ধরুন, কোনো দুর্ঘটনায় একটি প্রাণীর সামনের একটি পা পুরোপুরি কেটে গেল। সাধারণভাবে আমরা ধরে নেব, ক্ষতস্থান শুকাবে, জায়গাটি সেরে উঠবে, কিন্তু হারানো পা আর ফিরে আসবে না। অ্যাক্সোলটলের ক্ষেত্রে গল্পটা একেবারেই অন্য রকম। কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে ক্ষতস্থানে নতুন টিস্যু তৈরি হতে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে আসে হাড়, পেশি, স্নায়ু, রক্তনালি, ত্বক। শেষ পর্যন্ত সেখানে আবার তৈরি হতে পারে প্রায় পূর্ণাঙ্গ একটি পা!
আর শুধু হাত-পা না। মেক্সিকোর এই অদ্ভুত সালাম্যান্ডার লেজ, চোয়ালের অংশ, মেরুদণ্ডের স্নায়ুরজ্জু, ত্বক, হৃৎপিণ্ডের কিছু অংশ, এমনকি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশও পুনর্গঠন করতে পারে! এমন ক্ষমতা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে অত্যন্ত বিরল। এ কারণেই দেখতে খানিকটা হাসিমুখের জলজ প্রাণীটি আজ বিশ্বের রিজেনারেশন বিষয়ক গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মডেল। তার নাম অ্যাক্সোলটল, বৈজ্ঞানিক নাম Ambystoma mexicanum।
প্রাণীটি যেন বড় হয়েও একেবারে শিশু থেকে যায়!
প্রথম দেখায় অ্যাক্সোলটলকে মাছ মনে হতে পারে। মাথার দুই পাশে পালকের মতো তিন জোড়া বাহ্যিক ফুলকা, চওড়া মুখ, ছোট চোখ আর লম্বা লেজ। কিন্তু এটি মাছ না, উভচর প্রাণী। সালাম্যান্ডার পরিবারের সদস্য।
এখানেই আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষণীয়। সাধারণ সালাম্যান্ডার জীবনের শুরুতে পানিতে থাকে, পরে রূপান্তরের মাধ্যমে স্থলজ প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণীতে পরিণত হয়। অ্যাক্সোলটল সাধারণত সেই রূপান্তরের পথে যায় না। বংশবৃদ্ধির জন্য পরিণত হলেও তার শৈশবের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য থেকে যায়। বাহ্যিক ফুলকা বজায় থাকে, আর জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই পানিতে কাটায়। এই বৈশিষ্ট্যকে বিজ্ঞানীরা বলেন পেডোমরফোসিস।
আমরা সাধারণত ইন্টারনেটে গোলাপি বা প্রায় সাদা অ্যাক্সোলটলের ছবি বেশি দেখি। এগুলোর অনেকগুলোই বন্দী অবস্থায় প্রজনন করা হালকা রঙের হয়ে থাকে। বুনো অ্যাক্সোলটলের স্বাভাবিক রং বরং গাঢ় সবুজাভ-বাদামি বা কালচে, যা কাদাময় পানির পরিবেশে তাকে আড়াল করে রাখে।
প্রাণীটির আদি নিবাস মেক্সিকো সিটির দক্ষিণে সোচিমিলকো অঞ্চলের জলাভূমি। একসময় মেক্সিকো উপত্যকার বিস্তৃত হ্রদে এদের পাওয়া যেত। বর্তমানে বন্য Ambystoma mexicanum কার্যত সোচিমিলকোর খাল ও জলাভূমির ওপরই নির্ভরশীল।
‘অ্যাক্সোলটল’ নামটির শিকড়ও বহু পুরনো। শব্দটি এসেছে নাহুয়াতল ভাষা থেকে। অ্যাজটেক দেবতা শোলোটলের সঙ্গে এর নামের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
কাটা পায়ের জায়গায় নতুন পা আসে কীভাবে?
অ্যাক্সোলটলের সবচেয়ে বড় বিস্ময় শুরু হয় আঘাত পাওয়ার পর। মানুষের শরীরে বড় ধরনের ক্ষত তৈরি হলে শরীরের প্রথম লক্ষ্য থাকে জায়গাটি যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করা। ফলে প্রায়ই সেখানে দাগ বা স্কার টিস্যু তৈরি হয়। অ্যাক্সোলটলের শরীর ক্ষত সামলানোর ক্ষেত্রে অন্য পথ নিতে পারে। ক্ষত দ্রুত ত্বকের একটি স্তরে ঢাকা পড়ে এবং বহু ক্ষেত্রে স্থায়ী দাগ তৈরি না করেই পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ধরা যাক, একটি পা কেটে গেছে। ক্ষতস্থানের নিচে বিভিন্ন ধরনের কোষ সক্রিয় হতে শুরু করে। সেখানে তৈরি হয় কোষের একটি বিশেষ সমষ্টি, যার নাম ব্লাস্টেমা। সহজ করে বললে, এটি নতুন অঙ্গ তৈরির জন্য গড়ে ওঠা একধরনের অস্থায়ী নির্মাণক্ষেত্র।
আগে ধারণা করা হতো, পুরনো অঙ্গের কোষগুলো সম্পূর্ণভাবে নিজেদের পরিচয় ভুলে একেবারে আদিম অবস্থায় ফিরে যায়। পরে কোষ অনুসরণ করে করা গবেষণায় দেখা গেছে ব্যাপারটি আরও সূক্ষ্ম। ব্লাস্টেমায় থাকা সব কোষ একরকম না। অনেক কোষ নিজের আগের টিস্যুর পরিচয়ের কিছু সীমা ধরে রাখে। অর্থাৎ পেশির কোষ ইচ্ছেমতো ত্বক বা অন্য যেকোনো কোষে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি এমন না।
স্নায়ুও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত স্নায়বিক সংকেত ছাড়া স্বাভাবিক ব্লাস্টেমা গঠন ও অঙ্গ পুনর্গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষতস্থান, স্নায়ু, ত্বকের কোষ, ফাইব্রোব্লাস্ট এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ম্যাক্রোফেজসহ বিভিন্ন কোষ একসঙ্গে কাজ করে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে। তারপর ব্লাস্টেমার কোষ বিভাজিত হয় এবং ঠিক জায়গায় হাড়, পেশি, স্নায়ু ও অন্যান্য কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নতুন অংশটি এলোমেলোভাবে বড় হয় না। শরীর যেন বুঝতে পারে ঠিক কতটুকু অংশ হারিয়েছে। কবজির কাছ থেকে পা হারালে প্রয়োজনীয় নিচের অংশটি তৈরি হয়, পুরো নতুন বাহু নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পুনর্গঠনকারী কিছু কোষ শরীরের কোথায় ছিল সেই অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যও বহন করে।
একবার না, বারবার
অ্যাক্সোলটলের এমন পুনর্গঠনের ক্ষমতা শুধু একবার ঘটে তা না কিন্তু! পূর্ণবয়স্ক অবস্থাতেও এটি জটিল অঙ্গ পুনর্গঠন করতে পারে। এ কারণেই গত দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে সালাম্যান্ডারের পুনর্জন্ম বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। ১৭৬৮ সালেই প্রকৃতিবিদ লাজারো স্পালানজানি সালাম্যান্ডারের হাত-পা ও লেজ পুনর্গঠনের ক্ষমতা নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। আধুনিক যুগে অ্যাক্সোলটল সেই গবেষণার অন্যতম প্রধান প্রাণী হয়ে উঠেছে।
২০১৮ সালে বিজ্ঞানীরা অ্যাক্সোলটলের জিনোমের একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাসেম্বলি প্রকাশ করেন। জিনোমটির আকার প্রায় ৩২ বিলিয়ন বেস পেয়ার, মানুষের জিনোমের প্রায় দশগুণ। বিশাল এই জিনোম বিশ্লেষণ করা ছিল বেশ বড় এক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। গবেষকেরা আশা করছেন, এর জিন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বোঝা গেলে অঙ্গ পুনর্জন্মের আণবিক রহস্য আরও পরিষ্কার হবে।

এখান থেকেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, মানুষের কাটা হাত কি কোনো দিন অ্যাক্সোলটলের মতো আবার গজানো সম্ভব হবে?
এখন পর্যন্ত আমরা তা জানি না। অ্যাক্সোলটলের পুনর্জন্ম নিয়ে গবেষণার লক্ষ্যগুলোর একটি অবশ্যই মানুষের ক্ষত সারানো, স্কার কমানো, স্নায়ু বা টিস্যু পুনর্গঠন এবং রিজেনারেটিভ মেডিসিনকে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু অ্যাক্সোলটল কীভাবে পা তৈরি করে তা জানা আর মানুষের শরীরে একই প্রক্রিয়া চালু করতে পারা এক বিষয় না। মানুষের অঙ্গ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়া অনেকটাই ভিন্ন।
গবেষণাগারে আছে অগণিত, পাওয়া যাচ্ছে না প্রাকৃতিক নিবাসেই!
পৃথিবীর অসংখ্য গবেষণাগার ও অ্যাকুয়ারিয়ামে অ্যাক্সোলটল পাওয়া গেলেও নিজেদের প্রাকৃতিক আবাসে এরা ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। সোচিমিলকোর পুরনো জরিপে ১৯৯৮ সালে প্রতি বর্গকিলোমিটারে আনুমানিক ৬ হাজার অ্যাক্সোলটল পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৮ সালে তা নেমে আসে মাত্র ১০০-তে!
২০১৪ সালের হিসাবে ছিল মাত্র ৩৬টির মতো! নগরায়ণ, পানিদূষণ, আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং তেলাপিয়া ও কার্পের মতো বহিরাগত মাছকে এই পতনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ধরা হয়। এসব মাছ অ্যাক্সোলটলের ডিম ও বাচ্চা খেতে পারে এবং খাবারের জন্য প্রতিযোগিতাও তৈরি করে।
পরিস্থিতি এখন আরও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে ইউনামের গবেষকেরা প্রায় এক দশক পর নতুন করে বন্য অ্যাক্সোলটল গণনার কাজ শুরু করেন। সরাসরি জীবিত বন্য অ্যাক্সোলটল ধরা না পড়লেও পানির নমুনায় তাদের এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ পাওয়া গেছে, যা অন্তত কিছু প্রাণী এখনও খালগুলোতে টিকে আছে বলে ইঙ্গিত দেয়। ইউনাম জানিয়েছে, নতুন আদমশুমারির ফল তখনও প্রক্রিয়াধীন ছিল।
তবে আশার জায়গাও আছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বন্দী অবস্থায় জন্মানো অ্যাক্সোলটলকে পুনরুদ্ধার করা সোচিমিলকোর চিনাম্পা জলাভূমি এবং একটি কৃত্রিম জলাভূমিতে ছেড়ে দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রাণীগুলো সেখানে টিকে ছিল, খাবার সংগ্রহ করেছিল এবং কিছু পুনরায় ধরা পড়া প্রাণীর ওজনও বেড়েছিল।

অ্যাক্সোলটল তাই শুধু এমন এক প্রাণীই না, যার কাটা পা আবার গজায়। মেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহে ক্ষত সারানোর আরও একটি উপায় রয়েছে- এটাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে প্রাণীটি। এটি এমন এক উপায়, যার ফলে শরীর শুধু ভাঙা জায়গা জোড়া লাগায় না, হারানো অঙ্গটি নতুন করে নির্মাণও করতে পারে!
কিন্তু যে প্রাণীর শরীর নিজেকে এত অসাধারণভাবে পুনর্গঠন করতে পারে, সে নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া আবাসস্থল পুনর্গঠন করতে পারে না। সেই কাজটি মানুষকেই করতে হবে। হয়তো অ্যাক্সোলটলের শরীর একদিন আমাদের শেখাবে কীভাবে মানুষের ক্ষত আরও ভালোভাবে সারানো যায়। তার আগে সোচিমিলকো আমাদের আরও জরুরি একটি শিক্ষা দিচ্ছে- কোনো প্রাণীর জিনোম সংরক্ষণ করা আর প্রকৃতিতে সেই প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখা এক জিনিস না। তাই এই প্রাণীগুলোর সংরক্ষণেও প্রয়োজন সকলের আন্তরিক পদক্ষেপ।
ফিচার ইমেজ: Paul Starosta, Stone Collection, Getty Images
রেফারেন্স
- The axolotl genome and the evolution of key tissue formation regulators – 24 January 2018 – Nature
- The axolotl limb blastema: cellular and molecular mechanisms driving blastema formation and limb regeneration in tetrapods – 11 May 2015 – Regeneration / PMC
- Cells keep a memory of their tissue origin during axolotl limb regeneration – 01 July 2009 – Nature
- Axolotl as a Model to Study Scarless Wound Healing in Vertebrates: Role of the Transforming Growth Factor Beta Signaling Pathway – 2013 – Wound Repair and Regeneration / PMC
- Movement ecology of captive-bred axolotls in restored and artificial wetlands: Conservation insights for amphibian reintroductions and translocations – 30 April 2025 – PLOS ONE