলে বসে স্বস্তিতে ছিলেন না বাইজান্টাইন সম্রাটও।

এককালের পরাক্রমশালী মোঙ্গল সাম্রাজ্য তখন বহুধা বিভক্ত। তাদের মধ্যে আবির্ভূত হয়েছেন নতুন এক দিগ্বিজয়ী বীর, তৈমুর। পারস্য থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিশাল এলাকায় জারি করেছেন মোঙ্গল শাসন, পত্তন করেছেন তিমুরিদ রাজবংশের। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনিও বায়েজিদের মতোই মুসলমান। এবং আনাতোলিয়াতে প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী তিনিও। তবে এর পেছনে তৈমুরের আলাদা উদ্দেশ্য আছে। তিনি চান দূর প্রাচ্যে অভিযান চালাতে। সেই অবধি রসদপত্র সরবরাহের নিরাপদ রাস্তা তৈরি এবং পেছন থেকে শত্রুর হামলা প্রতিহত করার মানসে আনাতোলিয়ার দিকে তার নজর।

১৩৯৯ সালে দলবল নিয়ে এশিয়া মাইনরে পা রাখলেন তৈমুর। এক বছরের মধ্যে দখল করে নেন সিরিয়া, আর্মেনিয়া আর জর্জিয়া। দামেস্ক, আলেপ্পো আর সমরখন্দের মতো সমৃদ্ধ শহর পরিণত হলো ধ্বংসস্তূপে। অধিবাসীদের গণহারে হত্যা করল তার সৈনিকেরা। ১৪০১ সালে এই ঝড় আছড়ে পড়ল বাগদাদে। প্রায় ২০,০০০ নাগরিকের রক্তে লাল হয়ে গেল ফোরাত।

অল্প সময়ের মধ্যেই মেসোপোটেমিয়া থেকে শুরু করে ভারতের অংশবিশেষ পর্যন্ত স্থাপিত হয় তিমুরিদ শাসন। এই পরিস্থিতিতে বায়েজিদের সাথে বিবাদ আরম্ভ হয় তৈমুরের। এতে ইন্ধন জোগান বেশ কিছু স্থানীয় শাসক, বা বেইলিকরা। এরা বায়েজিদের অধীনস্থ থাকা পছন্দ করছিলেন না, সুতরাং সুলতানকে সরাতে মোঙ্গলদের সাথে আঁতাত করেন তারা।

তৈমুরের অভিযান

আনাতোলিয়ায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ১৪০২ সালের গ্রীষ্মে ইরাক থেকে সসৈন্যে রওনা দেন তৈমুর। পথে বিশ্বাসঘাতক বেইলিকরা যোগ দেয় তার সঙ্গে। সব মিলিয়ে লক্ষাধিক সেনা ছিল মোঙ্গল জেনারেলের বাহিনীতে।

উসমানী সুলতান তখন কন্সট্যান্টিনোপোল অবরোধে ব্যস্ত। শত্রুদের আগমনের খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে ফিরতি পথ ধরলেন তিনি। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ৮৫,০০০ লোকের সেনাদল নিয়ে বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে হয় তাঁকে। প্রয়োজনীয় বিশ্রামের অভাবে সেনারা কাহিল হয়ে যায়।

কিন্তু বায়েজিদের জন্য চমক অপেক্ষা করছিল। তাকে ফাঁকি দিয়ে মোঙ্গল জেনারেল চলে গেছেন পেছনে। আঙ্কারার সামনে জারি করেছেন অবরোধ। কৌশলগতভাবে উসমানীদের জন্যে এই শহর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আবার ঘুরপথ ধরে সেদিকে আসতে বাধ্য হলেন সুলতান। আঙ্কারার অনতিদূরে চুবুক (Çubuk) এলাকায় সম্মুখীন হলেন সেকালের দুই পরাক্রমশালী শাসক।

