১৪০২ সালে আঙ্কারার যুদ্ধে তৈমুরের হাতে বিধ্বস্ত হয় উসমানী শক্তি। স্বয়ং সুলতান বায়েজিদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে আটক হয় শত্রুর হাতে। বন্দীশালায় কয়েক মাস পরে মৃত্যুবরণ করেন প্রথম বায়েজিদ।
তৈমুরের হাতে চূর্ণবিচূর্ণ উসমানীরা সাময়িকভাবে ভয়াবহ দুর্বল হয়ে। খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় বায়েজিদের হাতে গড়া বিশাল সাম্রাজ্য। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভাগ হয়ে যায় চার যুবরাজের মধ্যে- ইসা চেলেবি (İsa Çelebi), মুসা চেলেবি (Musa Çelebi), সুলেইমান চেলেবি (Süleyman Çelebi) এবং মেহমেদ চেলেবি (Mehmed Çelebi)। সাম্রাজ্য একীভূত করার চেষ্টায় ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘটিত হয় প্রায় এগার বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধ (The Ottoman Interregnum)। ১৪১৩ সালে মেহমেদ চেলেবির বিজয়ের মাধ্যমে নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ায় উসমানী সাম্রাজ্য।
বিভক্ত সালতানাত
প্রথম বায়েজিদ আর তৈমুরের শক্তি পরীক্ষার ফলাফল উসমানীদের জন্য ছিল বিশাল আঘাত। এর ফলে সামরিক শক্তির পাশাপাশি সুলতানের কর্তৃত্বও ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষ করে আনাতোলিয়াতে বায়েজিদের অধিকৃত বহু এলাকা হাতছাড়া হয়ে যায় উসমানীদের। অবশ্য ইউরোপিয়ান অংশে উসমানী শাসন অক্ষত ছিল।
তৈমুরের সামনে তখন ফাঁকা মাঠ। ইচ্ছে করলে তিনি পুরো আনাতোলিয়াই কব্জা করে নিতে পারতেন। তবে তেমন কোনো ইচ্ছে তাঁর ছিল বলে দেখা যায়নি। সৈন্যদের নিয়ে লুটপাটেই ব্যস্ত ছিলেন বিজয়ী সেনাপতি। তাঁর সাথে যেসব তুর্কি গোত্রপতিরা হাত মিলিয়েছিল প্রত্যেককে বহু জমিজমা দিয়ে পুরস্কৃত করেন তৈমুর। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল চীন অভিযান। তখন পেছন থেকে শক্তিশালী উসমানীরা যেন উৎপাত করতে না পারে সেজন্য আগেই তাঁদের ছেঁটে ফেলেন তিনি।
তৈমুরের পরিকল্পনা শতভাগ সফল হয়েছিল। ইসা, মুসা, সুলেইমান আর মেহমেদ সাম্রাজ্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ শাসন করছিলেন। তৈমুরের সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর কোনো সামর্থ্যই ছিল না তাঁদের।
সুলেইমান চেলেবি
ভাইদের মধ্যে বড় সুলেইমান ঘাঁটি করেছিলেন বল্কানে। আজকের বুলগেরিয়া, থ্রেস আর গ্রীস ছিল তাঁর অধীনে। রাজধানী হিসেবে তিনি বাছাই করেছিলেন বর্তমান তুরস্কের এডির্নকে (Edirne)। তবে অন্য তিন ভাই তাঁকে সুলতান হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা করে দাবি করে সিংহাসন।
আসন্ন সংঘর্ষের প্রস্ততি নিচ্ছিলেন সুলেইমান। ইউরোপিয়ান রাজাদের সমর্থনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেন তিনি। বাইজান্টাইন সম্রাটকে থেসালোনিকি ফিরিয়ে দিয়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়। ১৪০৩ সালে ভেনিসের সাথেও প্রতিষ্ঠিত হয় মিত্রতা।
ইসা চেলেবি
বায়েজিদের দ্বিতীয় সন্তান ইসা চেলেবির কেন্দ্র ছিল উসমানীদের প্রথম রাজধানী, বুর্সা। আনাতোলিয়ার বেশ বড় একটা অংশ ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণে। তবে মোটেও স্বস্তিতে ছিলেন না ইসা, কারণ তৈমুরের সাথে শঠ করা স্থানীয় শাসকেরা ছিল তাঁর প্রতিবেশি। মাঝে মাঝে উসমানী এলাকায় লুটতরাজ করতে প্রবেশ করতো তারা। ফলে প্রায় নিয়মিতই যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকত।
মেহমেদ চেলেবি
