Skip to main content

Ridge Bangla

বরফের ভেতর ‘রক্তধারা’: কী রহস্য লুকিয়ে আছে অ্যান্টার্কটিকার ব্লাড ফলসে?

অ্যান্টার্কটিকার বুকে সাদা, ধূসর আর নীলের বাইরে অন্য কোনো রং এমনিতেই চোখে লাগে। সেখানে যদি বিশাল এক হিমবাহের প্রান্তজুড়ে দেখা যায় গাঢ় লালচে-কমলা দাগ, সেটি আরও অস্বাভাবিক। দূর থেকে মনে হতে পারে, বরফের গা কেটে যেন রক্ত বেরিয়ে এসেছে! সেই দৃশ্যের নামই ‘ব্লাড ফলস’।

পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালিজের টেইলর গ্লেসিয়ারের শেষ প্রান্তে, বরফে ঢাকা লেক বোনির পাশে এর অবস্থান। এটি প্রচলিত অর্থে কোনো জলপ্রপাতও না। বরং হিমবাহের ভেতর ও নিচে থাকা অত্যন্ত লবণাক্ত, আয়রন-সমৃদ্ধ তরল পানি মাঝেমধ্যে বরফের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসে। কিছু সময় পর সেই প্রবাহ বরফের ওপর ছড়িয়ে তৈরি করে লালচে-বাদামি দাগ।

দৃশ্যটির ব্যাখ্যা আজকের দিনের বিজ্ঞানের কাছে অনেকটাই পরিষ্কার। কিন্তু ব্লাড ফলসের আসল বিস্ময় এর রং না। বরং প্রশ্নটি আরও গভীরে- এত ঠান্ডায় বরফের ভেতর পানি তরল থাকে কীভাবে? সেই পানিতে এত আয়রন এলো কোথা থেকে? সূর্যালোকহীন এক জগতে জীবনের অস্তিত্বই বা টিকে আছে কী করে?

বরফের মধ্যে প্রথম দেখা অদ্ভুত রং

১৯১০–১৩ সালের টেরা নোভা অভিযানের সময় অস্ট্রেলীয় ভূতত্ত্ববিদ গ্রিফিথ টেইলর এই অঞ্চলের লালচে স্রাবের বর্ণনা দেন। পরবর্তী সময়ে উপত্যকা ও হিমবাহের নামও তাঁর নামানুসারে রাখা হয়। শুরুর দিকে লাল রঙের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে শৈবালের কথাও ভাবা হয়েছিল। কিন্তু গবেষণা এগোতেই পরিষ্কার হতে থাকে, এর পেছনে আছে মূলত আয়রন-সমৃদ্ধ লবণাক্ত পানি।

১৯১০–১৩ সালের টেরা নোভা অভিযানের সময় অস্ট্রেলীয় ভূতত্ত্ববিদ গ্রিফিথ টেইলর এই অঞ্চলের লালচে স্রাবের বর্ণনা দেন; Image courtesy: Wikimedia Commons
১৯১০–১৩ সালের টেরা নোভা অভিযানের সময় অস্ট্রেলীয় ভূতত্ত্ববিদ গ্রিফিথ টেইলর এই অঞ্চলের লালচে স্রাবের বর্ণনা দেন; Image courtesy: Wikimedia Commons

ব্লাড ফলস যে অঞ্চলে অবস্থিত, সেই ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালিজ নিজেই অ্যান্টার্কটিকার ব্যতিক্রমী ভূখণ্ড। প্রবল শুষ্ক বাতাসের কারণে এখানে বরফ ও তুষার তুলনামূলক কম জমে; কোথাও কোথাও উন্মুক্ত পাথুরে ভূমিও দেখা যায়। টেইলর গ্লেসিয়ার আবার ‘কোল্ড-বেসড’ হিমবাহ- এর নিচের অংশ ভূমির সঙ্গে হিমায়িত অবস্থায় যুক্ত। ফলে সাধারণ হিমবাহের নিচে যেভাবে তরল পানি থাকার কথা ভাবা হয়, এখানে সেরকম না।

আর সে কারণেই বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মনে বড় প্রশ্ন ছিল- এত ঠান্ডা বরফের মধ্যে ব্লাড ফলসের পানি আসছে কোথা থেকে?

জমে না যাওয়া প্রাচীন নোনা পানি

এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে এসেছে হিমবাহের নিচে ও ভেতরে ছড়িয়ে থাকা ব্রাইন, অর্থাৎ অত্যন্ত লবণাক্ত পানি। ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ ইঙ্গিত দেয়, মিলিয়ন বছর আগে টেইলর ভ্যালির সঙ্গে সমুদ্রের যোগাযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের পশ্চাদপসরণ এবং হিমবাহের অগ্রগতির মধ্য দিয়ে লবণাক্ত পানির কিছু অংশ অঞ্চলটির নিচে আটকা পড়ে। পানি জমতে থাকলে অবশিষ্ট তরলে লবণের ঘনত্ব আরও বেড়ে যায়, যে প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্রায়োকনসেন্ট্রেশন।

এই অতিরিক্ত লবণই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। বিশুদ্ধ পানি শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি জমে গেলেও লবণের উপস্থিতিতে পানির হিমাঙ্ক নেমে যায়। ফলে চারপাশের বরফ প্রচণ্ড ঠান্ডা হলেও ব্রাইনের একটি অংশ তরল থাকতে পারে। ব্লাড ফলস নিয়ে ২০১৭ সালের রাডারভিত্তিক গবেষণায় টেইলর গ্লেসিয়ারের ভেতরে এমন একটি সক্রিয় লবণাক্ত পানির প্রবাহ শনাক্ত করা হয়। গবেষকেরা দেখান, গড় বার্ষিক বায়ুর তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়া সত্ত্বেও লবণাক্ত পানি হিমবাহের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারে।

Image courtesy: NASA image created by Jesse Allen, using data provided courtesy of NASA/GSFC/METI/ERSDAC/JAROS, and U.S./Japan ASTER Science Team.
Image courtesy: NASA image created by Jesse Allen, using data provided courtesy of NASA/GSFC/METI/ERSDAC/JAROS, and U.S./Japan ASTER Science Team.

