Skip to main content

Ridge Bangla

অমর জেলিফিশ: যে প্রাণী বার্ধক্য থেকে আবার তরুণ হতে পারে!

মাত্র কয়েক মিলিমিটার লম্বা একটি স্বচ্ছ জেলিফিশ। চোখে পড়লেও হয়তো বিশেষ কিছু মনে হবে না। সমুদ্রের পানিতে ভেসে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণীর একটি বলেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়। অথচ বিপদে পড়লে এই প্রাণী এমন এক কাজ করতে পারে, যা মানুষের পক্ষে এখনো কল্পনা করাও কঠিন। বয়স বাড়ার পর আবার জীবনের আগের পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে সে!

প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম টুরিটপসিস ডোরনাই (Turritopsis dohrnii)। সাধারণভাবে এটি পরিচিত ‘ইমর্টাল জেলিফিশ’ বা ‘অমর জেলিফিশ’ নামে। প্রায় সাড়ে চার মিলিমিটার আকারের এই হাইড্রোজোয়ান জেলিফিশ শারীরিক আঘাত, অনাহার কিংবা প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হলে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থা থেকে আবার পলিপ পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। এরপর সেই পলিপ থেকে জন্ম নিতে পারে নতুন মেডুসা। অর্থাৎ জীবনচক্রটি সামনে এগিয়ে শেষ হয়ে যাওয়ার বদলে যেন উল্টো দিকে ঘুরে আবার শুরুতে ফিরে যায়!

তবে ‘অমর’ শব্দটি শুনে মনে হতে পারে এই জেলিফিশকে কোনোভাবেই হত্যা করা যায় না। আসল বিষয় হলো- শিকারি প্রাণী তাকে খেয়ে ফেলতে পারে, রোগে মারা যেতে পারে কিংবা এমন আঘাত পেতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়। তার অমরত্ব মূলত জৈবিক বার্ধক্যের নির্দিষ্ট সীমা এড়িয়ে জীবনচক্র পুনরায় শুরু করার ক্ষমতা। তাই বিজ্ঞানীরা সাধারণত একে সম্ভাব্য ‘বায়োলজিক্যাল ইমর্টালিটি’র উদাহরণ হিসেবে দেখেন, শারীরিকভাবে অবিনাশী কোনো প্রাণী হিসেবে না।

যে আবিষ্কার হওয়ার কথাই ছিল না!

টুরিটপসিস ডোরনাই নতুন আবিষ্কৃত কোনো প্রাণী না। জার্মান জীববিজ্ঞানী অগাস্ট ভাইসমান ১৮৮৩ সালে প্রজাতিটি প্রথম বর্ণনা করেন। এর মূল নমুনা এসেছিল ইতালির নেপলস অঞ্চল থেকে। বর্তমান ট্যাক্সোনমিতে এটি নিডারিয়া পর্বের হাইড্রোজোয়া শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

কিন্তু এর সবচেয়ে অস্বাভাবিক ক্ষমতার দিকে বিজ্ঞানীদের নজর পড়ে প্রায় এক শতাব্দী পরে। ১৯৮০-র দশকে গবেষক ক্রিশ্চিয়ান সোমার ও জর্জিও বাভেস্ত্রেলো টুরিটপসিসের পলিপ সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। স্বাভাবিক নিয়মে পলিপ থেকে মেডুসা তৈরি হওয়ার পর সেই মেডুসা বড় হবে, যৌন প্রজনন করবে এবং একসময় মারা যাবে, এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল।

Image source: © Karajohn/Shutterstock.com
Image source: © Karajohn/Shutterstock.com

কিন্তু কিছু মেডুসা মারা যাওয়ার বদলে পাত্রের তলায় গিয়ে পরিবর্তিত হতে শুরু করল। তারা আবার পলিপে পরিণত হচ্ছিল। জীবনের ঘড়ি যেন সামনের দিকে না গিয়ে হঠাৎ পেছনে ঘুরে যাচ্ছিল! এই পর্যবেক্ষণই পরবর্তী কয়েক বছরের গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে।

১৯৯৬ সালে স্টেফানো পিরাইনো, ফের্দিনান্দো বোয়েরো, বি. অ্যাশবাখ ও ভি. শ্মিডের গবেষণায় বিষয়টি শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পায়। দ্য বায়োলজিক্যাল বুলেটিনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, অল্পবয়সী থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মেডুসা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাণী আবার কলোনিয়াল হাইড্রয়েড বা পলিপ পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। গবেষকেরা একে প্রাণিজগতে ব্যতিক্রমী অন্টোজেনি রিভার্সাল, অর্থাৎ ব্যক্তিজীবনের বিকাশের উল্টো যাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেন।

সাধারণ জেলিফিশের জীবন যেখানে শেষ, সেখানেই শুরু এর দ্বিতীয় জীবন

টুরিটপসিস ডোরনাইয়ের স্বাভাবিক জীবনও অন্য অনেক হাইড্রোজোয়ান জেলিফিশের মতো নিষিক্ত ডিম থেকে শুরু হয়। ডিম থেকে তৈরি হয় ক্ষুদ্র প্ল্যানুলা লার্ভা। এটি কোনো শক্ত পৃষ্ঠে বসে ধীরে ধীরে পলিপে পরিণত হয়। পলিপ একা থাকে না, সাধারণত কলোনি গড়ে তোলে এবং অযৌন প্রজননের মাধ্যমে ছোট ছোট মেডুসা তৈরি করে।

নতুন মেডুসার আকার প্রায় ১ মিলিমিটার হতে পারে। সেখান থেকে বেড়ে একটি পরিণত টুরিটপসিস ডোরনাই কয়েক মিলিমিটার আকার ধারণ করে। পরীক্ষাগারে করা গবেষণায় তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মেডুসাকে প্রাপ্তবয়স্ক হতে দেখা গেছে।

অন্য অনেক জেলিফিশের ক্ষেত্রে যৌন পরিপক্বতা ও প্রজননের পর জীবনচক্র ক্রমে মৃত্যুর দিকে যায়। টুরিটপসিস ডোরনাইয়ের বিশেষত্ব এখানেই। অনাহার, আঘাত, বয়সজনিত দুর্বলতা বা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে মেডুসা কখনো কখনো তার স্বাভাবিক বিকাশপথ অনুসরণ না করে উল্টো পথে যাত্রা শুরু করে।

Image source: Takashi Murai/The New York Times Syndicate/Redux
Image source: Takashi Murai/The New York Times Syndicate/Redux

প্রথমে তার ঘণ্টার মতো দেহটি সঙ্কুচিত হয়। সাঁতার কাটার ক্ষমতা কমে যায়, টেন্টাকলগুলো শোষিত হয়ে যেতে থাকে। একসময় প্রাণীটি সমুদ্রতল বা অন্য কোনো পৃষ্ঠে বসে ছোট একধরনের সিস্ট পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। এরপর সেই সিস্টের ভেতরে কোষ ও টিস্যুর ব্যাপক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়। অবশেষে তৈরি হয় নতুন পলিপ। সেই পলিপ আবার কলোনি গড়ে তোলে এবং সেখান থেকে নতুন মেডুসা বের হয়, অর্থাৎ একই জেনেটিক বংশধারা আবার জীবনচক্রের তরুণ পর্যায়ে ফিরে এলো!

এই আশ্চর্য পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে সেলুলার রিপ্রোগ্রামিং এবং ট্রান্সডিফারেনশিয়েশন নামের একটি প্রক্রিয়া।

আমাদের শরীরের বেশিরভাগ পরিণত কোষ নির্দিষ্ট কাজের জন্য বিশেষায়িত। একটি পেশির কোষ সাধারণত হঠাৎ করে স্নায়ুকোষে পরিণত হয় না। কিন্তু ট্রান্সডিফারেনশিয়েশনের ক্ষেত্রে একটি পরিণত ও বিশেষায়িত কোষ তার পরিচয় বদলে অন্য ধরনের বিশেষায়িত কোষে রূপ নিতে পারে।

টুরিটপসিস ডোরনাইয়ের মেডুসা থেকে পলিপে ফেরার সময় এমন ব্যাপক কোষীয় পুনর্গঠন ঘটে। তবে বর্তমান গবেষণা বলছে, পুরো ঘটনাকে শুধু ট্রান্সডিফারেনশিয়েশন বললে বিষয়টি অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়। ২০১৯ সালের ট্রান্সক্রিপটোম গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনচক্র উল্টে যাওয়ার সময় ট্রান্সডিফারেনশিয়েশনের পাশাপাশি অ্যাসিমেট্রিক সেল ডিভিশন, নির্দিষ্ট কোষের নিয়ন্ত্রিত মৃত্যু এবং টিস্যুর পুনর্বিন্যাসের মতো প্রক্রিয়াও সক্রিয় থাকে।

তাহলে কি বিজ্ঞানীরা ‘অমরত্বের জিন’ খুঁজে পেয়েছেন?

না! অন্তত এখনো না। ২০২২ সালে প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস বা পিএনএএসে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণায় টুরিটপসিস ডোরনাইয়ের জিনোমকে কাছাকাছি সম্পর্কিত কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় একইভাবে বারবার তরুণ হতে না পারা টুরিটপসিস রুব্রা প্রজাতির সঙ্গে তুলনা করা হয়।

গবেষকেরা প্রায় ১ হাজার বার্ধক্য ও ডিএনএ মেরামতসংশ্লিষ্ট জিন পর্যবেক্ষণ করেন। টুরিটপসিস ডোরনাইয়ে ডিএনএ প্রতিলিপি ও মেরামত, টেলোমিয়ার রক্ষণাবেক্ষণ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ, স্টেম সেল জনসংখ্যা এবং কোষের মধ্যকার যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি জিন ও জেনেটিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য পাওয়া যায়।

Image courtesy: Encyclopedia Britannica
Image courtesy: Encyclopedia Britannica

এর মানে এই নয় যে একটি মাত্র ‘ইমর্টালিটি জিন’ প্রাণীটিকে মৃত্যুহীন করেছে। বরং গবেষকেরা মনে করছেন, একাধিক জৈবিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে তার এই পুনর্যৌবন সম্ভব করছে।

আরেকটি গবেষণায় টুরিটপসিস ডোরনাইয়ের প্রায় ৪৩৫.৯ মেগাবেস আকারের ড্রাফট জিনোম তৈরি করা হয় এবং ২৩ হাজারের বেশি উচ্চ-আস্থার জিন শনাক্ত করা হয়। গবেষণাটি বিভিন্ন জীবনপর্যায়ে কোন জিন কতটা সক্রিয় হয়, সেটিও বিশ্লেষণ করে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে বারবার পুনর্যৌবনের মলিকিউলার ভিত্তি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স তৈরি করেছে।

কিন্তু ‘একই প্রাণী’ কি সত্যিই ফিরে আসে?

একটি পূর্ণবয়স্ক মেডুসা সিস্ট হয়ে পলিপে ফিরে গেল। সেই পলিপ আবার কলোনি তৈরি করল এবং সেখান থেকে একাধিক মেডুসা বের হলো। তাহলে এগুলোর কোনটিকে সেই পুরনো জেলিফিশ বলা হবে?

জেনেটিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, কিন্তু দেহের গঠন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এমনকি একটি পলিপ কলোনি থেকে একাধিক মেডুসাও তৈরি হতে পারে। ফলে মানুষের মতো একটি নিরবচ্ছিন্ন ব্যক্তিসত্তার ধারণা টুরিটপসিসের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন।

মানুষ কি একদিন একইভাবে বয়স ফিরিয়ে দিতে পারবে?

মানুষের বার্ধক্য একক কোনো প্রক্রিয়া না। সময়ের সঙ্গে ডিএনএ-র ক্ষতি, কোষীয় সেনেসেন্স, টেলোমিয়ারের পরিবর্তন, প্রোটিনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং স্টেম সেলের সক্ষমতা হ্রাসসহ অসংখ্য পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটে।

জেলিফিশটির পুনর্যৌবন নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীদের সেল রিপ্রোগ্রামিং, টিস্যু পুনর্গঠন, ডিএনএ মেরামত এবং বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন নিয়ন্ত্রণ বোঝার একটি অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক মডেল দিয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এর সম্ভাব্য গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

Image courtesy: El Pais
Image courtesy: El Pais

কিন্তু এখান থেকে মানুষের জন্য ‘অমরত্বের ওষুধ’ তৈরি হয়ে যাবে- এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখন নেই। মানুষ ও একটি কয়েক মিলিমিটার আকারের হাইড্রোজোয়ানের শারীরবৃত্তীয় জটিলতার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। মানুষের পরিণত কোষকে ব্যাপকভাবে রিপ্রোগ্রাম করার চেষ্টা আবার অনিয়ন্ত্রিত কোষবৃদ্ধি ও ক্যানসারের মতো সমস্যার সঙ্গেও জড়িয়ে যেতে পারে। তাই জেলিফিশের প্রক্রিয়াকে সরাসরি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করার চেয়ে এর মৌলিক নীতিগুলো বোঝাই এখন বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য।

সত্যিকারের অমর না, তবু জীবনের নিয়মে বিরল ব্যতিক্রম

জীবনকে আমরা সাধারণত একমুখী হিসেবে দেখি- জন্ম, বিকাশ, যৌবন, বার্ধক্য এবং মৃত্যু। টুরিটপসিস দেখিয়েছে, প্রকৃতিতে এই নিয়ম সব প্রাণীর জন্য সমানভাবে খাটে না। অন্তত একটি প্রাণী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিকাশের প্রক্রিয়া উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

সে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। সমুদ্রে তার জন্য শিকারি আছে, রোগ আছে, দুর্ঘটনা আছে। কিন্তু শরীর নিজে যখন বয়স ও ক্ষতির মুখে পড়ে, তখন টুরিটপসিস ডোরনাইয়ের হাতে এমন একটি বিকল্প রয়েছে যা আমাদের নেই: পুরনো শরীরের পরিচয় ভেঙে আবার জীবনের আগের অধ্যায়ে ফিরে যাওয়া।

কয়েক মিলিমিটারের এই প্রাণীটি মানুষের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষার উত্তর না। বরং আরও মৌলিক একটি প্রশ্নের জীবন্ত উদাহরণ: বার্ধক্য কি জীবনের অনিবার্য একমুখী যাত্রা, নাকি সঠিক জৈবিক প্রক্রিয়া জানা গেলে এর অন্তত কিছু অংশকে উল্টো দিকে ঘোরানো সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই। কিন্তু টুরিটপসিস ডোরনাই দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতি অন্তত একবার সেই অসম্ভব কাজটি করে দেখিয়েছে!

ফিচার ইমেজ: Yiming Chen / Getty Images

রেফারেন্স

This post was viewed: 12

আরো পড়ুন