Skip to main content

Ridge Bangla

রোমুলাস ও রেমাস: রোম শহরের দুই কিংবদন্তি প্রতিষ্ঠাতা

 রোমান কিংবদন্তি অনুসারে, রোম শহরের জন্ম হয়েছিল যমজ দুই ভাই রোমুলাস ও রেমাসের হাতে, ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তবে, শহরের প্রাচীর সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই, এক ভাইয়ের মৃত্যু ঘটে। এই কাহিনি প্রাচীন রোমানদের আত্মপরিচয়, বীরত্ববোধ এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের এক প্রতীকী প্রকাশ।

ট্রয় থেকে ইতালির পথে

রোমানরা বিশ্বাস করত, তারা ট্রয় নগরীর উত্তরসূরি। গ্রিকদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ট্রয় থেকে পালিয়ে এসেছিলেন বীর এইনিয়াস, যিনি ছিলেন ট্রয়ের রাজপরিবারের সদস্য এবং হেক্টর ও প্যারিসের দূরসম্পর্কীয় ভাই। দেবী ভেনাসের পুত্র এইনিয়াস পিতাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ট্রয় ত্যাগ করেন এবং সহযাত্রীদের নিয়ে বহু বছর ধরে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ান।

সিসিলি ও কার্থেজ হয়ে তারা এসে পৌঁছান ইতালির লাতিয়াম অঞ্চলে। সেখানকার রাজা লাতিনাস তাঁর একমাত্র কন্যা লাভিনিয়ার সঙ্গে এইনিয়াসের বিয়ে দেন। কিন্তু অপর এক রাজপুত্র, টারনাস লাভিনিয়াকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন। ফলে বাঁধে সংঘর্ষ। এই যুদ্ধে একদিকে ছিলেন ভেনাস, অন্যদিকে দেবী জুনো। শেষ পর্যন্ত জুপিটার জুনোকে নিরপেক্ষ থাকতে রাজি করান, আর জয়ী হন এইনিয়াস। এরপর এইনিয়াস তাঁর স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠা করেন লাভিনিয়াম নগরী, এবং হয়ে উঠেন লাতিনদের নেতা। পরে তাঁর পুত্র অ্যাসকানিয়াস রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন অ্যালবা লংগা, যা রোম থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। বহু প্রজন্ম পর, এই বংশধারায় জন্ম নেন রাজা নামিটর, যাঁর শাসনকালে ঘটে রোমের প্রকৃত প্রতিষ্ঠার নাট্যময় সূচনা।

যমজের জন্ম ও নির্বাসন

নামিটরের ভাই অ্যামুলিয়াস তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজে রাজা হন। একটি ভবিষ্যদ্বাণী হয় যে,  নামিটরের কোনো উত্তরসূরি একদিন তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। সেই ভয়ে অ্যামুলিয়াস ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তিনি নামিটরের কন্যা রিয়া সিলভিয়াকে দেবী ভেস্টারের যাজিকা হিসেবে নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি কোনোদিন সন্তান জন্ম দিতে না পারেন। কিন্তু যুদ্ধের দেবতা মার্সের সঙ্গে এক রহস্যময় মিলনের ফলে রিয়া জন্ম দেন যমজ দুই পুত্র, রোমুলাস ও রেমাসের। এই সংবাদ পেয়ে অ্যামুলিয়াস এই যমজ শিশুদের হত্যা করতে বলেন। তবে যাদেরকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা শিশুদের টিবার নদীতে ছুড়ে ফেলে না দিয়ে নদীর ধারে রেখে আসে।

লুপারকাল

তবে প্রকৃতি তাদের রক্ষা করে। লুপারকাল নামে এক মাদি নেকড়ে তাদের স্তন্যপান করিয়ে পেলে পুষে বড় করে। এরপর তাদের খুঁজে পায় নামিটরের অনুগত ফাউস্টুলাস নামের এক রাখাল। সে শিশুদের নিজের ঘরে এনে লালনপালন করে। শৈশবে তারা নিজেদের প্রকৃত পরিচয় না জানলেও, ধীরে ধীরে তারা নেতৃত্বগুণে সমাজে প্রভাব ফেলতে থাকে। একবার অ্যামুলিয়াসের রাখালদের সঙ্গে সংঘর্ষে রেমাস ধরা পড়লে, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজপ্রাসাদে। রোমুলাস তাঁর অনুগামীদের নিয়ে ভাইকে উদ্ধার করতে অভিযান চালান। সেই সংঘর্ষে তারা অ্যামুলিয়াসকে হত্যা করলে নামিটর তার পুরোনো সিংহাসন ফিরে পায়। এই সময়েই যমজেরা জানতে পারে তাদের আসল পরিচয়। তাঁদেরকে সিংহাসনে বসার প্রস্তাব দেওয়া হলেও, তারা তা প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব নতুন শহর গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।

