ওমান উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত। তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দর অবরোধ ভাঙার কোনো চেষ্টা সহ্য করা হবে না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ সময় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার বিষয়ে ভারতের আপত্তি তুলে ধরেন তিনি।
শনিবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জয়শঙ্কর জানান, রুবিওর সঙ্গে আলোচনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারতের কঠোর অবস্থান জানানো হয়েছে।
জয়শঙ্কর লেখেন, ‘আজ (শুক্রবার) সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি আবারও উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলার বিরুদ্ধে ভারতের জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছি, যে হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রাণঘাতী পদক্ষেপের কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
তবে ফোনালাপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু বা ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে মূলত ইরানের বন্দর অবরোধ কার্যকর রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানান, দুই নেতা হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ সময় রুবিও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর নির্দেশনা সব বাণিজ্যিক জাহাজকে অবিলম্বে মেনে চলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ভঙ্গ এবং ইরানি তেলের অবৈধ পরিবহন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।’
এর আগে ফোনালাপের কয়েক ঘণ্টা আগে ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জেসন মিকসকে তলব করে নয়াদিল্লি। তিন দিনের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো তাকে তলব করা হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর দেশের বাইরে থাকায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন মিকস। ভারতের অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব (আমেরিকা বিভাগ) নাগরাজ নাইডু তার কাছে ভারত সরকারের উদ্বেগ তুলে ধরেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওমান উপসাগরে ভারতীয় নাবিক বহনকারী বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর ধারাবাহিক হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এসব হামলায় ইতিমধ্যে তিন ভারতীয় নাগরিকের মর্মান্তিক এবং এড়ানো সম্ভব ছিল এমন মৃত্যু ঘটেছে।’
ভারত জানায়, বেসামরিক জাহাজে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে তারা গভীর উদ্বিগ্ন। এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছে, অঞ্চলে থাকা মার্কিন বাহিনী যেন বেসামরিক প্রাণহানি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার ওমানের শিনাস বন্দরের কাছে ২০ ভারতীয় নাবিক থাকা ট্যাংকার এমটি জলভিরে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দর অবরোধ ভাঙার অভিযোগে চলতি সপ্তাহে তিনটি জাহাজ অচল করতে অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৮ জুন এমটি মারিভেক্স, ৯ জুন এমটি সেট্টেবেলো এবং ১১ জুন এমটি জলভির।
জলভিরকে অচল করতে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। তিনটি জাহাজের কোনোটিই ভারতীয় পতাকাবাহী ছিল না। মারিভেক্স ও সেট্টেবেলো পালাউর এবং জলভির গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী ছিল। তবে সব জাহাজেই ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন।
ওমান উপকূলের কাছে এসব হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। ওমানের সশস্ত্র বাহিনী তিনটি জাহাজ থেকে ৬০ জনের বেশি ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করেছে।
এদিকে এমটি সেট্টেবেলোর নিখোঁজ তিন ভারতীয় নাবিককে বৃহস্পতিবার মৃত ঘোষণা করা হয়। নিহতদের একজন ২৩ বছর বয়সী আদিত্য শর্মা। হিমাচল প্রদেশের বাসিন্দা আদিত্য ডেক ক্যাডেট হিসেবে কাজ করছিলেন এবং লাইসেন্সধারী জাহাজ কর্মকর্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন।