যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে হওয়া আলোচিত সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নথিটি প্রকাশ করেন। এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, ইরানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে প্রকাশিত এই নথি আগে জনসমক্ষে না আনায় সমালোচনা হচ্ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তির বিষয়গুলো প্রকাশ করা হয়।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি মূলত এমন একটি চুক্তি, যেটা আমাদের অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি ইরানিদের পারমাণবিক বর্জ্য ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি থাকছে। এরপর আমাদের হাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকছে। ইরান যদি ভালো আচরণ করে, তবে আমরাও ইতিবাচক সাড়া দেব। তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, যাতে তারা আরও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’
আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারকটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৬০ দিনের আলোচনা শুরু হবে।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান এবং একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বা হুমকি না দেওয়ার বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তিতে দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতিও রাখা হয়েছে।
সমঝোতা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি করার চেষ্টা করবে দুই দেশ। প্রয়োজনে পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময় বাড়ানো যাবে।
নথিতে বলা হয়েছে, সমঝোতা সইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কাজ করবে ইরান।
চূড়ান্ত চুক্তির পর ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের কাছাকাছি এলাকা থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান বিনা মাশুলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেবে। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে কাজ করবে দেশটি। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণ করা হবে।
সমঝোতায় ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে এই পরিকল্পনা তৈরি করবে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুমোদন ও ছাড় দেবে।
চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ও রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত।
পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান আবারও জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যৎ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশ আলোচনায় বসবে।
চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময়ে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ধরে রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে না।
এ ছাড়া ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া, ব্যাংকিং, বিমা ও পরিবহন সেবার সুযোগ রাখা এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ব্যবহারের পথ খুলে দেওয়ার বিষয়ও সমঝোতায় রয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে একটি নির্বাহী ব্যবস্থা গঠনের কথাও বলা হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তি হলে সেটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে।