ছোটবেলা থেকে পরিচিত ওয়ার্ল্ড ম্যাপের দিকে তাকালে একটা বিষয় খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হয়- উত্তরে বিশাল গ্রিনল্যান্ড, তার নিচে ইউরোপ ও রাশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড। সেই তুলনায় আফ্রিকা যেন মাঝারি আকারের একটি মহাদেশ। গ্রিনল্যান্ড আর আফ্রিকার আয়তনও চোখে খুব একটা আলাদা মনে হয় না।
কিন্তু বাস্তব পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন। আফ্রিকার আয়তন প্রায় ৩ কোটি ৩ লাখ বর্গ কিলোমিটার। গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে মহাদেশটি প্রায় ১৪ গুণ বড়! যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতকে আফ্রিকার ভেতরে বসিয়েও আরও অনেকটা জায়গা অবশিষ্ট থাকবে। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ওয়ার্ল্ড ম্যাপে সেই বিশাল আফ্রিকাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অনেক ছোট হয়ে আছে!
এই বৈপরীত্য নিয়েই নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিপুল ভোটে ‘Correct the Map’ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর লক্ষ্য প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশনের বদলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, যেখানে মহাদেশগুলোর আপেক্ষিক আয়তন বাস্তবের কাছাকাছি দেখা যায়। জাতিসংঘের পছন্দ ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। বিপক্ষে ছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্র। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

তাহলে এত দিন আমরা কি ‘ভুল’ ওয়ার্ল্ড ম্যাপ দেখে এসেছি? উত্তরটা একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না!
সমস্যার শুরু গোল পৃথিবীকে সমতল করতে গিয়ে
একটি কমলার খোসা ছাড়িয়ে সেটিকে ছিঁড়ে না ফেলে পুরোপুরি সমতল টেবিলের ওপর বিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। কোথাও না কোথাও খোসাটি কুঁচকে যাবে, ফেটে যাবে কিংবা টেনে বড় করতে হবে। ওয়ার্ল্ড ম্যাপ তৈরির সমস্যাও প্রায় একই।
পৃথিবী একটি ত্রিমাত্রিক গোলাকার বস্তু। কিন্তু কাগজ বা কম্পিউটারের পর্দার মানচিত্র দ্বিমাত্রিক। ফলে গোল পৃথিবীকে সমতল মানচিত্রে রূপান্তরের সময় আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব কিংবা দিকের মধ্যে কোনো না কোনোটি বিকৃত হবেই। এমন কোনো সমতল ওয়ার্ল্ড ম্যাপ নেই, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি জায়গার আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব ও দিক একসঙ্গে শতভাগ নিখুঁত থাকবে।
এ কারণেই মানচিত্রবিদেরা বিভিন্ন প্রয়োজনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ‘ম্যাপ প্রজেকশন’ তৈরি করেছেন। সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বিতর্কিতটির নাম ‘মারকেটর প্রজেকশন’।
নাবিকদের জন্য বানানো মানচিত্র কীভাবে বিশ্বকে বদলে দিল
১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর তাঁর বিখ্যাত প্রজেকশন তৈরি করেন। পৃথিবীর দেশগুলো কোনটি কত বড়, তা তুলনা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, বরং লক্ষ্য ছিল জাহাজ চালানো সহজ করা।
মারকেটর মানচিত্রে নির্দিষ্ট কম্পাস দিক ধরে চলার পথ বা ‘রাম্ব লাইন’ সোজা রেখা হিসেবে আঁকা যায়। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার যুগে এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর বৈশিষ্ট্য। আজও নৌ-নেভিগেশনে মারকেটর প্রজেকশনের বিশেষ গুরুত্ব আছে।

কিন্তু এই সুবিধার মূল্য দিতে হয়েছে আয়তনের নির্ভুলতা দিয়ে।
বিষুবরেখা থেকে যত উত্তর বা দক্ষিণে যাওয়া যায়, মারকেটর মানচিত্রে ভূখণ্ড তত বেশি প্রসারিত হতে থাকে। ফলে কানাডা, রাশিয়া, উত্তর ইউরোপ বা গ্রিনল্যান্ডের মতো উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চল বাস্তবের তুলনায় বিশাল দেখায়। অন্যদিকে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা অনেক ভূখণ্ড বাস্তবের তুলনায় ছোট মনে হয়।
সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ড। মারকেটর মানচিত্রে দুটিকে প্রায় কাছাকাছি আয়তনের মনে হতে পারে। বাস্তবে আফ্রিকা প্রায় ১৪টি গ্রিনল্যান্ডের সমান। অর্থাৎ মারকেটর প্রজেকশন ‘ভুল’ নয়। বরং যে কাজে এটি তৈরি হয়েছিল, সেখানে এটি অসাধারণ। সমস্যা তৈরি হয় যখন নৌ-নেভিগেশনের জন্য বানানো একটি মানচিত্রকে পৃথিবীর ভূখণ্ডগুলোর প্রকৃত আয়তন বোঝানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মানচিত্র কি শুধুই ভূগোল?
এই প্রশ্নটিই আফ্রিকার বর্তমান প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছে। সমালোচকদের যুক্তি, মানচিত্র শুধু জায়গা খুঁজে পাওয়ার উপকরণ না। পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের মনেও একধরনের ইমেজ তৈরি করে এটি। স্কুলে বছরের পর বছর এমন একটি মানচিত্র দেখলেন যেখানে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা প্রকৃত অনুপাতের তুলনায় বড় এবং আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা ছোট, সেই দৃশ্য অবচেতনভাবে অঞ্চলগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কেও ধারণা তৈরি করতে পারে।
টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসে জাতিসংঘে যুক্তি দিয়েছেন, মানচিত্র শিক্ষা ও মানুষের কল্পনাকে প্রভাবিত করে এবং পৃথিবী সম্পর্কে সামষ্টিক ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। আফ্রিকান দেশগুলোর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘Correct the Map’ উদ্যোগ তাই কেবল কার্টোগ্রাফির আলোচনাই না, এর সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব, শিক্ষা এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।
সমাধান কি ইকুয়াল আর্থ?
জাতিসংঘ যে বিকল্পটির ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে, তার নাম ‘Equal Earth projection’। ২০১৮ সালে মানচিত্রবিদ বয়ান শাভরিচ, টম প্যাটারসন ও বার্নহার্ড জেনি এটি তৈরি করেন। জনপ্রিয় রবিনসন প্রজেকশনের নান্দনিকতা থেকে ধারণা নিলেও ইকুয়াল আর্থের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি ‘ইকুয়াল-এরিয়া’ প্রজেকশন। অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের আপেক্ষিক আয়তনের অনুপাত ঠিক রাখে। তাই এই মানচিত্রে আফ্রিকা সত্যিকার অর্থেই বিশাল দেখায়। দক্ষিণ আমেরিকাও বড় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা বা রাশিয়ার আয়তন মারকেটর মানচিত্রের তুলনায় অনেক কমে আসে।

কিন্তু ইকুয়াল আর্থও নিখুঁত না। আয়তন ঠিক রাখতে গিয়ে কোথাও কোথাও আকৃতি বিকৃত হয়। দূরত্ব মাপার জন্যও এটি সর্বত্র নির্ভুল না। নৌ-নেভিগেশনের জন্য মারকেটরের মতো সোজা কম্পাস-পথের সুবিধাও এতে পাওয়া যায় না।
পিটার্স, রবিনসন এবং উল্টো পৃথিবী
এই বিতর্কও নতুন না। গল-পিটার্স প্রজেকশন বহুদিন ধরে ভূখণ্ডের আপেক্ষিক আয়তন ঠিক রাখার জন্য পরিচিত। সেখানে আফ্রিকার আকার বাস্তব অনুপাতের কাছাকাছি, কিন্তু মহাদেশগুলোর আকৃতি অনেকটা লম্বা বা চ্যাপ্টা হয়ে যায়। রবিনসন প্রজেকশন আবার আয়তন, আকৃতি ও নান্দনিকতার মধ্যে একটি আপস করার চেষ্টা করে।
এমনকি জাতিসংঘের পতাকার মানচিত্রও আলাদা। সেখানে উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে ‘অ্যাজিমুথাল ইকুইডিস্ট্যান্ট প্রজেকশন’ ব্যবহার করা হয়েছে। আর ‘সাউথ-আপ’ মানচিত্রে দক্ষিণ মেরু থাকে ওপরে। সেটাও মনে করিয়ে দেয়, মানচিত্রে উত্তরকে ওপরেই রাখতে হবে, প্রকৃতিতে এমন কোনো নিয়ম নেই। আমরা সেটাকে স্বাভাবিক মনে করি মূলত দীর্ঘদিনের প্রচলনের কারণে।
এবার কি সত্যিই বদলে যাবে ওয়ার্ল্ড ম্যাপ?
জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের ফলে আগামীকাল থেকেই সব স্কুলের দেয়াল কিংবা সব ডিজিটাল ম্যাপে মারকেটর প্রজেকশন বাতিল হয়ে যাবে- ব্যাপারটা মোটেও এমন কিছু না।
প্রস্তাবটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না। জাতিসংঘ মারকেটর প্রজেকশন নিষিদ্ধও করেনি। বরং সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী ইকুয়াল আর্থের মতো আয়তন-সংরক্ষণকারী মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করেছে।
টোগো জানিয়েছে, তারা নিজেদের স্কুলের ভূগোল শিক্ষার উপকরণে পরিবর্তন আনতে চায়। অন্যান্য দেশ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপরও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। তাদের প্রতিনিধি যুক্তি দিয়েছেন, জাতিসংঘের সামনে আরও জরুরি বৈশ্বিক সমস্যা থাকার সময় কয়েক শতাব্দী পুরনো মানচিত্র নিয়ে বিতর্ক প্রতিষ্ঠানটির অগ্রাধিকারের প্রশ্ন তোলে।
চার শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দেয়ালে ঝুলে থাকা পরিচিত ওয়ার্ল্ড ম্যাপ আমাদের ভুল তথ্য দেয়নি। সেটি এমন একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করেছিল, যার প্রয়োজন ছিল সমুদ্রযাত্রার যুগে। কিন্তু সেই মানচিত্র দিয়ে যখন আমরা পৃথিবীর দেশ ও মহাদেশের ‘আকার’ বুঝতে চাই, তখন আফ্রিকা সত্যিই ছোট হয়ে যায়। ইকুয়াল আর্থের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এখানেই; পৃথিবী বদলায়নি, বদলাচ্ছে তাকে দেখার ফ্রেম।
ফিচার ইমেজ: UHD Paper
তথ্যসূত্র
- How big is Africa really? Why the UN voted to change the world map – 5 Sep 2026 – Al Jazeera
- What different world maps get right – and what they get wrong – 5 Sep 2026 – BBC
- The Equal Earth map projection – 7 August 2018 – International Journal of Geographical Information Science
- Mercator Projection – Encyclopedia Britannica