২০১৪ সালের ৮ মার্চ। কুয়ালালামপুরে তখন গভীর রাত। বিমানবন্দরের রানওয়ে ছেড়ে ধীরে ধীরে আকাশে উঠে গেল মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ইআর; ফ্লাইট নম্বর MH370। গন্তব্য চীনের বেইজিং।
বিমানটিতে ছিলেন ২২৭ জন যাত্রী এবং ১২ জন ক্রু; সব মিলিয়ে ২৩৯ জন মানুষ। কয়েক ঘণ্টা পর তাঁদের কেউ পরিবারকে ফোন করবেন, কেউ ব্যবসায়িক বৈঠকে যোগ দেবেন, কেউ হয়তো ছুটি কাটিয়ে বাড়ি ফিরবেন। সবকিছুই আর দশটা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের মতোই স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু কেউ তখন জানতেন না, এই ফ্লাইট আধুনিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হিসেবে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে রেকর্ডবুকে।
বিমানটি আর কখনো বেইজিং পৌঁছায়নি!
তবে শুধু এই নিখোঁজ হওয়াই না, বিমানটিকে ঘিরে আলোচনার আরও অনেক কারণই রয়েছে। বিমানটি যেন একের পর এক নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন মুছে দিয়েছিল। রেডিও যোগাযোগ বন্ধ হলো, ট্রান্সপন্ডার অদৃশ্য হলো, নির্ধারিত পথ ছেড়ে বিমানটি ঘুরে গেল সম্পূর্ণ অন্যদিকে! এরপরও সেটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা উড়তে থাকল।

তারপর? তারপর পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম সমুদ্রগুলোর একটির দিকে সেটি চলে গেল ২৩৯ জন মানুষকে নিয়ে।
এমএইচ৩৭০ এবং এর ভেতরে থাকা মানুষগুলোর সাথে আসলে কী ঘটেছিল?
শেষ স্বাভাবিক ৪০ মিনিট
এমএইচ৩৭০ কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্থানীয় সময় রাত ১২টা ৪২ মিনিটের দিকে টেক অফ করে। বিমানটির ক্যাপ্টেন ছিলেন ৫৩ বছর বয়সী জাহারি আহমাদ শাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ২৭ বছর বয়সী ফার্স্ট অফিসার ফারিক আবদুল হামিদ।
টেক অফের পর সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল।
বিমানটি ক্রমে ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে যায়। আবহাওয়া বা যান্ত্রিক গোলযোগ নিয়ে ককপিট থেকে কোনো জরুরি বার্তা আসেনি। রাত ১টা ১৯ মিনিটের দিকে মালয়েশিয়ার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এমএইচ৩৭০-কে ভিয়েতনামের হো চি মিন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে।
ককপিট থেকে উত্তর আসে, “Good night Malaysian Three Seven Zero.” এমএইচ৩৭০ থেকে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে দেওয়া এটিই শেষ জবাব।

স্বাভাবিক নিয়মে এর কয়েক মুহূর্ত পরই বিমানের হো চি মিন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা। কিন্তু সেটি আর হয়নি।
রাত ১টা ২০ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে বিমানটি IGARI নামের একটি নেভিগেশন পয়েন্ট অতিক্রম করে। ১টা ২০ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে তার Mode-S প্রতীক রাডার থেকে হারিয়ে যায়। আর রাত ১টা ২১ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের মধ্যে সেকেন্ডারি রাডার থেকেও এমএইচ৩৭০ অদৃশ্য হয়ে যায়।
বিমানটি ঘুরে গিয়েছিল
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রাডার থেকে অদৃশ্য হওয়ার পর এমএইচ৩৭০ যে বিধ্বস্ত হয়নি, তা পরে মালয়েশিয়ার সামরিক রাডার বিশ্লেষণে পরিষ্কার হয়।
রাডারে দেখা যায়- একটি বিমান নির্ধারিত উত্তর-পূর্বমুখী রুট ছেড়ে পশ্চিমের দিকে ঘুরে মালয় উপদ্বীপ অতিক্রম করছে। সেটি মালাক্কা প্রণালির দিকে চলে যায় এবং পরে মালয়েশিয়ার পেনাং দ্বীপের কাছাকাছি দিয়ে উত্তর-পশ্চিমে এগোয়। অর্থাৎ যে বিমানের তখন বেইজিংয়ের দিকে যাওয়ার কথা, সেটি ফিরে আসছিল প্রায় বিপরীত দিকে। এই ঘুরে যাওয়া এমএইচ৩৭০ রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি।

কারণ তদন্তকারীদের বিশ্লেষণে বিমানের গতিপথে এমন পরিবর্তন পাওয়া যায়, যা নিছক এলোমেলোভাবে পথ হারানোর মতো ছিল না। ২০১৮ সালের মালয়েশিয়ান নিরাপত্তা তদন্তে বলা হয়, বিমানটির গতিপথে পরিবর্তন সম্ভবত সিস্টেমের অস্বাভাবিকতার চেয়ে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সক্রিয় ব্যবহারের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে কে সেই নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, তা প্রমাণ করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি। মূল ধ্বংসাবশেষ এবং ফ্লাইট রেকর্ডার না পাওয়ায় তদন্তকারীরা চূড়ান্ত কারণও নির্ধারণ করতে পারেননি।
এরপরই প্রশ্ন আসতে শুরু করে- যদি বিমানটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘোরানো হয়ে থাকে, তাহলে কে ঘুরিয়েছিলেন? এবং কেন?
একটি ভূতুড়ে বিমান, যেটি আরও ছয় ঘণ্টা উড়েছিল
এমএইচ৩৭০-এর রেডিও বন্ধ। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ। ACARS (Aircraft Communications Addressing and Reporting System) নামে পরিচিত স্বয়ংক্রিয় ডেটা যোগাযোগ ব্যবস্থাও আর স্বাভাবিক অবস্থায় তথ্য পাঠাচ্ছিল না। কিন্তু আকাশের অনেক ওপরে থাকা একটি স্যাটেলাইট তখনও এমএইচ৩৭০-এর উপর নজর রাখছিল।
বিমানটি ব্রিটিশ স্যাটেলাইট টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি ইনমারস্যাটের একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিমান এবং স্যাটেলাইটের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বার্তা আদান-প্রদান না হলেও নির্দিষ্ট বিরতিতে স্বয়ংক্রিয় সংযোগ যাচাই হতো। এগুলো পরবর্তীকালে ‘হ্যান্ডশেক’ বা ‘পিং’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই সামান্য ডিজিটাল সংকেতই পুরো তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, রাডার থেকে হারিয়ে যাওয়ার পরও এমএইচ৩৭০ আরও ছয় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আকাশে ছিল। অর্থাৎ বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনায় পড়েনি।

স্যাটেলাইট তথ্য বিমানটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানাতে পারছিল না। তবে স্যাটেলাইট থেকে বিমানের দূরত্বের ভিত্তিতে প্রতিবার একটি বিশাল ‘আর্ক’ তৈরি করা সম্ভব ছিল। এর সঙ্গে ডপলার ইফেক্টভিত্তিক ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্লেষণ যোগ করে গবেষকেরা সম্ভাব্য উত্তর ও দক্ষিণ- দুটি রুট পরীক্ষা করেন।
শেষ পর্যন্ত তথ্য সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ পাওয়া যায় দক্ষিণমুখী একটি গতিপথের সঙ্গে। তার মানে এমএইচ৩৭০ সম্ভবত জনবহুল এশিয়া থেকে ক্রমশ দূরে সরে গিয়ে প্রবেশ করে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের বিরাট জনশূন্য অঞ্চলে।
সেই ‘সপ্তম আর্ক’
এমএইচ৩৭০ রহস্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি শব্দ বারবার সামনে আসে- Seventh Arc বা সপ্তম আর্ক।
স্যাটেলাইটের সঙ্গে এমএইচ৩৭০-র শেষ দিকের যোগাযোগগুলোর অবস্থানগত সম্ভাবনা থেকে যে দীর্ঘ বাঁকানো রেখা তৈরি করা হয়, তার শেষ গুরুত্বপূর্ণ রেখাটিই অনুসন্ধানে সপ্তম আর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটিএসবি (ATSB – Australian Transport Safety Bureau) এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিমানটির শেষ পর্যায়ের সম্ভাব্য অবস্থান ছিল দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে এই সপ্তম আর্কের কাছাকাছি। জ্বালানি শেষ হওয়ার সময়ও বিমানটি এই অঞ্চলে থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে বিভিন্ন মডেল নির্দেশ করে।
