একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বমঞ্চে দেশগুলো আর শুধু ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে না। বর্তমানের যুদ্ধটা বহুমাত্রিক। এখন রাষ্ট্রগুলো সরাসরি আক্রমণ না চালিয়ে মানুষ মন, চিন্তায় ও রুচিতে বিনিয়োগ করে বিশাল অংকের অর্থ। এই নতুন ধরনের লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটির নাম ‘সফট পাওয়ার’, যেখানে সামরিক শক্তি নয়, বরং একটি দেশের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আদর্শ এবং বৈদেশিক নীতিই হয়ে ওঠে তার প্রভাব বিস্তারের মূল হাতিয়ার। এখানে জেতার কৌশল হলো জোর করা নয়, বরং আকর্ষণ করা৷ ভয় না দেখিয়ে বরং নানাভাবে প্রভাবিত করে চিন্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়া।
আপনি যখন নেটফ্লিক্সে কোনো কোরিয়ান ড্রামা দেখে পরের দিন কোরিয়ান নুডলস খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন, কিংবা হলিউডের কোনো সুপারহিরো মুভি দেখে মার্কিন জীবনযাত্রা সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করেন, তখন আপনি নিজেও এই সফট পাওয়ারের খেলার নীরবে অংশগ্রহণ করে ফেলেন৷ এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি সুচিন্তিত কৌশলের বহিঃপ্রকাশ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর ধারণাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে হলিউড, কোকা-কোলা, ম্যাকডোনাল্ডস এবং মাইকেল জ্যাকসনের মতো সাংস্কৃতিক আইকনদের মাধ্যমে। এর ফলে শুধু তাদের পণ্যই বিক্রি হয়নি, বরং তাদের জীবনধারা, মূল্যবোধ এবং গণতন্ত্রের ধারণাও বিশ্বের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে এই ময়দান এখন আর একচেটিয়া মার্কিন দখলে নেই। খেলার নতুন এবং শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এশিয়ার দেশগুলো। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। মাত্র দুই দশক আগেও যা ছিল একটি প্রায় অপরিচিত দেশ, সেই দক্ষিণ কোরিয়া আজ ‘কোরিয়ান ওয়েভ’ দিয়ে বিশ্বকে মাত করে ফেলেছে। বিটিএস-এর মতো কে-পপ ব্যান্ড আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিউজিক্যাল ব্র্যান্ডগুলোর একটি, ‘স্কুইড গেম’ বা ‘প্যারাসাইট’-এর মতো কনটেন্ট বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
এই সাংস্কৃতিক জোয়ারের ফলে কোরিয়ান ভাষা শেখার আগ্রহ, তাদের প্রসাধনী সামগ্রীর চাহিদা এবং কোরিয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা- সবই বেড়েছে বহুগুণে। কোরিয়া কোনো বুলেট খরচ না করেই বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের মনে নিজেদের জন্য একটি ইতিবাচক ও শক্তিশালী জায়গা তৈরি করে নিয়েছে।
অন্যদিকে, চীনও তার হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতিকে নতুন মোড়কে হাজির করছে। বিশ্বজুড়ে তারা প্রতিষ্ঠা করেছে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’, যার মাধ্যমে চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের বিশাল বাজেটের চলচ্চিত্রগুলো এখন হলিউডকে পাল্লা দিচ্ছে, যেখানে দেখানো হচ্ছে এক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ চীনের ছবি।
চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, এটি তাদের সফট পাওয়ার বিস্তারেরও একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর করছে। এই দৌড়ে ভারতও পিছিয়ে নেই। বলিউড সিনেমার রঙিন জগৎ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের এক বিশাল সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি ইয়োগা বা যোগব্যায়ামকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়ে ভারত নিজেদেরকে একটি আধ্যাত্মিক ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছে।
কিন্তু কেন এই সফট পাওয়ার এতটা গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একটি দেশের প্রতি যদি অন্য দেশের মানুষের ইতিবাচক ধারণা থাকে, তবে সেই দেশের পণ্যের প্রতি আস্থা বাড়ে, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করা সহজ হয়। যখন কোনো দেশের সংস্কৃতিকে মানুষ ভালোবাসে, তখন সেই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকেও তারা সহজে মেনে নেয়।
তবে সফট পাওয়ার তৈরি করা যতটা কঠিন, তা নষ্ট করা ততটাই সহজ। একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা মানবাধিকার লঙ্ঘন রাতারাতি একটি দেশের ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। তাছাড়া, কোনো দেশের সাংস্কৃতিক প্রচার যদি অতিরিক্ত আগ্রাসী বা কৃত্রিম মনে হয়, তবে তা উল্টো ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে সমালোচিত হতে পারে।
শেষে এসে বলা যায়, আজকের এই সংযুক্ত বিশ্বে ক্ষমতার লড়াইটা কেবল ভূখণ্ড দখলের নয়, বরং মানুষের মন দখলের। যে দেশ সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প বলতে পারবে, যে দেশের সংস্কৃতি মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি আবেদন তৈরি করতে পারবে, সেই দেশই হয়ে উঠবে আগামী দিনের প্রভাবশালী শক্তি। আর এই লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রটি হলো সংস্কৃতি, যা নিঃশব্দে, অলক্ষ্যে একটি দেশের সবচেয়ে বড় দূত হিসেবে কাজ করে যায়।
তথ্যসূত্র
২) Soft Power and the Public Diplomacy Revisited