শহর প্রতিষ্ঠা ও দ্বন্দ্ব

তারা শহরটি গড়তে চায় সেই জায়গায়, যেখানে তাদের শিশু অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই ভাই শহরের অবস্থান নিয়ে মতভেদে জড়ায়। রোমুলাস চান প্যালাটাইন পাহাড়ে শহর গড়তে, আর রেমাস চান অ্যাভেন্টাইন পাহাড়ে। তারা সিদ্ধান্ত নেন, দেবতাদের কী ইচ্ছা, তা পাখি দেখার মাধ্যমে তারা জেনে নিবেন। রেমাস প্রথমে ছয়টি পাখি দেখেন, এরপর রোমুলাস দেখেন বারোটি। রেমাস প্রথমে পাখি দেখায় তিনি নিজেকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু রোমুলাস বলেন, আমি তোমার থেকে বেশি পাখি দেখেছি। সেজন্য আমিই প্রকৃত বিজয়ী। এই বিতর্ক ক্রমশ বাড়তে থাকে। রোমুলাস এরপর নিজের মত করে শহরের প্রাচীর খনন ও নির্মাণ শুরু করেন। রেমাস বিদ্রুপ করে সেই দেয়াল পার হন, যা রোমুলাসের ক্রোধকে উসকে দেয়। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এরপর রোমুলাস নিজে অথবা তাঁর অনুগামীরা রেমাসকে হত্যা করেন। যদিও অধিকাংশ সংস্করণে রোমুলাসই ঘাতক। কবি ওভিডের ভাষ্যমতে, রেমাসকে হত্যা করেন সেলার নামক এক অনুচর। কারণ, রোমুলাসের ওপর যাতে ভ্রাতৃহত্যার দাগ না পড়ে, বরং ভাইয়ের প্রতি তার ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি উঠে আসে, এজন্যই তিনি এই ভাষ্য দেন।

দেবত্বের পথে রোমুলাস

রোমুলাস পরবর্তী সময়ে রোম শহরের প্রথম রাজা হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি শহরের সীমা নির্ধারণ করেন, কর ও সামরিক সংগঠনের জন্য নাগরিকদের তিনটি গোত্রে ভাগের পাশাপাশি এবং সিনেট প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দেবতা জুপিটারকে নিয়মিত উৎসর্গ দিয়ে তাঁর আশীর্বাদ অর্জনের চেষ্টা করেন। পত্নীহীন নাগরিকদের জন্য তিনি প্রতিবেশী সভিন নারীদের অপহরণ করেন, যা এক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। পরে এই দুই জনগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে রোমের জনসংখ্যা গঠন করে। রোমুলাসের মৃত্যুর পর বিশ্বাস করা হয়, তিনি দেহসমেত স্বর্গে আরোহণ করেছেন। কোয়েরিনাস নামে দেবতা রূপে পূজিত হন তিনি।

ইতিহাস বনাম কিংবদন্তি

রেমাসের ব্যক্তিগত মর্যাদা কখনো রোমানদের মধ্যে গুরুত্ব পায়নি। তিনি সবসময় রোমুলাসের ছায়ায় ছিলেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, শহরটি ৭৫৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত হলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, রোম একটি ছোট লাতিন ও সভিন জনগোষ্ঠীর বসতি হিসেবে গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের শুরুতে। আলবা লোঙ্গা, যাকে গল্পে বড় এক রাজ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, আসলে সেটি ছিল কয়েকটি ছোট গ্রাম নিয়ে গঠিত।

রোমুলাস ও রেমাসের উপাখ্যান ঐতিহাসিকভাবে সত্য না হলেও, রোমান জাতি কীভাবে নিজেদের গড়েছে, তা বোঝার জন্য এই গল্প অমূল্য। দেবী ভেনাসের বংশধর, যুদ্ধদেবতা মার্সের সন্তান, এবং দেবতাদের আশীর্বাদপুষ্ট এক মহানগর এই ছিল রোমানদের নিজেদের উপলব্ধি।

তথ্যসূত্র 
  1. Romulus and Remus | Story, Myth, Definition, Statue, & Facts
  2. Romulus and Remus – ODYSSEY/Rome – Emory University
  3. Romulus and Remus – The founding of Rome
  4. Romulus and Remus – World History Encyclopedia
  5. Romulus and Remus: The Legendary Founders of Rome
This post was viewed: 63

আরো পড়ুন