রণকৌশল

কন্সট্যান্টিনোপোল থেকে আঙ্কারা লম্বা পথ। বায়েজিদের উচিত ছিল সৈন্যদের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম দেয়া। কিন্তু তৈমুরের অভিযানে ক্ষুব্ধ সুলতান আক্রমণে যেতে মুখিয়ে ছিলেন। তার জেনারেলরা পরামর্শ দিয়েছিল অন্ততপক্ষে রক্ষণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে। মোঙ্গলদের সংখ্যাধিক্য এবং উসমানী বাহিনীর ক্লান্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন তারা। কিন্তু সুলতান তাদের পরামর্শ কানে তোলেননি।

বায়েজিদের বাহিনীতে ছিল জ্যানিসারিদের মতো বিশেষায়িত পদাতিক ইউনিট, অশ্বারোহী সিপাই, এবং অধীনস্থ রাজ্য থেকে আসা সেনাপতিরা। সার্বিয়ান শাসক স্টেফান লাজার (Stefan Lazarević) এদের অন্যতম। সম্পর্কে বায়েজিদ তার বোন-জামাই। উসমানীদের বামবাহুতে দলবল নিয়ে অবস্থান নেন তিনি।

ডান বাহুতে রাখা ছিল সিপাই এবং তাতার সেনারা, দায়িত্বে যুবরাজ সুলেইমান। সুলতান স্বয়ং আরেক ছেলে মেহমেদ চেলেবি (Mehmed Çelebi), জ্যানিসারি আর অশ্বারোহীদের নিয়ে ছিলেন মধ্যভাগে। উসমানীদের মূল শক্তি ছিল তাদের পদাতিক এবং ভারী বর্মসজ্জিত অশ্বারোহী সেনারা।

বায়েজিদ কিন্তু তৈমুরের শক্তিমত্তা এবং রণকুশলতাকে ছোট করে দেখেছিলেন। অতীতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বারবার বিজয়ী হওয়ায় তৈরি অহংবোধকেও এজন্য দায় দেয়া যায়। লম্বা সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য যে শত্রুর আছে সেটাও ধরতে পারেননি তিনি।

তৈমুরের সেনারা পোড়খাওয়া যোদ্ধা। মূল শক্তি অশ্বারোহী তীরন্দাজ, এবং ক্ষিপ্রতার সাথে আক্রমণে যাওয়ার সামর্থ্য। তৈমুরের তীরন্দাজরা দূর থেকে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত করতে সিদ্ধহস্ত। এর আগে বহু সেনাবাহিনীকে তছনছ করে দিয়েছে তারা। এর কোনো জবাব ছিল না বায়েজিদের দলে। তার ভারী বর্মসজ্জিত অশ্বারোহীরা ক্ষিপ্রতায় অনেক পিছিয়ে।

মোঙ্গল সেনাপতি বায়েজিদকে টেনে আনতে চাইলেন নিজের ফাঁদে, এজন্য প্রান্তরে বহমান একমাত্র পানিপ্রবাহ ঘিরে রক্ষণাত্মক পদ্ধতিতে ব্যুহনির্মাণ করলেন তিনি। তার জানা ছিল- দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তৃষ্ণার্ত উসমানী সেনারা পানির জন্য হাহাকার করবে। ফলে বায়েজিদ বাধ্য হবেন প্রথম চাল দিতে।

ব্যুহের সামনে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে সেখানে তীক্ষ্ণ তক্তা পুঁতে দেয় তৈমুরের লোকেরা। এরপর সেনাদের তিন ভাগে ভাগ করেন তিনি। দুই পাশে অশ্বারোহীরা সার বেঁধে দাঁড়ায়। মাঝে থাকলেন তৈমুর, সঙ্গে বিশ্বস্ত সেনা এবং হস্তীবাহিনী।

যুদ্ধ

২৮ জুলাই, ১৪০২।

পিপাসার্ত সেনাদের জন্য পানি ছিনিয়ে আনতে সরাসরি মোঙ্গল ব্যুহে আক্রমণ চালালেন বায়েজিদ। উসমানীদের মধ্যভাগের চাপে কিছুটা পিছিয়ে যায় তৈমুরের সেনারা। সেই সুযোগে স্টেফান লাজার নাইটদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের বাম বাহুতে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় সেদিকে থাকা তৈমুরের অশ্বারোহীরা।

ঠিক তখনই বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দেয় তাতাররা। আগে থেকেই মোঙ্গল জেনারেলের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল তারা। মোক্ষম সময় দেখে দল পাল্টে তৈমুরের শিবিরে চলে যায় এরা, হামলা করে বিভ্রান্ত উসমানীদের ওপর।

তাতারিদের কাজে পাল্টে যায় যুদ্ধের গতি। তাদের সাথে মিলে মোঙ্গলরা উসমানীদের ডান বাহুতে তীব্র আক্রমণ চালায়। ছত্রখান হয়ে যায় বায়েজিদের সেনারা। পরিস্থিতি দেখে স্টেফান লাজার দলবল নিয়ে পিছিয়ে যান, যুবরাজ সুলেইমানকেও উদ্ধার করে নিয়ে যান সাথে। ফলে বায়েজিদের বাম বাহুও ভেঙে পড়ে।

সুলতান পড়ে গেলেন চরম বিপদে। তৈমুরের অশ্বারোহী তীরন্দাজরা এবার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের তীরে হতাহত হয় বহু উসমানী সৈন্য। আনাতোলিয়া থেকে আসা সেনাদল পক্ষবদল করে তৈমুরের সাথে থাকা বেইলিকদের সাথে যোগ দিলে পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। বায়েজিদ তারপরেও বিশ্বস্ত লোকদের নিয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন, কিন্তু মোঙ্গলদের প্রবল চাপে একপর্যায়ে সেই ব্যুহও একেবারেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

বায়েজিদ একদল অশ্বারোহী নিয়ে রণক্ষেত্র ছেড়ে যান। কিন্তু তৈমুর তার পিছু ধাওয়া করেন। উজবেকিস্তানের জঙ্গলের মধ্যে তীরের আঘাতে সুলতানের ঘোড়া আহত হয়। বাহন হারিয়ে মোঙ্গলদের হাতে ধরা পড়েন বায়েজিদ।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

বায়েজিদ আটক হন পরিবারসহ। তার ওপর শারীরিক নির্যাতন করেননি তৈমুর, কিন্তু সুলতানের স্ত্রীকে নিগ্রহের শিকার হতে হয়। সম্ভবত সেই মানসিক পীড়াতেই কয়েক মাস পর বন্দীশালায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুলতান।

আঙ্কারার যুদ্ধের পর আপাতত চূর্ণ হয়ে যায় উসমানীদের শক্তি। ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে বায়েজিদের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য। তবে তৈমুর সেসব এলাকা দখল করার কোনো আগ্রহ দেখাননি। তিনি নয় মাস আনাতোলিয়ায় ছিলেন, পুরোটা সময় ব্যস্ত ছিলে লুটপাট আর হত্যাকাণ্ডে। বিশ্বাসঘাতক বেইলিকদেরও বহু এলাকা উপহার দেন তিনি। ইউরোপে প্রবেশ করার জন্য ইজিয়ান সাগরের উপকূলেও বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জাহাজের অভাবে সেটা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে চীন আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে আনাতোলিয়ে ছেড়ে চলে যান তৈমুর। ১৪০৫ সালে তার মৃত্যুর পর তিমুরিদ রাজবংশ বেশিদিন টেকেনি।

আঙ্কারার যুদ্ধের পর নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করে উসমানীরা। বায়েজিদের এক ছেলেকে ধরে নিয়ে গেলেও চার ছেলে ছিল স্বাধীন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি তৈমুর। এরা সাম্রাজ্যের খণ্ড খণ্ড অংশের সুলতান হয়ে বসে। রাজ্যের ইউরোপিয়ান অংশ ছিল অক্ষত, সেখানে সিংহাসন নেন সুলেইমান। বাকিরা ছিল আনাতোলিয়াতেই।

মোঙ্গলরা আনাতোলিয়া ছেড়ে যাওয়ার পর সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের চেষ্টায় শুরু হয়ে বায়েজিদের পুত্রদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ। পারস্পরিক সংঘাতে ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে উসমানীদের সামরিক শক্তি। প্রায় এক দশক বজায় ছিল এই সংঘাত, এরপর যুবরাজ মেহমেদ ক্ষমতা নেন। নতুন করে শুরু হয় উসমানীদের সুসময়।

References
This post was viewed: 39

আরো পড়ুন