প্রথম অনুসন্ধান হয়েছিল ভুল সমুদ্রে
ঘটনার প্রথমদিকে ধারণা ছিল- বিমানটি দক্ষিণ চীন সাগরে হারিয়ে গেছে। কারণ সেখানেই বেসামরিক রাডারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। তাই অনুসন্ধান শুরু হয় সেখানেই। কিন্তু পরে সামরিক রাডার এবং স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণে বোঝা যায়, বিমানটি আসলে উল্টো দিকে চলে গিয়েছিল। ফলে অনুসন্ধানের এলাকা একসময় প্রায় সম্পূর্ণ বদলে যায়।
দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে অনুসন্ধানের দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় অস্ট্রেলিয়া। এটি এমন একটি অঞ্চল, যেখানে সমুদ্রের গভীরতা কয়েক কিলোমিটার, আবহাওয়া ভয়ংকর, তলদেশ পাহাড়, খাদ ও অসম ভূখণ্ডে ভরা।

এমএইচ৩৭০ এর অনুসন্ধান পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে জটিল অনুসন্ধান অভিযানে পরিণত হয়।
২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে সাগরের তলদেশের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সোনার দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তার আগে প্রায় ৭ লাখ ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রতল ম্যাপিং করা হয়েছিল।
তারপর একটি সমুদ্রসৈকতে এলো বিমানের অংশ
২০১৫ সালের ২৯ জুলাই। এমএইচ৩৭০ নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ভারত মহাসাগরের পশ্চিমে ফরাসি দ্বীপ রিইউনিয়নের একটি সৈকতে পাওয়া গেল বিমানের ডানার একটি অংশ। সেটি ডানার পেছনের নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত অংশ ছিল।

পরীক্ষায় এর ভেতরের যন্ত্রাংশের সিরিয়াল ও উৎপাদন রেকর্ড মিলিয়ে নিশ্চিত করা হয় যে এটি এমএইচ৩৭০-এ ব্যবহৃত বোয়িং-৭৭৭, নিবন্ধন নম্বর 9M-MRO থেকেই এসেছে।

পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল, মাদাগাস্কার, মরিশাস, তানজানিয়া ও ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে আরও বেশ কিছু ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। কয়েকটি অংশের উৎপাদন নম্বর সরাসরি এমএইচ৩৭০-র সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়; অন্য কয়েকটিকে বোয়িং ৭৭৭ এবং মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের উৎসের সঙ্গে অত্যন্ত জোরালোভাবে মিলানো হয়।
সমুদ্রস্রোতের মডেলও দেখায়, দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে কোনো বিমান বিধ্বস্ত হলে তার হালকা ধ্বংসাবশেষ দীর্ঘ সময় ভেসে পশ্চিম ভারত মহাসাগর ও পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছাতে পারে।
ইচ্ছাকৃতভাবে কি বিমান ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছিল?
এমএইচ৩৭০-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্ব হলো- ককপিটে থাকা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করেছিলেন। এর পেছনে কিছু শক্তিশালী প্রশ্নও রয়েছে।
- বিমানটির যোগাযোগ ব্যবস্থা কেন প্রায় একই সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল?
- ট্রান্সপন্ডার কেন বন্ধ হলো?
- বিমানটি কেন এয়ারওয়ের স্বাভাবিক রুট ছেড়ে মালয়েশিয়ার ওপর দিয়ে ফিরে গেল?
- আর কেন তারপর এমন একটি পথ অনুসরণ করল, যা শেষ পর্যন্ত তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন সমুদ্র অঞ্চলের দিকে নিয়ে গেল?
