Skip to main content

Ridge Bangla

আয়রন ডোম: ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অদৃশ্য ঢাল

আয়রন ডোম বা কিপ্পাত বারজেল (হিব্রু) ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ২০১১ সালের মার্চ মাস থেকে এটি পূর্ণমাত্রায় কার্যকর রয়েছে। এর পর থেকেই এটি অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও স্বল্প-পাল্লার আকাশ হামলা থেকে ইসরায়েলি নাগরিকদের জীবন রক্ষা করে চলেছে।

গত কয়েক মাসে ইসরায়েল একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে। গাজা থেকে হামাস, লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেন থেকে হুথি বিদ্রোহী- সবদিক থেকেই চাপ বাড়ছে। এমনকি ইরানও সরাসরি আক্রমণে অংশ নিয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইসরায়েল তার শক্তিশালী ও বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে আয়রন ডোম, ড্যাভিড’ড স্লিং, অ্যারো ২, অ্যারো ৩, এবং যুক্তরাষ্ট্র-প্রেরিত THAAD।

আয়রন ডোম কীভাবে কাজ করে?

আয়রন ডোম ইসরায়েলের সবচেয়ে পরিচিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মূলে রয়েছে একটি শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা, যা আকাশপথে আসা শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে এবং তা কোন দিকে যাচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে। যদি দেখা যায় ক্ষেপণাস্ত্রটি জনবসতি, শিল্পাঞ্চল বা কৌশলগত কোনো স্থাপনার দিকে ধেয়ে আসছে, তবে কমান্ড সেন্টার সঙ্গে সঙ্গে টামির নামের একটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে, যা মাঝপথে গিয়ে শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দেয়।

তবে এই ব্যবস্থা শুধু সুরক্ষিত এলাকাকে কেন্দ্র করেই কাজ করে। যদি দেখা যায় কোনো ক্ষেপণাস্ত্র জনমানবহীন এলাকায় পড়বে, এবং কোনো ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নেই, তাহলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধরা হয় না।

২০২৩ সালে কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আয়রন ডোম ২.৫ থেকে ৪৩ মাইল দূরত্ব পর্যন্ত ছোঁড়া রকেট, মর্টার ও কামানের গোলা বাধা দিতে সক্ষম। বর্তমানে সারা ইসরায়েলজুড়ে প্রায় ১০টি ব্যাটারি স্থাপন করা হয়েছে, যার প্রত্যেকটি প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকার প্রতিরক্ষা দিতে সক্ষম। প্রতিটি ব্যাটারিতে থাকে তিন থেকে চারটি লঞ্চার, এবং প্রতিটি লঞ্চারে থাকে ২০টি পর্যন্ত টামির ইন্টারসেপ্টর। একটি আয়রন ডোম ব্যাটারি নির্মাণে খরচ পড়ে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০১১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যবস্থার জন্য বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। ইজরায়েল ডিফেন্স সিস্টেমের দাবি, আয়রন ডোম টার্গেট করা রকেটের ৯০ শতাংশই সফলভাবে ধ্বংস করতে পারে।

ইরান বনাম ইজরায়েল

ইরানের কাছে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন, এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ নানা ধরনের দূরপাল্লার অস্ত্রভাণ্ডার। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার। ফলে, ইরান থেকে ছোঁড়া অস্ত্রগুলোর অধিকাংশই মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। যদিও সর্বশেষ হামলায় ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারে ‘ফাত্তাহ-১’ এবং ‘ইমাদ’ সহ নানা ধরনের শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। উৎক্ষেপণ থেকে আঘাত হানার সময়ের ব্যবধান খুবই কম। এরা অত্যন্ত উচ্চ গতি ও উচ্চতায় চলে। ফলে প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাতে থাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ নামে আসলে বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি অংশমাত্র। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের জন্য আয়রন ডোম যথেষ্ট নয়। সে কাজটি সামলায় প্রতিরক্ষার উচ্চস্তরের ব্যবস্থা। যথা, ডেভিড’স স্লিং, অ্যারো-২ ও অ্যারো-৩।

ডেভিড’স স্লিং

ডেভিড’স স্লিং মূলত মাঝারি ও দীর্ঘ-পাল্লার রকেট, ক্রুজ মিসাইল ও ব্যালিস্টিক মিসাইল থামানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি ৩০০ কিলোমিটার দূরত্বের শত্রু মিসাইলও ধ্বংস করতে পারে। রাফায়েল এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠান রেথিওন যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে। ২০১৭ সালে সক্রিয়ভাবে এর ব্যবহার শুরু হয়। আয়রন ডোমের মতো এটিও কেবল সেই মিসাইল লক্ষ্য করে, যেগুলো জনবসতিতে আঘাত হানার সম্ভাবনা রাখে। এই ব্যবস্থার স্টানার মিসাইলের প্রতি ইউনিটের দাম প্রায় ১০ লাখ ডলার।

অ্যারো ২ এবং অ্যারো ৩

অ্যারো ২ মূলত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে তৈরি করা হয়েছে। এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উপর, বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে।

অ্যারো ২ প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে শত্রু মিসাইল শনাক্ত করতে পারে এবং ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে তা ধ্বংস করতে সক্ষম। এর মিসাইল শব্দের চেয়েও নয় গুণ বেশি গতিতে ছুটে চলে এবং একসঙ্গে ১৪টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

সীমাবদ্ধতা

আয়রন ডোম অসংখ্য প্রাণ বাঁচালেও, এর কিছু দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যদি শত্রুপক্ষ একযোগে বহু দিক থেকে সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে এ ধরনের “স্যাচুরেশন অ্যাটাক” আয়রন ডোমকে চাপে ফেলতে পারে।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি চিরস্থায়ী?

যেকোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিরক্ষাকারীর হাতে থাকা ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যাই মূলত তার সক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে। আক্রমণকারীর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে, তার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত। কিন্তু প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে, একেকটি শত্রু ক্ষেপণাস্ত্রের বিপরীতে একাধিক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়, যাতে প্রথমটি ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়টি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে।

আক্রমণকারী অবশ্য ধরেই নেয় কিছু ক্ষেপণাস্ত্র পথেই ধ্বংস হবে। তাই তারা এমন একটি ভারসাম্য রাখে, যাতে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকে আক্রমণকারীই। কারণ, এই ক্ষেপণাস্ত্র একাধারে ভারী বিস্ফোরক ও পরমাণু ওয়ারহেডও বহন করতে পারে। ফলে মাত্র কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অতিক্রম করলেও, ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে।

সামনে কী?

ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা একেবারে ভেঙে পড়বে, এমন আশঙ্কা না থাকলেও, একটানা আক্রমণে তাদের ইন্টারসেপ্টর মজুত ফুরিয়ে আসতে পারে। তখন প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা কিছুটা হলেও হ্রাস পেতে বাধ্য।

এই যুদ্ধ ক্রমশ এক ধরনের অস্ত্রভাণ্ডারের প্রতিযোগিতায় পরিণত হতে পারে। কে আগে শেষ হবে? ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত, নাকি ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ইন্টারসেপ্টর ও আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ?

এই প্রতিযোগিতার পরিণতি পূর্বানুমান করা কঠিন। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের আনুমানিক ৩,০০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ইতিমধ্যে ১,০০০ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ, এখনও বিপুল সংখ্যক অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। তবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে এই ঘাটতি কত দ্রুত পূরণ করতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়।

Source:
  1. What are Israel’s Iron Dome, David’s Sling, Arrow and Thaad … – BBC
  2. What is Israel’s Iron Dome? How the missile defense system works
  3. Inside Israel’s Iron Dome, David’s Sling, and Arrow air … – ABC News
  4. How does Israel’s famous air defence work? It’s not just the ‘Iron Dome’
  5. Israel’s air defense against Iran, explained – The Washington Post
This post was viewed: 51

আরো পড়ুন