Skip to main content

Ridge Bangla

বিশ্বকাপজয়ী ইমরান খানকে কেন জেলে বন্দী করে রাখা হয়েছে?

পাকিস্তানের ইতিহাসে যে কয়েকজন ব্যক্তি আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সফল করতে সফল হয়েছিলেন, তার মধ্যে ইমরান খান একজন। ​১৯৯২ সালে সেই মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ট্রফি হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ইমরান খান ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় বীর। সেই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সময়ের প্রয়োজনে তাকে ক্রিকেটের বাইশ গজ থেকে টেনে এনেছিল রাজনীতির ময়দানে। ২০১৮ সালে ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু আজ সেই ইমরান খান আদিয়ালা কারাগারের একটি ছোট কক্ষে বন্দি। কেন একজন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে কারাবরণ করতে হলো? এটি কি কেবলই আইনি বিষয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণ?

​ইমরান খানের সংকটের শুরু ২০২২ সালের এপ্রিলে, যখন পার্লামেন্টে এক অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসে তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান। ইমরান খানের দাবি ছিল, তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট একটি ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ কাজ করেছে। ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই তিনি রাজপথে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেন এবং দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সমালোচনায় মুখর হন। বিশ্লেষকদের মতে, ইমরান খানের ক্ষমতার পতন এবং বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হলো পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের সাথে তার সম্পর্কের চরম অবনতি।

​ইমরান খানের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ‘তোশাখানা মামলা’। পাকিস্তানের নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সফরে প্রাপ্ত উপহারসামগ্রী সরকারি কোষাগারে (তোশাখানা) জমা দিতে হয়। অভিযোগ ওঠে, ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিদেশ থেকে পাওয়া মূল্যবান উপহার, বিশেষ করে দামী ঘড়ি ও গহনা নামমাত্র মূল্যে কিনে নেন এবং পরবর্তীতে চড়া দামে বাজারে বিক্রি করেন। এই অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও ইমরান খান এবং তার দল পিটিআই (PTI) এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।

​ইমরান খানের বিরুদ্ধে দায়ের করা আরেকটি গুরুতর মামলা হলো ‘সাইফার মামলা’। ক্ষমতা হারানোর আগে একটি জনসভায় ইমরান খান একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তা (সাইফার) প্রদর্শন করে দাবি করেছিলেন যে, এটি তার সরকারকে সরানোর জন্য মার্কিন ষড়যন্ত্রের প্রমাণ। পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, তিনি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন (Official Secrets Act) লঙ্ঘন করে স্পর্শকাতর কূটনৈতিক তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন, যা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এই মামলায় তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে উচ্চ আদালত এই সাজা স্থগিত করে।

​২০২৩ সালের ৯ মে ইমরান খানকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনার পর তার সমর্থকরা পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ চালায়। এই নজিরবিহীন সহিংসতার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। ৯ মে-র ঘটনার জন্য ইমরান খানকে প্ররোচনাকারী হিসেবে দায়ী করে শত শত নতুন মামলা করা হয়। এই ঘটনার পর থেকে তার দল পিটিআই-এর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় এবং দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এছাড়া ​ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির বিয়ে নিয়ে ‘ইদ্দত মামলা’ পাকিস্তানের সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ ছিল, বুশরা বিবি তার আগের বিয়ের বিচ্ছেদের পর নির্ধারিত ইদ্দত পালন না করেই ইমরান খানকে বিয়ে করেছেন। এই মামলায় তাদের কারাদণ্ড দেওয়া হলে তা মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং একে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হয়। যদিও পরবর্তীতে এই মামলায় তারা খালাস পান।

পাকিস্তানে রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর প্রভাব অজানা ব্যাপার নয়। ​পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো বেসামরিক নেতার সাথে সামরিক বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ কখনো সুখকর হয়নি। ইমরান খান প্রকাশ্য জনসভায় জেনারেল আসিম মুনির ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়ার নাম ধরে সমালোচনা করেছেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করাই ইমরান খানের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করা হয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ৯ মে-র ঘটনায় জড়িতদের ক্ষমা করা হবে না।

​আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান অবস্থা

​ইমরান খানের বন্দিজীবেন নিয়ে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানায় যে, ইমরান খানকে যে পদ্ধতিতে আটকে রাখা হয়েছে তা ‘স্বেচ্ছাচারী’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্যও তার মুক্তির দাবি তুলেছেন। এতসব চাপ সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও আদালত একের পর এক নতুন মামলায় তাকে জড়িয়ে রাখছে। একটি মামলায় জামিন পেলেই অন্য একটি মামলায় তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।

​ইমরান খানের বন্দিজীবেন আজ কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি বিশ্বরাজনীতির এক আলোচিত অধ্যায়। তিনি কি আসলেই দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত, নাকি তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে স্তব্ধ করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে- তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে এটি স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের গণতন্ত্র এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইমরান খান যদি দীর্ঘ সময় কারান্তরীণ থাকেন, তবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্রিকেটের বাইশ গজে অসম্ভবকে সম্ভব করা এই অধিনায়ক এখন তার জীবনের কঠিনতম ইনিংসে লড়াই করছেন এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।

This post was viewed: 29

আরো পড়ুন