সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সক্ষম সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় সামুদ্রিক ও সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি সাইবার, তথ্যভিত্তিক এবং বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন অপরিহার্য।
রোববার ঢাকা সেনানিবাসে সেনাসদর দপ্তরে আয়োজিত ‘সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার ভিত্তি হবে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য, প্রস্তুতি ও সহনশীলতা। এ উদ্দেশ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ধারণার আলোকে একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণ সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, এ নীতিমালার উদ্দেশ্য যুদ্ধকে উৎসাহিত করা নয়; বরং সম্ভাব্য সংকট, আগ্রাসন কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় আত্মনির্ভরশীল ও সর্বদা প্রস্তুত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা, যাতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। এখন ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতাও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে সংখ্যার পরিবর্তে সক্ষমতা, সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্যকারিতা, প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধির বদলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং একক বাহিনীকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে যৌথ সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকারের প্রতিরক্ষা নীতির মূল অগ্রাধিকার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গঠন, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জোরদার, যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা।
পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সেনাবাহিনীর প্রতি নিজের আবেগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যান্টনমেন্ট তার জীবনের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান। সেনা পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও বিধিবিধান সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি সেনাবাহিনীকে নিজের বৃহত্তর পরিবারের অংশ হিসেবে মনে করেন।
তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তার নেতৃত্বেই স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমান্ত এলাকায় চলমান প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক প্রকল্প শুধু নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছে না, দুর্গম অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলে মাইন ও বিস্ফোরকমুক্ত করার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শাহাদাতবরণকারী ২১৭ জন সেনাসদস্যের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। তিনি সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান ও মালিতে দায়িত্ব পালনকারী সেনাসদস্যদের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয় শান্তিরক্ষী সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনীর ভূমিকারও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময় তেল সংরক্ষণাগার রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান এবং জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাহিনীকে নিজেদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
তিনি বলেন, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা ও ফিটনেসকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রয়াত মার্কিন জেনারেল এইচ. নরম্যান সোয়ার্জকফের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, “দ্যা মোর ইউ সোয়েট ইন পিস, দ্যা লেস ইউ ব্লিড ইন ওয়ার।” তাই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচনী পর্ষদের মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্য, গৌরব ও পেশাদারিত্বের ধারাবাহিকতাকে আরও সমৃদ্ধ করবেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দর্শন হলো, দেশের স্বার্থে সবার আগে বাংলাদেশ এবং জনগণের স্বার্থে সবার জন্য বাংলাদেশ।