Ridge Bangla

এক সপ্তাহে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড: দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র?

গত এক সপ্তাহে দেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শুধু প্রাণহানি নয়, এসব অগ্নিকাণ্ড দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং জনসাধারণের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সকলেই প্রশ্ন করছেন, এসব অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা, নাকি দেশকে পিছিয়ে দেবার লক্ষ্যে পরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ?

প্রথমেই চলুন গত এক সপ্তাহে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডগুলোর দিকে একবার নজর বোলানো যাক।

১) মিরপুরে শিয়ালবাড়ি কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড

১৪ অক্টোবর রাজধানীর শিয়ালবাড়িতে কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুনে অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে, আহত হন আরও অনেকে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভবনের ছাদ টিনশেড এবং তালাবদ্ধ থাকার কারণে মানুষ বের হতে পারেনি। গোডাউনে ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, ব্লিচিং পাউডারসহ সাত-আট ধরনের রাসায়নিক পদার্থ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে নিচের গ্যাস সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়, যা আগুনের তীব্রতা আরও বাড়ায়। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল থাকায় ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনাই আগুনের ভয়াবহতা বৃদ্ধি করেছে।

২) চট্টগ্রামের ইপিজেড কারখানায় অগ্নিকাণ্ড

১৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকার ‘অ্যাডামস ক্যাপ’ কারখানায় আগুন লাগে। আটতলা কারখানার নিচের দুই তলায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখানে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি এবং তোয়ালে তৈরি হতো। প্রচুর পরিমাণে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন রাতভর ছড়িয়ে যায় এবং ভবনের উপরের তলার ছাদ ধসে পড়ে।

এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানি না হলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি ব্যাপক। ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন জানান, কারখানায় থাকা দাহ্য পদার্থ আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব ঘটিয়েছে।

৩) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে গত ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে। দুপুর সোয়া ২টার দিকে ৮ নম্বর গেটের কার্গো সেকশনে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাময়িকভাবে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করতে হয়। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, সিভিল অ্যাভিয়েশন, পুলিশ-আনসার ও বিজিবি মিলিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। সন্ধ্যা নাগাদ আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয় প্রায় ২৭ ঘণ্টা পর।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুনে কার্গো কমপ্লেক্সে রাখা প্রায় সব মালামাল পুড়ে গেছে। এতে দেশের বাণিজ্য খাতের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। অগ্নিকাণ্ডের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশের ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগজনক।

বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ক্ষতির মধ্যে কাঁচামাল পেতে বিলম্ব, অতিরিক্ত বিমান ভাড়া, ক্রেতাদের ছাড় দাবি এবং অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত।

বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলি শামীম এহসান বলেন, কার্গো ভিলেজে ৫০০টিরও বেশি পোশাক রপ্তানিকারকের ছোট ছোট চালান ছিল, যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মিলিতভাবে লাখ লাখ ডলারের রপ্তানি স্থবির করেছে।

বিজিএমইএ-এর সহ-সভাপতি মো. শেহাব চৌধুরী জানান, ক্ষতির প্রভাব শুধুমাত্র পোশাক নয়, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য বাণিজ্য খাতেও পড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বিমান কুরিয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে, যার এক-তৃতীয়াংশ পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের।

৪) ধামরাইয়ের ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসে আগুন

রবিবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার ধামরাইয়ে অবস্থিত ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৯ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলায় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট এক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সৌভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে ভবনের আইপিএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

৫) ফরিদপুরে দোকানপাটে আগুন

রবিবার (১৯ অক্টোবর) ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার কাদিরদী বাজারে ১৭টি দোকান আগুনে পুড়ে ছাই হয়। আগুন বাচ্চু মোল্যার মার্কেটের নাসির দর্জির দোকান থেকে শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

৬) লক্ষ্মীপুরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার স্লুইসগেইট বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শনিবার গভীর রাতে এ আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থানীয়দের দাবি, মুদি ব্যবসায়ী বেলালের দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে মুহূর্তেই পাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে রামগতি ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর আগেই ৪টি মুদি দোকান, ২টি ফার্মেসি, ২টি ফার্নিচার দোকান ও একটি ওয়ার্কশপ সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এতে অন্তত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

৭) কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভবনে অগ্নিকাণ্ড

শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাত সোয়া ৮টার দিকে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কলাতলী ডলফিন মোড়ের ভাড়া করা ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ইসলামিক স্ট্যাটিস্টিক্স ডিপার্টমেন্টের একটি কম্পিউটারের শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় কয়েকটি কম্পিউটার ও বই পুড়ে গেছে। খবর পেয়ে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এক ঘন্টার চেষ্টায় রাত ৯টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনে।

৮) নারায়ণগঞ্জে মেঘনা চিনি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড

শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ঝাউচর এলাকায় মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ চিনি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সাইলোতে হঠাৎ আগুন ধরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য সাইলোতে। খবর পেয়ে সোনারগাঁ ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ও মেঘনা গ্রুপের পাঁচটি ইউনিট দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

৯) ভোলার তজুমদ্দিনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই ১৯ মাছ আড়ৎ

ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার স্লুইসগেট এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৯টি মাছের আড়ৎ, দোকানঘর ও একটি বরফ কারখানার অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রবিবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। স্থানীয়রা জানায়, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট খবর পেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। এতে প্রায় ১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

