Skip to main content

Ridge Bangla

আব্রাহাম অ্যাকর্ড: আরব বিশ্বের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ

২০২০ সালের আগস্ট মাস; বিশ্বে তখন কোভিড মহামারি চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিটি রাষ্ট্রেরই তখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কীভাবে এই ভাইরাসের আগ্রাসন ঠেকানো যেতে পারে। এরকম একটি পরিস্থিতিতেই মধ্যপ্রাচ্যে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ নামের একটি নতুন চুক্তির কথা শোনা গেল।

এই চুক্তিতে পক্ষ অনেকগুলো, সবগুলোই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, এরপর বাহরাইন, সুদান ও মরক্কোর মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তিগুলোকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন শান্তি প্রক্রিয়ার নতুন দিগন্ত হিসেবে। আবার অনেকে হতবাকও হয়েছেন।

আসলে যারা দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বৈদেশিক নীতির খবরাখবর রাখেন, তাদের কাছে এটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। হঠাৎ করে আলোচনায় আসা এই চুক্তিকে আরব বিশ্বের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা গেলেও এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে অনেকদিন ধরেই।

ঐতিহাসিক দিক থেকে ‘ফিলিস্তিন’ ছিল আরব বিশ্বের একতার প্রতীক, তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ। ফিলিস্তিনের বিষয়টি এমন যে- এটি সবসময়ই আরবের রাষ্ট্রগুলোকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। আরব বিশ্বের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পূর্বশর্ত ছিল ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া এবং ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে জেরুজালেমের মর্যাদা নিয়ে একটি চূড়ান্ত সমাধানে আসা। কিন্তু ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ নামের চুক্তিগুলো আরবের রাষ্ট্রগুলোর এই দীর্ঘদিনের অবস্থানকে কার্যত উপেক্ষা করেছে।

এই চুক্তির বলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কোনো প্রকার অর্থবহ আলোচনা ছাড়াই, তাদের অধিকারের বিষয়টি কার্যত গৌণ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে উদ্যোগী হয়েছে আরব রাষ্ট্রগুলো। এই আচরণ কেবল ফিলিস্তিনিদের সঙ্গেই নয়, আরব বিশ্বের সাধারণ জনগণের মধ্যেও একধরনের বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি করেছে।

ফিলিস্তিন কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, এটি আরব ও মুসলিম বিশ্বের আবেগ, আত্মমর্যাদা এবং ন্যায্যতার প্রতীক। এই চুক্তির প্রতি সম্মতি উৎপাদনের জন্য বলা হচ্ছে যে এটি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনবে এবং ইরানকে মোকাবিলায় একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট তৈরি করবে।

ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইরানকে মোকাবিলায় ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে হাত মেলানো কতটা নৈতিক এবং ফলপ্রসূ, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের বিভেদকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্যেও নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে এটি।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন ছিল এই চুক্তির প্রধান কারিগর। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত মিত্রদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা এবং ইরানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী জোট তৈরি করা।

একইসাথে, ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই চুক্তি একটি সাফল্য হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে আরব দেশগুলো নিজেদের নিয়মিত ও আদর্শিক অবস্থান থেকে এসেছে। এটি তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব দিকেও আঙ্গুল তুলেছে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের প্রতি এই দেশগুলোর সংহতিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

আরব দেশগুলো এই চুক্তির পেছনে এর অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো দ্বারা অনেক বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম এবং গোয়েন্দা সক্ষমতার ব্যাপারে আগে থেকেই অনেক আগ্রহী ছিল।

অন্যদিকে শিল্পোন্নত ইসরায়েলের প্রয়োজন ছিল মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাজার। আরব দেশগুলো এই সুবিধার জন্য ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে ফিলিস্তিনিদের উপর গণহত্যা চালানো ইসরায়েলিদের সাথে হাত মিলিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে- কিছু আরব দেশের কাছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কৌশলগত সুবিধা ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই চুক্তির ফলে ‘ফিলিস্তিন ইস্যু’ এখন আর আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়, বরং এটি একটি পৃথক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডকে ‘শান্তি চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মূল সমস্যা, অর্থাৎ ফিলিস্তিন সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। বরং ফিলিস্তিনিদের আরও কোণঠাসা করা হয়েছে।

এটি আরব বিশ্বের একধরনের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ, যেখানে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ড নিঃসন্দেহে আরব বিশ্বের পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাদের দীর্ঘদিনের নৈতিক এবং ঐতিহাসিক অবস্থানের একধরনের নতজানু প্রতিফলন। এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা সময়ই বলে দেবে।

তথ্যসূত্র:

১) Why Trump’s Abraham Accords Have Not Meant Mideast Peace

২) The Abraham Accords After Gaza: A Change of Context

This post was viewed: 44

আরো পড়ুন