ব্লাড ফলস তাই সারাক্ষণ বয়ে চলা নদী না। এর স্রাব অনিয়মিত। ঠিক কোন প্রক্রিয়া কখন এই ব্রাইনকে পৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে, সেই ব্যবস্থার কিছু অংশ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার না। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক সারসংক্ষেপেও এই অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

লাল রং আসে কোথা থেকে?

বহুদিন ধরে সহজ ভাষায় ব্লাড ফলসের ব্যাখ্যা দেওয়া হতো এভাবে- পানিতে থাকা লোহা বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে মরিচার মতো আয়রন অক্সাইড তৈরি করে, তাই পানি লাল হয়ে যায়। মূল ধারণাটি ঠিক হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও সূক্ষ্ম বিষয় পরিষ্কার হয়েছে।

Image courtesy: US National Science Foundation
Image courtesy: US National Science Foundation

হিমবাহের নিচের অক্সিজেনস্বল্প পানিতে প্রচুর দ্রবীভূত ফেরাস আয়রন বা Fe²⁺ থাকে। ব্রাইন যখন বরফের বাইরে বেরিয়ে বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন সেই আয়রন অক্সিডাইজ হতে শুরু করে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, লাল রংকে কেবল প্রচলিত স্ফটিকাকার ‘আয়রন অক্সাইড’ দিয়ে ব্যাখ্যা করাই যথেষ্ট না। গবেষকেরা সেখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, অ্যামরফাস বা অস্ফটিক আয়রন-সমৃদ্ধ ন্যানোস্ফিয়ার শনাক্ত করেন। অক্সিডাইজড আয়রনসহ এসব অতিক্ষুদ্র কণাই ব্লাড ফলসের লাল-কমলা রঙের বড় উৎস; সঙ্গে সোডিয়াম, ক্লোরিন, ম্যাগনেসিয়ামের মতো অন্যান্য উপাদানও রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্যে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্ধকার পানিতে জীবন

ব্লাড ফলসকে বৈজ্ঞানিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এর ক্ষুদ্র জীবজগৎ। হিমবাহের নিচে সূর্যালোক নেই, ফলে সেখানে সালোকসংশ্লেষণের সুযোগও নেই। অক্সিজেনও অত্যন্ত সীমিত। অথচ নমুনায় এমন অণুজীব পাওয়া গেছে, যারা আয়রন ও সালফারের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে।

২০০৯ সালে সায়েন্স-এ প্রকাশিত গবেষণায় এমন একটি সক্রিয় মাইক্রোবিয়াল ইকোসিস্টেমের প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে সালফার ও আয়রনের জৈব-রাসায়নিক চক্র জীবনের প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আরও আগে ব্লাড ফলসের ব্যাকটেরিয়ার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, নমুনার বহু অণুজীবের নিকটাত্মীয় সামুদ্রিক পরিবেশে পাওয়া যায়, যা এই ব্রাইনের প্রাচীন সামুদ্রিক উৎসের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Image courtesy: Cavan Images / Alamy Stock Photo
Image courtesy: Cavan Images / Alamy Stock Photo

এই কারণেই ব্লাড ফলস শুধু পৃথিবীর অদ্ভুত প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলোর একটিই না, অ্যাস্ট্রোবায়োলজিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গল গ্রহের ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত অঞ্চল কিংবা বৃহস্পতি ও শনির বরফে ঢাকা উপগ্রহে সম্ভাব্য জীবনের পরিবেশ কেমন হতে পারে, তা বোঝার জন্যও পৃথিবীর এমন ঠান্ডা, অন্ধকার ও লবণাক্ত বাস্তুতন্ত্র বেশ কার্যকর এক প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার। ২০২২ সালের গবেষকেরাও ব্লাড ফলসকে সম্ভাব্য বহির্জাগতিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক মডেল হিসেবে দেখেছেন।

সাদা বরফের ওপর রক্তের মতো ছড়িয়ে থাকা দাগই প্রথমে ব্লাড ফলসকে বিখ্যাত করেছিল। কিন্তু শত বছরের গবেষণার পর এর আকর্ষণ আরও বিস্তৃত হয়েছে। বরফের নিচে এমন এক পৃথিবী টিকে আছে, যেখানে সমুদ্রের সুদূর অতীতের চিহ্ন, অস্বাভাবিক ভূ-রসায়ন এবং আলোহীন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া অণুজীব একই ব্যবস্থার অংশ। ব্লাড ফলসের লাল রংয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে; কিন্তু সেই ব্যাখ্যাই দেখিয়েছে, বরফের নিচের পৃথিবী আমরা যতটা নিস্তব্ধ ভাবি, বাস্তবে তা তার চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ও জটিল!

ফিচার ইমেজ: Alasdair Turner/Getty Images

রেফারেন্স

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন