Skip to main content

Ridge Bangla

হানিট্র‍্যাপ ও রাষ্ট্রদ্রোহ: ভারতের গুপ্তচর কেলেঙ্কারির মুখচ্ছবি

২০২৫ সালে ২২ এপ্রিল, পাহেলগাঁও হামলার পর, ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তে একটি বিস্তৃত গুপ্তচর নেটওয়ার্কের খোঁজ মেলে। প্রায় দেড় হাজার সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করে, গোয়েন্দারা ধাপে ধাপে সেখান থেকে ৩০ জনকে চিহ্নিত করেন, যাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ উঠে আসে।

News18–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একাধিক রাজ্যের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসে। প্রাথমিকভাবে প্রত্যেক সন্দেহভাজনের একটি বিশদ রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয় এবং তারপর তাদের কার্যকলাপ মিলিয়ে দেখা হয়। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি পরিষ্কার প্যাটার্ন সামনে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কিছু কর্মকর্তা ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনের ছদ্মাবরণে থেকে সরাসরি এসব চক্রান্ত পরিচালনা করেন।

লালসার ফাঁদে ফেলে তথ্য ফাঁস

তদন্তে সবচেয়ে ভয়াবহ যে দিকটি উঠে আসে তা হলো ‘হানিট্র্যাপ’। পাকিস্তানি গুপ্তচররা ভারতীয় নারীর ছদ্মবেশে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পুরুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয় এক ধরনের “অনুভূতির সম্পর্ক”। তারই ফাঁদে পড়ে একসময় এই ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করে দেন। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন ছাত্র, কেউ ইউটিউবার, কেউ বা  সরকারি ঠিকাদার। এদের অনেকেই সেনা ঘাঁটির ছবি, লোকেশন, চলাচলের তথ্য প্রদান করত, যা যুদ্ধকৌশল বিশ্লেষণে কার্যকর। তথ্য আদানপ্রদানে ব্যবহৃত হতো হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম কিংবা বিশেষভাবে তৈরি করা কিছু অ্যাপ। বার্তা এনক্রিপ্ট থাকায় তা চিহ্নিত করা কঠিন ছিল। ধরা পড়া অধিকাংশই মানুষই হরিয়ানা, পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং উত্তরপ্রদেশের।

চিহ্নিত অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কারা?

রবীন্দ্র মুরলিধর ভার্মা (থানে, মহারাষ্ট্র)

২৭ বছর বয়সী এক প্রতিরক্ষা ঠিকাদার। পাকিস্তানভিত্তিক এক হ্যান্ডলারের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে ১৪টি ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন সংক্রান্ত স্কেচ, অডিও ক্লিপ ইত্যাদি ফাঁস করেন। এক নারীর ছদ্মবেশধারী ফেসবুক প্রোফাইলের মাধ্যমে তিনি হানিট্র্যাপে পড়েন।

জসবির সিং ওরফে ‘জান মহল‘ (তারনতারন, পাঞ্জাব)

একজন ইউটিউবার। তিনি পাকিস্তানপন্থী কনটেন্ট প্রচার করতেন। পাকিস্তানি নাগরিকদের সঙ্গে তার ভালোই দহরম মহরম ছিল, এবং তিনি আর্থিক লেনদেনেও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শাকুর খান (জয়সালমের, রাজস্থান)

একজন সরকারি কর্মকর্তা। একাধিকবার পাকিস্তান সফর করেছেন এবং সীমান্তসংলগ্ন সেনা অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেবেন্দ্র সিং ঢিল্লন (রোহতক, হরিয়ানা)

২৫ বছর বয়সী ছাত্র। কর্তারপুর করিডরের মাধ্যমে পাকিস্তানে গিয়ে মিলিটারি ইনস্টলেশনের ছবি তুলে টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রেরণ করেন। আইএসআই হ্যান্ডলারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মোহাম্মদ মুর্তাজা আলি (জালন্ধর, পাঞ্জাব)

একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে ভারতের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য পাকিস্তানে পাঠানোর অভিযোগে গ্রেফতার হন।

মোহাম্মদ তারিফ (মেওয়াত, হরিয়ানা)

ভারতীয় বিমান ঘাঁটি ও সামরিক বাহিনীর চলাচলের ভিডিও পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি পাকিস্তান হাইকমিশনের কিছু সংযোগসূত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আরমান (নুহ, হরিয়ানা)

২৬ বছর বয়সী এক যুবক। আর্মি এক্সপো ও সেনাঘাঁটির ছবি পাকিস্তান হাইকমিশনের সংশ্লিষ্টদের পাঠাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শাহজাদ (মোরাদাবাদ, উত্তরপ্রদেশ)

একজন ব্যবসায়ী, যিনি চোরাচালানের আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্ক চালাতেন। তিনি আইএসআই–এর সরাসরি সংস্পর্শে ছিলেন বলে দাবি গোয়েন্দাদের।

জ্যোতি মালহোত্রা

ভারতের জনপ্রিয় ট্রাভেল-ভ্লগার জ্যোতি মালহোত্রাকে ২০২৫ সালের মে মাসে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আইএসআই-এর হানিট্র্যাপে পড়ে যান। তাঁর আয় ও ভ্রমণব্যয়ে অসামঞ্জস্যতা, পাকিস্তান সফর ও দূতাবাস কর্মী দানিশের সঙ্গে যোগাযোগ তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে।

সতীন্দ্র সিওয়াল (হাপুর, উত্তরপ্রদেশ)

২০২৪ সালে ভারতের মস্কো দূতাবাসে কর্মরত সতীন্দ্র সিওয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক আইএসআই এজেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি ভারতীয় প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গোপন নথি ফাঁস করেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি গোপনীয়তা আইনে মামলা হয়।

প্রদীপ কুরুলকার (পুনে, মহারাষ্ট্র)

ডিআরডিওর এক ল্যাবরেটরির পরিচালক প্রদীপ কুরুলকারকে ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি হোয়াটসঅ্যাপে এক পাকিস্তানি নারী এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রকল্প সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস করেন। ১,৮৩৫ পৃষ্ঠার চার্জশিটে এসব বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

নিশান্ত আগারওয়াল (নাগপুর, মহারাষ্ট্র)

২০১৮ সালে ব্রহ্মোস মিসাইল প্রকল্পে কর্মরত নিশান্ত আগরওয়ালকে আইএসআই-এর হানিট্র্যাপে ফাঁসিয়ে তথ্য পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

মাধুরী গুপ্তা (দিল্লি)

২০১০ সালে পাকিস্তানে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিক মাধুরী গুপ্তাকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তথ্য ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রেমের ফাঁদে পড়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। ২০১৮ সালে তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

ভারতীয় নৌ-অফিসার

১৯৯০-এর দশকে করাচিতে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এক পাকিস্তানি নার্সের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তদন্তে জানা যায়, তিনি ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে পড়েন এবং দেশীয় গোপন তথ্য বিপদের মুখে পড়ে। পরে তাকে ভারত ফিরিয়ে এনে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।

এই গোয়েন্দা তদন্তে উঠে এসেছে যে আধুনিক প্রযুক্তি, সামাজিক মাধ্যম এবং মানবীয় দুর্বলতার ফাঁদে ফেলে কীভাবে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের নিরাপত্তা কাঠামোয় ছিদ্র সৃষ্টি করতে চায়। হানিট্র্যাপ, আর্থিক লোভ এবং পরিচিতির আকাঙ্ক্ষার সুযোগ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদেরও জড়িয়ে ফেলা হয়েছে এই চক্রান্তে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ভবিষ্যতে এমন ষড়যন্ত্র রুখতে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও জনসচেতনতা একান্ত প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র
  1. Case Study – Honey trap – Staysafeonline
  2. Pakistan’s ISI honey traps get hyperactive on Indian social …
  3. Jyoti Malhotra and the history of honey-trapping
  4. Honeytraps and high treason: The faces behind India’s spy …
  5. Pakistan spies pose as Indian girls to honeytrap desi …
This post was viewed: 39

আরো পড়ুন