Skip to main content

Ridge Bangla

ডলারের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের কী ক্ষতি হয়?

বাজারে চাল, ডাল বা ভোজ্যতেল কিনতে গিয়ে আপনি হয়তো ডলারের কথা ভাবেন না। বাসে ওঠার সময়ও মাথায় আসে না বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের কথা। সন্তানের স্কুলের খরচ, চিকিৎসার ওষুধ, নতুন মোবাইল ফোন কিংবা বাসাভাড়া দেওয়ার সময়ও ডলারের সঙ্গে সরাসরি কোনো লেনদেন নেই অধিকাংশ মানুষের।

তারপরও বাংলাদেশে ডলারের দাম বাড়লে এসব খরচের অনেকগুলোই বাড়তে পারে। কিন্তু কেন?

কারণ বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জ্বালানি থেকে শিল্পের কাঁচামাল, গম থেকে ভোজ্যতেল, সার থেকে ওষুধ তৈরির উপকরণ, যন্ত্রপাতি থেকে ইলেকট্রনিক পণ্য, অসংখ্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়। আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশের মূল্য পরিশোধ করা হয় মার্কিন ডলারে।

ফলে ১ ডলার কিনতে যখন আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগে, তখন বিষয়টা কেবল আর ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জের থাকে না। ধীরে ধীরে সেটার প্রভাব এসে পড়ে বাজারের পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয়, ব্যবসার উৎপাদন খরচ, চাকরির বাজার এবং শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারের মাসিক বাজেটেও।

ডলারের দাম বাড়া বলতে আসলে কী বোঝায়?

ধরা যাক, আগে ১ মার্কিন ডলার কিনতে ১০০ টাকা লাগত। এখন লাগছে ১২০ টাকা। একই ১০০ ডলারের কোনো পণ্য কিনতে আগে বাংলাদেশি আমদানিকারকের প্রয়োজন হতো ১০,০০০ টাকা। এখন লাগবে ১২,০০০ টাকা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির ডলারমূল্য একটুও না বাড়লেও শুধু টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বাংলাদেশি ক্রেতার ব্যয় ২০ শতাংশ বেড়ে গেল।

অর্থনীতির ভাষায় এখানে ডলারের দাম বাড়ার পাশাপাশি বলা যায়, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমেছে বা টাকা ডেপ্রিসিয়েট (Depreciate) করেছে।

সাম্প্রতিক বাস্তবতাও বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের রেফারেন্স রেট ছিল প্রায় ১২২.৮৮ টাকা। একই সময়ে আন্তব্যাংক বাজারের Weighted Average Rate ছিল প্রায় ১২২.৮৫ টাকা।

কয়েক বছর আগে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report অনুযায়ী, ২০২২ সালের শুরুতে প্রতি ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৬ টাকার আশপাশে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তা ১১০ টাকার কাছাকাছি চলে যায়। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে ডলারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে প্রশ্ন হলো, আপনি তো প্রতিদিন ডলার কিনছেন না। তাহলে আপনার ক্ষতি কোথায়?

প্রথম ধাক্কা আসে আমদানি করা পণ্যে

ডলারের দাম বাড়ার সবচেয়ে সহজ এবং সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি করা পণ্যের ওপর। ধরা যাক, কোনো আমদানিকারক বিদেশ থেকে ১০,০০০ ডলারের একটি পণ্য আনছেন। ১ ডলারে ১০০ টাকা হলে শুধু পণ্যের দাম বাবদ তার প্রয়োজন ১০,০০০ টাকা। ডলার ১২০ টাকা করে হলে একই পণ্যের জন্য দিতে হবে ১২ লাখ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন, বীমা, শুল্ক, ব্যাংক চার্জ, গুদামজাতকরণ এবং ব্যবসার মুনাফা যোগ হবে। শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের একটি বড় অংশ গিয়ে পড়ে ক্রেতার ওপর।

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের Custom-based merchandise import বা শুল্কভিত্তিক পণ্য আমদানির মূল্য ছিল প্রায় ৬৭.৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৮৯ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে ছিল খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক পণ্য ও যন্ত্রপাতি। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন মানে শুধু বিদেশি গাড়ি বা আইফোনের দাম বেড়ে যাওয়া না। এর প্রভাব এমন পণ্যেও পড়তে পারে, যা প্রতিদিন আমাদের রান্নাঘরেই ব্যবহার হয়।

চাল-ডাল দেশেই হয়, তবু দাম বাড়ে কেন?

এখানেই বিনিময় হারের প্রভাব কিছুটা জটিল হয়ে ওঠে। কোনো পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদিত হলেই যে তার সঙ্গে ডলারের সম্পর্ক নেই, তা না। একজন কৃষকের ধান উৎপাদনের জন্য সার লাগে। সেচের জন্য ডিজেল বা বিদ্যুৎ লাগে। কৃষিযন্ত্রের যন্ত্রাংশ লাগতে পারে। ফসল বাজারে আনতে ট্রাক লাগে। প্যাকেজিংয়ের উপকরণ লাগতে পারে।

এই সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন জায়গায় বিদেশি জ্বালানি, কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার রয়েছে। ডলারের দাম বেড়ে যদি এসব উপকরণের দাম বাড়ে, তাহলে উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে। কৃষক থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ ছড়িয়ে যায়। এ কারণেই ডলারের মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ঘটনাকে অর্থনীতিতে বলা হয় Exchange rate pass-through। সহজভাবে বললে, মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কতটা শেষ পর্যন্ত দেশের পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতিতে পৌঁছায়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা কাঁচামালে

বাংলাদেশের আমদানির কাঠামোর দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত মোট পণ্য আমদানির প্রায় ৬২.৭৭ শতাংশই ছিল Intermediate goods বা মধ্যবর্তী পণ্য। অর্থাৎ এসব পণ্যের বড় অংশ সরাসরি ভোক্তা কিনছেন না। এগুলো কোনো না কোনো পণ্য তৈরির কাঁচামাল বা উৎপাদন উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখানেই ডলারের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। একটি কারখানা বিদেশ থেকে কাঁচামাল আনল। ডলারের কারণে তার দাম বাড়ল। কারখানাটির উৎপাদন খরচ বাড়ল। উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ানো হলো। সেই পণ্য ব্যবহার করে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আবার আরেকটি পণ্য তৈরি করল। তার খরচও বাড়ল। এভাবে ডলারের বাড়তি দাম পুরো সাপ্লাই চেইনে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভোজ্যতেল, গম ও নিত্যপণ্যে চাপ

বাংলাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের জন্যও আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে পর্যন্ত সময়ে দেশে প্রায় ২৫২ কোটি ডলারের খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে গম আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। একই সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩০ কোটি ডলার। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও টাকা দুর্বল হলে বাংলাদেশি আমদানিকারকের খরচ বেড়ে যায়। আর যদি একই সময়ে দুটি ঘটনা ঘটে, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামও বাড়ে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার দামও কমে, তাহলে বাংলাদেশি ভোক্তা কার্যত দ্বিগুণ চাপের মুখে পড়েন।

জ্বালানির মাধ্যমে ডলারের প্রভাব পৌঁছে যায় প্রায় সবখানে

জ্বালানির দাম বাড়লে বাস ও ট্রাকের চলাচলে খরচ বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে সবজি থেকে নির্মাণসামগ্রী পর্যন্ত প্রায় সব পণ্যের বাজারজাতকরণ খরচ বাড়তে পারে। গ্যাস ও জ্বালানির ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও চাপের মুখে পড়ে। কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।

২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি ব্যয় বেড়ে ৬১.৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এপ্রিল মাসে আমদানি ব্যয়ের বার্ষিক বৃদ্ধি ছিল ২১.৪২ শতাংশ। এর পেছনে পেট্রোলিয়াম, এলএনজি এবং সারের উচ্চ আমদানি ব্যয় বড় ভূমিকা রেখেছিল।

বিশ্ববাজারের দাম বাড়ার পাশাপাশি টাকা দুর্বল হলে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে সরকারের বা আমদানিকারকের আরও বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। সেখান থেকে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে পৌঁছে যায়।

ওষুধ ও চিকিৎসার খরচও বাড়তে পারে

বাংলাদেশে ওষুধশিল্প শক্তিশালী হলেও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত অনেক এপিআই (Active Pharmaceutical Ingredient), রাসায়নিক উপাদান এবং যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আসে। ফলে ডলার ব্যয়বহুল হলে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে।

একইভাবে বিদেশ থেকে আমদানি করা চিকিৎসা সরঞ্জাম, ডায়াগনস্টিক মেশিন, সার্জিক্যাল সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ওষুধের খরচও বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে বাড়তে পারে। তাই ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব হাসপাতালের বিল কিংবা ওষুধের দোকান পর্যন্ত পৌঁছানো অস্বাভাবিক না।

মোবাইল, ল্যাপটপ ও প্রযুক্তিপণ্য আরও ব্যয়বহুল হয়

স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং সেগুলোর যন্ত্রাংশের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। এখানে ডলারের প্রভাব অনেক বেশি সরাসরি পড়ে।

একটি ল্যাপটপ আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০০ ডলার হলে ১ ডলার ১০০ টাকা হিসাবে মূল দাম দাঁড়ায় ৫০ হাজার টাকা। একই ডলার ১২৩ টাকা হলে তা দাঁড়ায় ৬১,৫০০ টাকা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে ল্যাপটপের দাম একই থাকার পরও শুধু বিনিময় হারের কারণে টাকায় মূল্য ১১,৫০০ টাকা বেড়ে যেতে পারে। এরপর শুল্ক, কর, পরিবহন ও বিক্রেতার খরচ আলাদাভাবে যুক্ত হবে।

বিদেশে পড়াশোনা করা পরিবারের খরচ হঠাৎ বেড়ে যায়

ডলারের দাম বাড়ার আরেকটি অত্যন্ত সরাসরি শিকার বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবার।

ধরা যাক, কোনো শিক্ষার্থীকে বছরে ২০ হাজার ডলার টিউশন ফি দিতে হয়। প্রতি ডলার ১০০ টাকা হলে প্রয়োজন হয় ২০ লাখ টাকা। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হলে প্রয়োজন প্রায় ২৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। একই বিশ্ববিদ্যালয়, একই কোর্স এবং একই টিউশন ফি। কিন্তু বাংলাদেশের পরিবারটির ব্যয় বেড়ে গেল প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্যবীমা ও অন্যান্য বিদেশি খরচ যুক্ত হয়ে এই ব্যবধান আরও বড় হয়।

বিদেশ ভ্রমণও হয়ে যায় ব্যয়বহুল

একই কথা বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। হোটেলের ভাড়া, খাবার, স্থানীয় পরিবহন, প্লেনের টিকিটের আন্তর্জাতিক খরচ এবং কেনাকাটার জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে বেশি টাকা লাগে। ফলে ডলার শক্তিশালী হওয়া এবং টাকা দুর্বল হওয়ার সময় বিদেশ ভ্রমণের প্রকৃত খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

ব্যবসার খরচ বাড়ে, তারপর চাপ পড়ে চাকরিতে

ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর একটি হলো ব্যবসা ও বিনিয়োগে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা প্রযুক্তি কেনে, তাদের মূলধনী ব্যয় বেড়ে যায়। একটি মেশিনের দাম যদি ১ লাখ ডলার হয়, তাহলে ডলার ১০০ টাকা থেকে ১২৩ টাকায় গেলে শুধু বিনিময় হারের কারণেই সেটি কিনতে ২৩ লাখ টাকা বেশি লাগবে।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে তখন কয়েকটি পথ খোলা থাকে। পণ্যের দাম বাড়ানো, মুনাফা কমানো, নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করা অথবা খরচ কমানো। খরচ কমানোর অর্থ কখনো নতুন নিয়োগ কমিয়ে দেওয়া, বেতন বৃদ্ধি পিছিয়ে দেওয়া কিংবা ব্যবসার সম্প্রসারণ বন্ধ করাও হতে পারে। তাই ডলারের মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু পণ্যের দামেই না, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতেও দেখা দিতে পারে।

ঋণের খরচও কেন বাড়তে পারে?

ডলারের দাম বৃদ্ধি যদি মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি নিতে পারে। এর একটি প্রধান অস্ত্র সুদের হার। সুদের হার বাড়লে ব্যাংকঋণ ব্যয়বহুল হয়। ব্যবসার বিনিয়োগের খরচ বাড়ে। বাড়ি বা অন্যান্য ঋণ নেওয়াও কঠিন হয়।

বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নকে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ ডলার সংকটের প্রভাব কখনো দুটি ধাপে আসে। প্রথমে দাম বাড়ে, পরে সেই মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে নেওয়া নীতির কারণে ঋণের খরচ বাড়তে পারে।

সরকারের খরচ বাড়লে সাধারণ মানুষের কী?

সরকারেরও বিদেশি মুদ্রায় ঋণ এবং বিভিন্ন আমদানি ব্যয় রয়েছে। টাকার মূল্য কমে গেলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে সরকারের বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

আইএমএফ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছে, মুদ্রার অবমূল্যায়ন বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্যের মতো খাতে আমদানিনির্ভর ভর্তুকির টাকার অঙ্কও বেড়ে যেতে পারে। এর অর্থ বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ। সরকার তখন ভর্তুকি কমাতে পারে, কিছু পণ্যের প্রশাসনিক দাম বাড়াতে পারে অথবা অন্য খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এসব সিদ্ধান্তের শেষ প্রভাবও নাগরিকদের ওপর পড়তে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ

মূল্যস্ফীতি সবার ওপর সমান আঘাত করে না। একজন উচ্চ আয়ের মানুষের মাসিক ব্যয় ১০ শতাংশ বেড়ে গেলে তিনি সঞ্চয়ের পরিমাণ কিছুটা কমাতে পারেন। কিন্তু এমন একটি পরিবার, যাদের আয়ের প্রায় পুরোটাই খাবার, বাসা, চিকিৎসা ও যাতায়াতে চলে যায়, তাদের সামনে সেই সুযোগ থাকে না। এ কারণেই মূল্যস্ফীতিকে অনেক সময় গরিবদের ওপর একধরনের অদৃশ্য কর বলা হয়।

২০২৬ সালের এপ্রিলের Bangladesh Development Update-এ বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১.৪ শতাংশে ওঠার অনুমান দেওয়া হয়, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭ শতাংশ।

জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বাংলাদেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৩২ শতাংশে নেমেছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.২৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমেছে মানে কিন্তু পণ্যের দাম কমে গেছে, এমন না। এর অর্থ সাধারণভাবে দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি পরিবারের ওপর প্রভাব কেমন হতে পারে?

ধরা যাক, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক আয় ৬০ হাজার টাকা। তাদের নিয়মিত খরচের মধ্যে রয়েছে খাবার, বাসা, পরিবহন, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য।

ডলারের দাম বাড়ার ফলে যদি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব খরচের বড় অংশ বৃদ্ধি পায়, অথচ পরিবারের আয় একই থাকে, তাহলে তাদের কাগজে-কলমে আয় ৬০ হাজার টাকাই থাকবে। কিন্তু প্রকৃত আয় কমে যাবে। অর্থাৎ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে তারা আগের মতো পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে পারবে না।

প্রথমে কমে সঞ্চয়। এরপর কমে বাইরে খাওয়া, পোশাক কেনা কিংবা বিনোদনের খরচ। চাপ আরও বাড়লে মানুষ পুষ্টি, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও খরচ কমাতে বাধ্য হতে পারে। এই জায়গাতেই একটি বিনিময় হার সংকট সামাজিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

তাহলে কি ডলারের দাম বাড়লে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

না, এক্ষেত্রে অর্থনীতির চিত্র পুরোপুরি একমুখী নয়। ডলারের দাম বাড়লে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান একই পরিমাণ ডলার দেশে এনে টাকায় বেশি অর্থ পেতে পারে। বিদেশ থেকে যারা রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের পরিবারের ক্ষেত্রেও একই সুবিধা হতে পারে।

ধরা যাক, একজন প্রবাসী মাসে ৫০০ ডলার পাঠান। প্রতি ডলার ১০০ টাকা হলে পরিবার পাবে ৫০ হাজার টাকা। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হলে একই ৫০০ ডলারের বিপরীতে টাকার অঙ্ক হবে ৬১,৫০০ টাকা। এই কারণেই প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতেও উৎসাহ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ১৯% বেড়ে ৩২.৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর পেছনে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি বাজারমুখী প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হারকেও একটি সহায়ক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে লাভ-ক্ষতির হিসাব আরও অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কোনো রপ্তানিকারকের কাঁচামালও যদি আমদানি করতে হয়, তাহলে বাড়তি ডলার আয়ের একটি অংশ আবার বেশি আমদানি খরচে চলে যেতে পারে।

ডলারের দাম বাড়া কি সবসময় খারাপ?

এখানেও উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলার উপায় নেই।

একটি দেশের মুদ্রার বিনিময় হার যদি কৃত্রিমভাবে খুব শক্তিশালী রাখা হয়, তাহলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে পারে এবং বাজারে ডলারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষাকৃত নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ আরও নমনীয় এক্সচেঞ্জ রেট ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন শুরু করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে দর নির্ধারণের সুযোগ দেয়।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর মূল্যায়নেও বলা হয়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি অধিক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা চালুর পর টাকার বাজার স্থিতিশীল করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে কিছু অগ্রগতি হয়েছিল।

ডলারের দাম বাড়া আপাতদৃষ্টিতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের একটি সংখ্যা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই সংখ্যার সঙ্গে রান্নাঘরের বাজার, বাসভাড়া, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, শিক্ষা, চাকরি এবং একটি পরিবারের সঞ্চয় পর্যন্ত জড়িত। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বিনিময় হারের বড় ও দ্রুত পরিবর্তন সহজেই মূল্যস্ফীতিতে রূপ নিতে পারে।

তারপর সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা দেয় যখন মানুষের আয় একই গতিতে বাড়ে না। ডলারের দাম যদি বাড়ে, পণ্যের দামও বাড়ে, কিন্তু মানুষের আয় সেই গতিতে না বাড়ে, তাহলে কাগজে-কলমে তার বেতন অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তবে সে ক্রমেই দরিদ্র হয়ে পড়ে। এটাই ডলারের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষতি।

ফিচার ইমেজ: REUTERS/Gary Cameron

তথ্যসূত্র

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন