Ridge Bangla

ডার্ক ওয়েব: ইন্টারনেটের অদৃশ্য কালো জগতের রহস্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

​আমরা প্রতিদিন যখন গুগল করি, ইউটিউবে ভিডিও দেখি কিংবা ফেসবুকে স্ক্রল করি, তখন আমরা ইন্টারনেটের যে স্তরটি ব্যবহার করি তাকে বলা হয় ‘সারফেস ওয়েব’ (Surface Web)। কিন্তু হিমশৈলের চূড়ার মতো ইন্টারনেটের এই দৃশ্যমান অংশের নিচে লুকিয়ে আছে আরও বিশাল এবং রহস্যময় এক জগত। এই জগতের গভীরতম এবং অন্ধকারতম অংশটির নাম ‘ডার্ক ওয়েব’ (Dark Web)। এটি এমন এক ডিজিটাল অরণ্য যেখানে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে প্রবেশ করা যায় না এবং যেখানে পরিচয় গোপন রাখাই হলো প্রধান বৈশিষ্ট্য।

​ইন্টারনেটের তিন স্তর: সারফেস, ডিপ ও ডার্ক ওয়েব

​ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে বুঝতে হলে ইন্টারনেটের তিনটি স্তর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন যার প্রথমেই আসে সারফেস ওয়েব। আপনি যখন সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে কোন কিছুর জন্য সার্চ করেন, তখন আপনি সারফেস লেভেলে বিচরণ করছেন। এটি ইন্টারনেটের মাত্র ৪-৫ শতাংশ। এর পরেই আসে ডিপ ওয়েব (Deep Web)। এটি ইন্টারনেটের সেই অংশ যা পাসওয়ার্ড বা নির্দিষ্ট অ্যাক্সেস ছাড়া দেখা যায় না। যেমন আপনার ইমেইল ইনবক্স, অনলাইন ব্যাংকিং পোর্টাল কিংবা ক্লাউড স্টোরেজ। এটি মোটেও অবৈধ নয়, বরং নিরাপত্তার জন্য জরুরি। আর সর্বশেষ অংশটি হলো ডার্ক ওয়েব। এটি ডিপ ওয়েবের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু বিশেষ অংশ। এখানে ওয়েবসাইটগুলো সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে ইনডেক্স করা থাকে না এবং এগুলো অ্যাক্সেস করতে বিশেষ সফটওয়্যার (যেমন Tor বা I2P) প্রয়োজন হয়।

​ডার্ক ওয়েব কীভাবে কাজ করে?

​ডার্ক ওয়েবের কার্যক্রম মূলত ‘অনিয়ন রাউটিং’ (Onion Routing) প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে চলে। ডার্ক ওয়েবে কোনো ওয়েবসাইটের ঠিকানা .com বা .org দিয়ে শেষ হয় না, বরং এগুলো শেষ হয় .onion দিয়ে। এই প্রযুক্তিতে ব্যবহারকারীর ডেটা একাধিক এনক্রিপ্টেড স্তরের মধ্য দিয়ে যায়, ঠিক যেমন পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে হয়। এতে করে ব্যবহারকারী এবং সার্ভার- উভয়েরই আইপি অ্যাড্রেস এবং অবস্থান গোপন থাকে। এই চরম গোপনীয়তাই ডার্ক ওয়েবকে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে।

​ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিক: যেখানে অপরাধের হাট বসে

​ডার্ক ওয়েবের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অবৈধ সব কর্মকাণ্ডের ছবি। এর অধিকাংশ জনপ্রিয় সাইটগুলো হলো নিষিদ্ধ পণ্যের বাজার বা ‘ব্ল্যাক মার্কেট’। ​অবৈধ পণ্যের রমরমা বাজার রয়েছে এখানে। ডার্ক ওয়েবে মাদক, অস্ত্র, এবং চোরাই পণ্য কেনাবেচা হয়। ‘সিল্ক রোড’ (Silk Road) ছিল এমনই এক কুখ্যাত বাজার যা ২০১৩ সালে এফবিআই বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে আলফাবে বা হ্যামসার মতো আরও অনেক বাজার সেখানে সক্রিয়।

​চোরাই ও অবৈধ পণ্যের বিকিকিনির পাশাপাশি হ্যাকাররা বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাক করে ব্যবহারকারীর ক্রেডিট কার্ড তথ্য, এনআইডি নম্বর, পাসপোর্ট ডিটেইলস এবং পাসওয়ার্ড ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করে দেয়। খুব স্বল্প মূল্যে সেখানে মানুষের ডিজিটাল পরিচয় কেনা যায়।