দেশজুড়ে এত অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড কি কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য করা যৌক্তিক?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ ত্রুটি এবং সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের দিকগুলো এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। দেশজুড়ে সচেতন জনমনেও এই ঘটনাগুলো আর নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে স্থান পাচ্ছে না, বরং বাংলাদেশের জনগণ এগুলোর পেছনে নাশকতার পরিকল্পনা আছে বলেই মনে করছেন।

জুলকারনাইন সায়ের খান
জুলকারনাইন সায়ের খান

আলোচনায় এসেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খানের দেওয়া গত বছরের ২৬ ডিসেম্বরের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস। ‘অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্র’ মারফত খবর পেয়ে নিজের ভেরিফাইড আইডি থেকে দেওয়া সেই স্ট্যাটাসে তিনি ‘বাংলাদেশকে অকার্যকরী রাষ্ট্রে পরিণত করতে বিশেষ একটি গোষ্ঠির যে সকল দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা’ রয়েছে বলে তালিকা দিয়েছিলেন, তার ২য় স্থানেই ছিল ‘হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নিসংযোগ (কেপিআই সহ)’। গত ১৮ তারিখ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১ দিনেরও বেশি সময় ধরে জ্বলা আগুন তাই নানা প্রশ্নই মনের মাঝে জন্ম দেয়।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী

সোমবার দুপুরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ফুলমুড়ি গ্রামে দৃষ্টিহীন গায়ক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কণ্ঠেও শোনা গেল একই কথার পুনরাবৃত্তি, “পরপর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশের জনগণের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটা বড় ধরনের সিরিজ নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে, জনগণ এমনটা মনে করছে। জনগণের মনে এই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ‘সিরিজ অব ইনসিডেন্ট’ যখন হয়, তখন বুঝতে হবে, এখানে কোনো না কোনো কালো হাত কাজ করছে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য এবং হাসিনাবিহীন বাংলাদেশ ঠিকমতো চলছে না—এটা আন্তর্জাতিকভাবে দেখানোর জন্য দেশি-বিদেশি শক্তির হাত থাকতে পারে।”

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম

এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বলেছেন, “বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখি না। এগুলো স্বৈরাচারের দোসরদের দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তের অংশ। তথাকথিত তদন্ত কমিটির নাটক বাদ দিয়ে এর পিছনের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা হোক”।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহম্মেদ খান সন্দেহ প্রকাশ করেই বলেছেন, “দফায় দফায় এমন বড় অগ্নিকাণ্ড কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি কেপিআইভুক্ত (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) এলাকা, যেখানে সার্বক্ষণিক মনিটরিং থাকার কথা। সেখানে আগুন লাগলেও এতক্ষণ ধরে জ্বলার কথা নয়। বিমানবন্দরের ভেতরেই ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ইউনিট রয়েছে। তারা সাধারণত বিমানের আগুন নেভাতে সক্ষম। এত শক্তিশালী ইউনিট থাকা সত্ত্বেও আগুন নিয়ন্ত্রণে এতটা সময় নেওয়া কর্তৃপক্ষের গাফিলতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়।”

ফায়ার সার্ভিসের আরেক সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শহিদউল্লাহও বলেছেন, “ঘন ঘন আগুন লাগার ঘটনায় নাশকতার আলামত থাকতে পারে। শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন নেভানোর সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অপ্রত্যাশিত এবং অস্বাভাবিক। সম্প্রতি যেভাবে একের পর এক বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটছে, তাতে দেশের অর্থনীতি দুর্বল করার কোনো পাঁয়তারা চলছে কি না, সেটি এখন দেখার বিষয়। দুর্ঘটনার আড়ালে নাশকতা লুকিয়ে থাকতে পারে।”

১৮ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা উসকানির মাধ্যমে জনজীবন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই; যদি এসব অগ্নিকাণ্ড নাশকতা হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য হয় জনমনে আতঙ্ক বা বিভাজন সৃষ্টি করা, তবে তারা সফল হবে কেবল তখনই, যখন আমরা ভয়কে আমাদের বিবেচনা ও দৃঢ়তার ওপর প্রাধান্য দিতে দেব।”

নড়েচড়ে বসেছে সরকারও; একের পর এক এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সরকারের উদ্যোগে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র‌্যাব ও বিজিবি প্রধান, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় জাতীয় প্রস্তুতি ও গত এক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো নাশকতার হাত আছে কিনা সেই বিষয়েও আলোচনা হয়।

এর পাশাপাশি দেশের সকল কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। জেলা পর্যায়েও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা নিজ নিজ জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

দেশজুড়ে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা শুধু সম্পদহানিই নয়, জাতির মানসিক নিরাপত্তাকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডই যেন আমাদের প্রস্তুতি, দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহিতাকে নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে।

এসব ঘটনার পেছনে যদি সত্যিই পরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র থেকে থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হানবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদিকে, যদি এসব কেবল অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও নিরাপত্তা ঘাটতির ফল হয়, তবুও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি আর অজুহাত হতে পারে না। প্রতিটি স্থাপনায় নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন, প্রশিক্ষিত কর্মী, জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

অগ্নিকাণ্ডের এই ধারাবাহিকতার মাঝে জাতির প্রত্যাশা- সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল তদন্ত কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিকতায় না গিয়ে, প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও দোষীদের আইনের আওতায় আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। একইসঙ্গে, সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সচেতন হতে হবে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যাপারে।

This post was viewed: 98

আরো পড়ুন