ছোট হলেও সবার মধ্যে যোগ্যতম হিসেবে আবির্ভূত হন মেহমেদ চেলেবি। বর্তমান তুরস্কের আমাসিয়া (Amasya) ঘিরে ছিল তাঁর রাজ্য। আমাসিয়া ইউরোপিয়ান আর এশিয়ান অংশের মধ্যবর্তী আমাসিয়া কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তদুপরি মেহমেদ অভিজাত এবং সাধারণ নাগরিক সবার সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষ করে মুসলিম বিভিন্ন গোষ্ঠী, আলেম-উলামা এবং পেশাজীবীদের সংগঠন ছিল তাঁর পক্ষে। শাসক হিসেবেও তাঁর বিচক্ষণতা সিংহাসনের ওপর তাঁর দাবিকে শক্তিশালী করে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত
পিতার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর ইসা আর মেহমেদ চেলেবি সর্বপ্রথম লড়াইতে জড়িয়ে পড়েন। দুই পক্ষের সৈন্যদের বিক্ষিপ্ত সঙ্ঘর্ষ ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৪০৩ সালের প্রথম দিকে এর্মেনি-বেলি (Ermeni-beli) আর (Ulubad) উলুবাদের যুদ্ধে পরাস্ত হন ইসা। মেহমেদ বুর্সা দখল করে নেন। ইসা পালিয়ে যান কন্সট্যান্টিনোপোলে, বাইজান্টাইন সম্রাট আশ্রয় দেন তাঁকে। সম্রাটের অর্থ আর লোকবল নিয়ে আবারো আনাতোলিয়াতে ফিরে আসেন ইসা। কারাসির যুদ্ধে (battle at Karasi) চূড়ান্তভাবে তাকে পরাজিত করেন মেহমেদ। পালিয়ে কারামান শহরে চলে যান ইসা, সেখানে ভাইয়ের পাঠানো আততায়ীরা গোসলখানায় ঢুকে হত্যা করে উসমানী যুবরাজকে।
মেহমেদ সুস্থির হয়ে বসার আগেই আক্রমণ চালান সুলেইমান। ১৪০৪ সালে বুর্সা ছিনিয়ে নেন তিনি, এরপর পতন হয় আঙ্কারার। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে তৈমুরের শরণাপন্ন হলেন মেহমেদ, আটক থাকা এক ভাই মুসা চেলেবিকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। মুসা মুক্ত হয়ে ফিরে এলে একদল সেনা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় কৃষ্ণসাগরের পাড়ি দিয়ে সুলেইমানের এলাকায় অনুপ্রবেশ করার জন্য।
মুসা থ্রেসে জাঁকিয়ে বসলেন। কূটনৈতিক কৌশলে আদায় করলেন বাইজান্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় ম্যানুয়েল (Manuel II Palaiologos), সার্বিয়ার একনায়ক স্টেফান লাজার (Stefan Lazarevic), ওয়ালাচিয়ার শাসক মির্সিয়া এবং বুলগেরিয়ানদের সমর্থন।
সুলেইমান তখন আনাতোলিয়াতে। বল্কানে তিনি ঘেরাও হয়ে যাচ্ছেন দেখে তাড়াহুড়ো করে সমুদ্র পার হয়ে থ্রেসে অবতরণ করলেন তিনি। নতুন করে আরম্ভ হয় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। ১৪১০ সালে কসিমিডিয়নের লড়াইতে (battle of Kosmidion) বিজয়ী হন সুলেইমান, কিন্তু মুসার শক্তি নিঃশেষ হয়নি সেখানে। কয়েক মাস পর এদির্নের সংঘর্ষে সুলেইমানের সৈন্যরা বিশ্বাসঘাতকরা করে। পরাজিত যুবরাজকে মুসার আদেশে হত্যা করা হয়, বল্কান অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর একাধিপত্য।
জনতুষ্টিবাদি নানা নীতি গ্রহণের ফলে অভিজাতশ্রেণী আর আমলাদেরও চক্ষুশূলে পরিণত হন মুসা। ফলে অনেকটাই একা হয়ে পড়েন যুবরাজ। ওদিকে সুলেইমানের পতনের পর মিত্র অনেক খ্রিষ্টীয় রাজা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা আরম্ভ করেন। মুসা তাঁদের আগেও পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না, এবার তো যুদ্ধই ঘোষণা করে বসলেন তাঁদের বিপক্ষে। বাইজান্টাইনদের সাথেও খিটিমিটি লেগে গেল তাঁর।
মুসা সোজা কন্সট্যান্টিনোপোল অবরোধ করে বসেন। বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়েও ঘেরাও ভাঙতে পারলো না বাইজান্টাইনরা। এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় ম্যানুয়েল সহায়তা চেয়ে দূত পাঠালেন মেহমেদের কাছে।
চামুর্লুর যুদ্ধ
প্রয়োজনীয় সেনা সংগ্রহে মনোযোগ দিলেন মেহমেদ। পশ্চিম আনাতোলিয়া থেকেই এসেছিল সিংহভাগ সৈন্য। সাগর পাড়ি দিয়ে দ্বিতীয় ম্যানুয়েল ধার দিলেন জাহাজ। মেহমেদ কন্সট্যান্টিনোপোলের দিকে এগিয়ে গেলে পিছিয়ে আসেন মুসা। এরপর এদির্ন হয়ে কসোভোতে গিয়ে হাজির হলেন মেহমেদ। সেখানে তাঁর দলে যোগ দেন স্টেফান লাজার। বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ার অনতিদূরে চামুর্লুর প্রান্তরে (Çamurlu) আবার ঝরলো রক্ত।
যুদ্ধের শুরুতে মেহমেদের জ্যানিসারিদের নেতা হাসান মুসার সেনাদলকে আহ্বান জানান তাঁদের পক্ষে চলে আসতে। শঙ্কিত মুসা নিজ হাতে হত্যা করেন হাসানকে, কিন্তু জ্যানিসারি নেতার সহকারীদের আক্রমণে আহত হন তিনি। এর মধ্যেই তাঁর দুই সেনাপতি পাশা ইগিত আর সিনান বে পক্ষত্যাগ করে।
লড়াইয়ে প্রথমদিকে অবশ্য মুসাই এগিয়ে ছিলেন। তাঁর সেনারা মেহমেদের ব্যুহে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। তখন স্টেফান লাজার এবং বাইজান্টাইন মিত্রদের সহযোগিতায় পাল্টা আক্রমণ চালান তিনি। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মুসার বাহিনী, পালিয়ে যান যুবরাজ।পরবর্তীতে অবশ্য মুসা ধরা পড়েন, এবং শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাঁকে।
কেন্দ্রীয় শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা
চামুর্লুর পর প্রথম বায়েজিদের উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে দাবি পোক্ত হয় মেহমেদের। প্রথম মেহমেদ হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। আঙ্কারার যুদ্ধের পর হারিয়ে যাওয়া বহু এলাকা আবারো রাজ্যভুক্ত করেন মেহমেদ। বায়েজিদের সময়কার কেন্দ্রীয় শাসন ফিরিয়ে আনেন তিনি, ঢেলে সাজান প্রশাসন। তাঁর গৃহীত বিভিন্ন নীতির ফলে গতিশীল হয় অর্থনীতি। হৃত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পথে এগিয়ে যায় উসমানীরা। পরবর্তী সুলতানদের সময় উসমানী সাম্রাজ্যের প্রসারের ভিত্তি কিন্তু গড়ে দিয়ে যান প্রথম মেহমেদই।
নতুন প্রতিপক্ষ
গৃহযুদ্ধের শঙ্কা আবার দেখা দেয় ১৪১৫ সালে। শত্রুর কারাগারে তখনো বন্দী ছিলেন আরেক যুবরাজ, মোস্তফা। তৈমুরের উত্তরাধিকারী শাহরুখ তাঁকে মুক্ত করে দেয়। সেই সময় মুসার ঘনিষ্ঠ এক মুসলিম পণ্ডিত, শেখ বদরুদ্দিনও বিদ্রোহ করে বসেন। সব মিলিয়ে বেশ উত্তাল সময় পার করতে হয় মেহমেদকে। বদরুদ্দিনকে দমন করলেও রক্তক্ষয় ছিল ভয়াবহ।
মোস্তফার জন্য বাইজান্টাইনদের সাথে চুক্তি করেন মেহমেদ। তারা সম্মত হয় যুবরাজকে আটকে রাখতে, অন্তত যতদিন মেহমেদ সুলতান থাকবেন।
মৃত্যুশয্যায় ছেলে মুরাদকে সুলতান মনোনীত করেন মেহমেদ। অন্যান্য যুবরাজরা যাতে ঝামেলা করতে না পারে সেজন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন। প্রতিশ্রুতি দেন মুরাদের দুই ছোট ভাইকে জিম্মি হিসেবে কন্সট্যান্টিনোপোলে পাঠানোর, বিনিময়ে মোস্তফাকে আজীবন বন্দী রাখবে তারা। চতুর্থ এক ভাই, যার নামও মোস্তফা, তাঁকে শান্ত রাখতে আনাতোলিয়ার কিছু এলাকা ছেড়ে দেন।
কিন্তু মুরাদ সিংহাসনে বসে ভাইদের জিম্মি হিসেবে পাঠাতে অস্বীকার করেন। ফলে চাচা মোস্তফাকে ছেড়ে দেয় বাইজান্টাইনরা। তাঁর সাথে যোগ দেয় ইজমিরের স্থানীয় শাসক। মুরাদের সমর্থকেরা মোস্তফার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে তিনি ভুয়া ব্যক্তি, আসল মোস্তফা নাকি কারাগারেই মারা গেছেন। তবে ভুয়া মোস্তফাকে পরাস্ত করতেও যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয় মুরাদকে। এরপর তিনি ভাই মোস্তফার ব্যবস্থা করেন। কেবল এরপরেই কিছুটা নিশ্চিন্তে শাসন করতে পেরেছিলেন মুরাদ।
References
- Introduction: The battle of Ankara and its consequences in The Sons of Bayezid; The Ottoman Empire and its Heritage, Volume: 38
- Restoration of the Ottoman Empire, 1402–81. Encyclopedia Britannica.
- The Ottoman Civil War