ডার্ক ওয়েবের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো ​সাইবার অপরাধের সরঞ্জাম কিনতে পাওয়া যায় এখানে। এখানে র‍্যানসামওয়্যার (Ransomware), ম্যালওয়্যার এবং ফিশিং টুলস পাওয়া যায়। এমনকি নির্দিষ্ট কাউকে ডিজিটাল আক্রমণ করার জন্য ‘হ্যাকার ফর হায়ার’ বা ভাড়ায় হ্যাকারও পাওয়া যায়। বাস্তব জগতের অনেক হ্যাকিংয়ের ঘটনার চুক্তি ডার্ক ওয়েবেই হয়ে থাকে। ​এছাড়া এখানে এমন সব বিকৃত এবং অমানবিক কন্টেন্ট থাকে যা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। মানব পাচার থেকে শুরু করে চরমপন্থী প্রচারণা- সবই এখানে ছদ্মবেশে চলে।

​ডার্ক ওয়েব কি তবে কেবলই অপরাধের আস্তানা?

​ডার্ক ওয়েবের জন্ম হয়েছিল মূলত গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদে। মার্কিন নৌবাহিনী এটি তৈরি করেছিল গোয়েন্দা তথ্যের নিরাপদ আদান-প্রদানের জন্য। বর্তমানেও এটি কিছু ইতিবাচক কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন- স্বৈরাচারী শাসনামলে সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মীরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে তথ্য আদান-প্রদান করতে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করেন। উইকিলিকসের মতো সংস্থাগুলো ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে গোপন নথিপত্র সংগ্রহ করে থাকে। তবে দুঃখজনকভাবে, এর ইতিবাচক ব্যবহারের চেয়ে নেতিবাচক ব্যবহারই এখন বেশি প্রকট।

​সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি

​অনেকেই নিছক কৌতূহলবশত ডার্ক ওয়েবে উঁকি দিতে চান। কিন্তু এই কৌতূহল হতে পারে মারাত্মক বিপদের কারণ।

ডার্ক ওয়েবে প্রবেশের সাথে সাথেই আপনি কিছু বড় ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন। ডার্ক ওয়েবের অধিকাংশ লিঙ্কে ক্লিক করলেই আপনার ডিভাইসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্পাইওয়্যার বা ভাইরাস ঢুকে যেতে পারে। এর মাধ্যমে আপনার ক্যামেরা, মাইক্রোফোন বা কি-বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে। এখানে বিশ্বাসযোগ্যতার কোনো বালাই নেই। পণ্য কেনার নামে বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে সেটি ফিরে পাওয়ার কোনো আইনি পথ নেই।

ডার্ক ওয়েবের বিভিন্ন আইনি জটিলতাও রয়েছে। এখানে প্রবেশ করা অনেক দেশে অবৈধ না হলেও, সেখানে কোনো নিষিদ্ধ কন্টেন্ট বা লিঙ্কে ক্লিক করলে আপনি আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (যেমন ইন্টারপোল বা এফবিআই) নজরদারিতে চলে আসতে পারেন। আর ডার্ক ওয়েব সম্পূর্ণ গোপন- এই ধারণাটি ভুল। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন ডার্ক ওয়েবের নোডগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

​সুরক্ষা পাওয়ার উপায়

​ইন্টারনেটের এই অন্ধকার জগত থেকে দূরে থাকাই নিরাপত্তার প্রথম শর্ত। তবুও বর্তমান যুগে তথ্য চুরি রোধে আমাদের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রথমত ​কোনো সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করা উচিত না। মোবাইলে ​টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখা একটি অবশ্য কর্তব্য। ডিভাইসের ​পাসওয়ার্ড নিয়মিত পরিবর্তন করা উচিত। এছাড়া ​ইন্টারনেটে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।

​ডার্ক ওয়েব হলো ইন্টারনেটের একটি অপরিহার্য কিন্তু ভয়ংকর বাস্তব। এটি প্রযুক্তির সেই দর্পণ যা মানুষের অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলোকে প্রতিফলিত করে। কৌতূহল মেটাতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আইনি স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ইন্টারনেটের অদৃশ্য এই কালো জগত সম্পর্কে সচেতন থাকাই হলো ডিজিটাল যুগে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন