ভারতের সবচেয়ে নয়নাভিরাম জায়গাগুলোর মধ্যে লাদাখ একটি। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক সেখানে ঘুরতে যান। লাদাখের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্যের ফলে এই স্থানটির এক অনন্য অবস্থান রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে লাদাখ আলোচনায় রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে। এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে এই জায়গাটি। এই আন্দোলন কোনো সামরিক বা আন্তর্জাতিক বিরোধ নিয়ে নয়। বরং এটি লাদাখের স্থানীয় জনগণের পরিচয়, পরিবেশ এবং ভূমির অধিকার রক্ষার এক তীব্র সংগ্রাম। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে বিভক্ত করে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে উন্নীত করার পর থেকেই এই অসন্তোষের বীজ রোপিত হয়, যা এখন পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
লাদাখের আন্দোলন মূলত যে দুটি প্রধান স্থানীয় সংগঠনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো হলো লেহ অ্যাপেক্স বডি (LAB) এবং কার্গিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (KDA)। এই আন্দোলনকে একটি সংগঠনের একক দাবি হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে। বরং একে লাদাখের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য একাধিক জরুরি দাবির সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় দাবি হলো লাদাখকে ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের (Sixth Schedule) আওতায় আনা। লাদাখের জনসংখ্যার প্রায় ৯৭% উপজাতি বা আদিবাসী। ষষ্ঠ তফসিল বিশেষ করে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরামের মতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ (Autonomous District Councils-ADCs) গঠনের ক্ষমতা দেয়।
লাদাখের জনগণ মনে করে, এই তফসিল তাদের ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে বাইরের প্রভাব থেকে রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর উপায়। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হওয়ার পর লাদাখে ভূমি ও সরকারি চাকরির ওপর স্থানীয়দের নিয়ন্ত্রণ হারানোর যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা রোধ করতে এই ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে তাদের বিশ্বাস।
ষষ্ঠ তফসিলভুক্তির পাশাপাশি আন্দোলনকারীরা লাদাখের জন্য পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (Statehood) দাবি করছে। ২০১৯ সালে লাদাখকে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে পৃথক করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে সেখানকার জনগণ এর মাধ্যমে প্রত্যাশিত ক্ষমতা বা প্রতিনিধিত্ব পায়নি। ২০১৯ সালের পর থেকে বর্তমানে লাদাখের প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যেখানে কোনো নির্বাচিত আইনসভা নেই। স্থানীয় নেতারা মনে করেন, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদ না থাকায় স্থানীয় জনগণের মতামত এবং প্রয়োজনগুলো দিল্লিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেলে স্থানীয়দের হাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে, যা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক।
লাদাখ পৃথিবীর অন্যতম ভঙ্গুর পরিবেশগত অঞ্চলের অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানকার হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, যা স্থানীয় জলের উৎস এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এর পাশাপাশি পর্যটন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বাইরের বড় কর্পোরেশনগুলোর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ লাদাখের নাজুক বাস্তুতন্ত্রকে আরও বিপন্ন করে তুলেছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছে যে, ভূমি সুরক্ষার বিশেষ আইনি কাঠামো না থাকলে বাইরের বিনিয়োগকারীরা এসে তাদের সীমিত জমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যা পরিবেশ বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করবে। তারা তাদের জলের উৎস এবং হিমবাহগুলো রক্ষার জন্য প্রশাসনের দিক থেকে কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করে।
এই আন্দোলনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পর বাইরের লোকদের জন্য লাদাখের সরকারি চাকরি এবং ব্যবসায়িক সুযোগ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। লাদাখের স্থানীয় তরুণরা আশঙ্কা করছে যে এর ফলে হয়তো প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়বে এবং সরকারি চাকরিতে স্থানীয়দের জন্য কোনো বিশেষ সংরক্ষণ থাকবে না। এছাড়াও, ভূমি উন্মুক্ত হয়ে গেলে জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা তাদের বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
লাদাখের এই আন্দোলন ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি নিছক একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি পরিবেশগত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবিও সামনে এসেছে, যে দাবিগুলো অঞ্চলটির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের দাবি, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা তাদের রাজনৈতিক সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন তারা স্বায়ত্তশাসন, পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবচ চায়। এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র
১) What led to ‘Gen Z’ protest in Ladakh? All you need to know
২) Ladakh protests: what do protesters want?