স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলাম চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। গত মঙ্গলবার রাজধানীর শ্যামলীতে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে তিনি সফলভাবে ২,০০০তম বিনামূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন।
দেশে এ পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া মোট কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রায় অর্ধেকই সম্পাদিত হয়েছে এই প্রচারবিমুখ চিকিৎসকের নেতৃত্বে। প্রতি সপ্তাহে গড়ে পাঁচটি কিডনি প্রতিস্থাপন করে আসছেন তিনি, যা তাকে বাংলাদেশের কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রমের প্রধান স্তম্ভে পরিণত করেছে।
এই অসামান্য অর্জন সত্ত্বেও অধ্যাপক কামরুল ইসলামের মধ্যে কোনো বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই। তিনি তার লক্ষ্য সম্পর্কে বলেন, “দেশের গরিব রোগীদের জন্য আরও বড় পরিসরে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই আমার মূল লক্ষ্য। আমাদের উদ্দেশ্য ব্যবসা করা নয়, বরং সেবার মান বজায় রেখে যত বেশি সম্ভব রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্রোপচারের জন্য কোনো সার্জন ফি গ্রহণ করা হয় না। রোগীদের কাছ থেকে শুধুমাত্র ওষুধ, অ্যানেসথেশিয়া, ল্যাব পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক খরচ নেওয়া হয়, যা মোটামুটি দুই লাখ টাকার মধ্যে সীমিত। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ফলোআপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও রোগীদের আলাদা কোনো খরচ বহন করতে হয় না।
১৯৬৫ সালে পাবনার ঈশ্বরদীতে জন্মগ্রহণকারী অধ্যাপক কামরুল ইসলাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মেধাতালিকায় স্থান অধিকার করেন। ১৯৯০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি এফসিপিএস, এমএস (ইউরোলজি) এবং ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ থেকে এফআরসিএস ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৭ সাল থেকে তিনি নিয়মিত কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম শুরু করেন।
মানবিক চিকিৎসায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২২ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। এছাড়াও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট গবেষণার জন্য ইউরোলজি সোসাইটি স্বর্ণপদকসহ একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি ঘণ্টায় পাঁচজন রোগী এর কারণে মারা যান। ডায়ালাইসিসের উচ্চ ব্যয় ও প্রতিস্থাপন সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ রোগীই পর্যাপ্ত চিকিৎসা পান না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসা কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
অধ্যাপক কামরুল ইসলাম পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মতো উন্নত চিকিৎসা কাঠামো বাংলাদেশেও গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে অবিরতভাবে তার মানবিক মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এই নিরলস প্রচেষ্টা চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রচনা করেছে।