স্বাভাবিক বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি হলে ক্রুর কাছ থেকে ‘মেডে (Mayday)’ বার্তা আসে। কিন্তু এমএইচ৩৭০ থেকে এমন কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। এই কারণেই ক্যাপ্টেন জাহারি আহমাদ শাহকে ঘিরে প্রচুর সন্দেহ তৈরি হয়।
তাঁর বাড়িতে থাকা ফ্লাইট সিমুলেটরও তদন্ত করা হয়েছিল। ফরেনসিক পরীক্ষায় হাজার হাজার কোঅর্ডিনেটের মধ্যে সাতটি ম্যানুয়ালি প্রোগ্রাম করা ওয়েপয়েন্ট পাওয়া যায়, যেগুলো যুক্ত করলে আন্দামান সাগর হয়ে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দিকে একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হতে পারে।
অবশ্য মালয়েশিয়ার পুলিশের ফরেনসিক তদন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি যে এসব ওয়েপয়েন্ট একই ফ্লাইট সেশনের অংশ ছিল। সিমুলেটরে এমএইচ৩৭০-এর বাস্তব পথের অনুরূপ কোনো পূর্ণাঙ্গ ফ্লাইট চালানোর রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। পুলিশের রিপোর্টের সিদ্ধান্ত ছিল- সাধারণ গেমভিত্তিক ফ্লাইট সিমুলেশন ছাড়া নিশ্চিতভাবে অস্বাভাবিক কিছু প্রমাণ করা যায়নি।
আগুন? বৈদ্যুতিক গোলযোগ? নাকি অক্সিজেনের অভাব?
আরেকটি সম্ভাবনা হলো- বিমানে কোনো ধরনের আগুন বা বৈদ্যুতিক সমস্যা হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে ক্রুরা জরুরি ভিত্তিতে বিমান ঘুরিয়ে নিকটবর্তী বিমানবন্দরের দিকে যেতে পারেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা একে একে নষ্ট হওয়াও অসম্ভব নয়। কিন্তু এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পরবর্তী দীর্ঘ যাত্রা।
যদি ককপিটে এমন ভয়ংকর আগুন বা বিপর্যয় ঘটে থাকে যাতে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিমানটি কীভাবে আরও ছয় ঘণ্টার বেশি সময় আকাশে থাকল?
এখান থেকে আসে আরেকটি তত্ত্ব- হাইপক্সিয়া (Hypoxia), অর্থাৎ কেবিন বা ককপিটে চাপ কমে গিয়ে অক্সিজেনের অভাব।
অতীতে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মানুষ অচেতন হয়ে যাওয়ার পরও অটোপাইলটে বিমান দীর্ঘ সময় উড়েছে। এমএইচ৩৭০-এর ক্ষেত্রেও কি প্রথমে কোনো জরুরি ঘটনায় বিমান ঘোরানো হয়েছিল, এরপর সবাই অচেতন হয়ে পড়েন, আর অটোপাইলট বিমানটিকে জ্বালানি শেষ হওয়া পর্যন্ত উড়িয়ে নিয়ে যায়?
সম্ভব। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থাকে- কমিউনিকেশন সিস্টেমগুলোর অস্বাভাবিক আচরণ এবং নির্দিষ্ট পরে ঘুরে আসা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
হাইজ্যাক? সন্ত্রাসবাদ?
এমএইচ৩৭০-এর দুই যাত্রী চুরি হওয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিলেন- এই তথ্য প্রকাশের পর শুরুতেই সন্ত্রাসবাদ বা হাইজ্যাকিংয়ের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু তদন্তে ওই যাত্রীদের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাদের একজন সম্ভবত ইউরোপে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছিলেন। কোনো সংগঠন হাইজ্যাকের দায়ও স্বীকার করেনি।
তাহলে বিমানটি পাওয়া গেল না কেন?
এই প্রশ্নটিই সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে অস্বাভাবিক মনে হয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করি, যখন মোবাইল ফোন পর্যন্ত জিপিএস দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়। তাহলে ৬৪ মিটার দীর্ঘ একটি বোয়িং কীভাবে হারিয়ে যেতে পারে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে এমএইচ৩৭০ যে জায়গায় হারিয়েছে বলে ধারণা করা হয়, সেই জায়গার ভয়াবহতায়।
দক্ষিণ ভারত মহাসাগর পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর একটি। নিকটতম স্থলভাগ থেকেও অনুসন্ধান এলাকা বহু দূরে। সমুদ্রের তল কয়েক কিলোমিটার গভীর। সেখানে আছে পানির নিচের পর্বত, খাদ ও অমসৃণ ভূখণ্ড। আর এমএইচ৩৭০-এর সুনির্দিষ্ট শেষ অবস্থানও জানা নেই।
তুলনা হিসেবে এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইট ৪৪৭-এর কথা বলা যায়। ২০০৯ সালে আটলান্টিকে বিধ্বস্ত সেই এয়ারবাস এ৩৩০ মডেলের বিমানের শেষ অবস্থান এমএইচ৩৭০-এর তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে জানা ছিল। তবু মূল ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেতে প্রায় দুই বছর লেগেছিল। এমএইচ৩৭০-এর অনুসন্ধান ক্ষেত্র তার চেয়ে বহুগুণ জটিল।
২০১৮: আবার শুরু হলো অনুসন্ধান
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীন যৌথ অনুসন্ধান স্থগিত করে। ২০১৮ সালে মার্কিন সমুদ্র অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান ‘ওশেন ইনফিনিটি’ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবার অনুসন্ধান চালায়। আগের অনুসন্ধান এলাকার উত্তরের অংশসহ নতুন অঞ্চল পরীক্ষা করা হয়।
সেটিও ব্যর্থ হয়। সব মিলিয়ে তখন প্রায় ২ লাখ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রতল অনুসন্ধান করা হয়েছিল।
২০২৫-২৬: আবারও শুরু হলো অনুসন্ধান
এক দশকের বেশি সময় পরও এমএইচ৩৭০-এর অনুসন্ধান পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
২০২৫ সালে মালয়েশিয়া সরকার ওশেন ইনফিনিটির সঙ্গে নতুন চুক্তি করে। নতুন অনুসন্ধান এলাকা নির্ধারণ করা হয় দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের প্রায় ১৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল।
চুক্তি ছিল বিমান পাওয়া না গেলে কোম্পানি অর্থ পাবে না; গুরুত্বপূর্ণ ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেলে ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়া হবে।

অনুসন্ধান চলে দুই পর্যায়ে; ২০২৫ সালের মার্চে, এবং পরে ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। চুক্তি সইয়ের পর পরিচালিত ২৮টি কার্যকর অনুসন্ধানের মাধ্যমে দিনে প্রায় ৭,৫৭১ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রতল পরীক্ষা করা হয়।
ফলাফল? আবারও হতাশা।
ওশেন ইনফিনিটি ২০২৬ সালের মার্চে জানায়, তাদের সর্বশেষ পর্যায়ের অনুসন্ধানেও এমএইচ৩৭০ পাওয়া যায়নি। ২০১৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি মোট ১৫১ দিন সমুদ্রে কাটিয়েছে এবং ১ লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্রতলের ম্যাপিং করেছে।
তাহলে আসলে কী হয়েছিল?
সব তথ্য পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিষয়কে এখন পর্যন্ত যথেষ্ট শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায়।
- এমএইচ৩৭০ নির্ধারিত রুট থেকে সরে গিয়েছিল।
- যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও বিমানটি আরও বেশ কয়েক ঘণ্টা উড়েছিল।
- সামরিক রাডারে সেটিকে মালয় উপদ্বীপের ওপর দিয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়।
- স্যাটেলাইট ডেটা শক্তভাবে নির্দেশ করে যে পরে সেটি দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দিকে গিয়েছিল।
- এমএইচ৩৭০-এর নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা অংশ ভারত মহাসাগরের পশ্চিম দিকে পাওয়া গেছে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সকল বিশ্লেষণ বিবেচনায় বিমানটি শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়েছে- এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী অনুমান গবেষকদের কাছে।
কিন্তু এর পরের প্রশ্নগুলো ঘিরেই রহস্যের সমাধান হয়নি।
- বিমানটি কেন ঘুরে গিয়েছিল?
- যোগাযোগ ব্যবস্থা কেন বন্ধ হয়েছিল?
- ককপিটে তখন কী হচ্ছিল?
- বিমানটি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত কেউ ছিলেন, নাকি সেটি অটোপাইলটে একটি ‘ঘোস্ট ফ্লাইট (Ghost flight)’ হয়ে উড়ছিল?
- শেষ মুহূর্তে MH370-এর কী হয়েছিল?
এই সব প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত পড়ে আছে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের কয়েক কিলোমিটার নিচে।
বিমানের মূল ফিউজলাজের সঙ্গে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডার পাওয়া যেতে পারে। যদিও এত বছর সমুদ্রের নিচে থাকার পর রেকর্ডার থেকে কতটা তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। তবু ধ্বংসাবশেষের বিন্যাস, বিমানের ভাঙনের ধরন, নিয়ন্ত্রণ-পৃষ্ঠের অবস্থা, ইঞ্জিন ও ককপিটের বিভিন্ন অংশ- এসবই হয়তো শেষ কয়েক মিনিটের গল্প আমাদের সামনে তুলে ধরতে পারে।
২০১৮ সালের মালয়েশিয়ান তদন্তও তাই মৌলিক সীমাবদ্ধতার কথাই বলেছিল: মূল ধ্বংসাবশেষ ও রেকর্ডার ছাড়া নিখোঁজ হওয়ার কারণ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এমএইচ৩৭০-এর পর আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে উড়োজাহাজ ট্র্যাকিং নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়েছে। কারণ ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে যে স্যাটেলাইট, রাডার, জিপিএস আর সার্বক্ষণিক সংযুক্ত এই পৃথিবীর যুগেও একটি বড় যাত্রীবাহী বিমান এমন জায়গায় হারিয়ে যেতে পারে, যেখান থেকে তার শেষ মুহূর্তের রেকর্ড উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দশকের পর দশক মানুষ অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি নিয়ে আলাপ করেছে। কিন্তু এমএইচ৩৭০ নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে স্যাটেলাইট যুগে, স্মার্টফোনের যুগে, প্রায় প্রতিটি মানুষের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট রেখে যাওয়ার যুগে।
তারপরও মানুষ আশায় বাঁচে। আমরাও তাই আশায় বুক বাধতেই পারি। কোনো একদিন হয়তো গভীর সমুদ্রের সোনার স্ক্রিনে একটি অস্বাভাবিক আকৃতি দেখা যাবে। রোবোটিক যান নেমে যাবে কয়েক হাজার মিটার নিচে। ক্যামেরার আলোয় অন্ধকারের ভেতর ফুটে উঠবে ধাতব কাঠামো। হয়তো দেখা যাবে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের পরিচিত একটি বিমানের ক্ষয়ে যাওয়া কোনো অংশ।
সেদিন হয়তো পৃথিবী শেষ পর্যন্ত জানতে পারবে এমএইচ৩৭০-এর শেষ অবস্থান। কিন্তু কেন এমন পরিণতি হলো এই বিমান এবং এতে থাকা ২৩৯ জন মানুষের? সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অজানাই থেকে যাবে।
ফিচার ইমেজ: এআই জেনারেটেড
তথ্যসূত্র
- Safety Investigation Report Malaysia Airlines Boeing B777-200ER (9M-MRO) – 08 March 2014 – The Malaysian ICAO Annex 13 Safety Investigation Team for MH370
- The Operational Search for MH370 – 3 October 2017 – ATSB Transport Safety Report
- MH370 – First Principles Review – 4 November 2016 – ATSB Transport Safety Report
- MH370 – Definition of Underwater Search Areas – 3 December 2015 – ATSB Transport Safety Report
- MH370 – Flight Path Analysis Update – 8 October 2014 – ATSB Transport Safety Report
- MH370: Aircraft Debris and Drift Modelling – 4 August 2015 – ATSB
- MH370 operational search reports – ATSB
- MH370 search overview – ATSB
- Resumption of MH370 Search by Ocean Infinity in the Southern Indian Ocean – 3 December 2025 – Ministry of Transport Malaysia
- MH370 Search Operation (2025/2026) – Update to Families – Ministry of Transport Malaysia
- Conclusion of the search for Malaysian Airlines flight MH370 – 8 March 2026 – Ocean Infinity
- MH370: What we know about Malaysia Airlines plane, 11 years on – December 3, 2025 – Reuters