Skip to main content

Ridge Bangla

জঞ্চিয়োর যুদ্ধ: উসমানি সালাতানের নৌ-আধিপত্যের সূচনা

১৪৯৯ সালের আগস্ট মাস, চলছে উসমানী সালতানাত এবং ভেনিসের সংঘাত। ইউরোপে রাজ্যবিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের দ্বৈরথ চলেছিল শতাব্দীব্যাপী। ১৪৯৯ সালের লড়াই গড়িয়েছিল পাঁচ বছর। ইতিহাসে এই সংঘর্ষ পরিচিত দ্বিতীয় উসমানি-ভেনেশিয়ান যুদ্ধ নামে। জঞ্চিয়োর নৌযুদ্ধ এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেখানে প্রথম দুই পক্ষই জাহাজে কামান ব্যবহার করেছিল।

জঞ্চিয়োর লড়াই (The naval Battle of Zonchio) লেপান্তোর প্রথম যুদ্ধ (First Battle of Lepanto) অথবা ব্যাটল অব স্যাপিয়েঞ্জা (Sapienza) নামেও উল্লিখিত। আগস্ট চারটি ভিন্ন দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই সংঘাত- ১২, ২০, ২২ এবং ২৫। শেষ হাসি হেসেছিল উসমানী নৌবাহিনীই, এবং দ্বিতীয় উসমানী-ভেনিস যুদ্ধের সমাপ্তিতে তাদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিল ইউরোপের তৎকালীন অন্যতম নৌশক্তি ভেনিস।

ভেনিসের সাথে উসমানীদের বিবাদ চলছিল চতুর্দশ শতকের শেষ থেকেই। ১৪৫৩ সালে কন্সট্যান্টিনোপোল বিজয়ের পর সমস্যা আরো বেড়ে যায়। ইউরোপের কাছে কন্সট্যান্টিনোপোল ছিল উসমানীদের প্রসারের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টীয় সাম্রাজ্যের প্রধান সুরক্ষাদাতা। তাদের পতনের পর এই দায়িত্ব চলে যায় ভেনিসের কাছে। দশ বছরের মাথায় শুরু হয় প্রথম উসমানী-ভেনিস যুদ্ধ। পনের বছরের মাথায় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের (Mehmet II) হাতে পরাস্ত হয় তারা।

তবে পরাজিত হলেও হতোদ্যম হয়ে পড়েনি ভেনিসবাসী। উসমানীরা বুঝতে পারে শত্রুর সাথে নতুন সংঘাত অনিবার্য, এবং সেখানে নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভেনিসের নৌশক্তি সারা বিশ্বে ছিল সুবিদিত, অন্যদিকে উসমানী নৌবাহিনী তখন কেবল শৈশবকাল পার করছে। সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ তাদের জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ করেন। নতুন নতুন জাহাজ নির্মিত হয়, নিয়োগ পায় দক্ষ লোকজন। আফ্রিকার উপকূল দাপিয়ে বেড়ানো জলদস্যুদের অনেকেই যোগ দেয়। তখনকার দিনে এটা ছিল খুব স্বাভাবিক ঘটনা।

১৪৯৯ সালের জানুয়ারিতে অ্যাডমিরাল কামাল রেইস (Kemal Reis) ১৪টি জাহাজ নিয়ে কন্সট্যান্টিনোপোল ত্যাগ করেন। চার মাস পর বিশাল এক বহর যোগ দেয়া তার সাথে, উদ্দেশ্য ভেনিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করা। সব মিলিয়ে এই দলে ছিল আড়াইশোর বেশি জাহাজ, এর ২০০টি ছিল ছোট আকারের জাহাজ, বাকিগুলো বড় রণতরী। সব মিলিয়ে ৩৫,০০০ লোক ছিল কামাল রেইসের সাথে।

ভেনিস তখন যাচ্ছে পুনর্গঠনের মধ্যে দিয়ে। মার্চে নৌবাহিনীর জন্য নতুন এক ক্যাপ্টেন-জেনারেল নির্বাচিত করেছে তারা। এন্টোনিও গ্রিমানি (Antonio Grimani) নামে অভিজাত এই ব্যক্তি নৌযুদ্ধের সাথে অপরিচিত নন, তবে বড় আকারের লড়াই চালানোর অভিজ্ঞতা তার নেই।

গ্রিমানির কাছে রেইসের খবর পৌঁছে গিয়েছিল সময়মতোই। উসমানী সেনারা কর্ফু দ্বীপ অথবা লেপান্তোর বন্দরে হামলা চালাতে পারে বলে জানিয়েছিল গুপ্তচররা। আগস্টে রেইসের জাহাজ লেপান্তোর অদূরে আবির্ভূত হলে পরিষ্কার হয়ে যায় তাদের গতিপথ। এই বন্দর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং উসমানীদের পদাতিক সেনারা সেদিকেই আসছিল। শক্তিশালী নগরপ্রাচীর ভাঙতে তাদের দরকার ছিল বড় কামান, সেটাই নিয়ে এসেছিলেন রেইস। গ্রিমানির দায়িত্ব ছিল তিনি যাতে সেটা ডাঙ্গায় নামাতে না পারেন সেটা নিশ্চিত করা।

ভেনিসের বহরে ছিল ৯৫টি রণতরী। জুলাইয়ের শেষ দিকে গ্রিসের অদূরে কোরন আর মোডন দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশে দু’পক্ষের দেখা প্রায় হয়েই গিয়েছিল, উপকূল ধরে বেশ কিছুদূর সমান্তরালে চলাচল করছিল তারা। কিন্তু রেইসের মূল উদ্দেশ্য লেপান্তোয় কামা পৌঁছে দেয়া। শত্রুজাহাজের মোকাবেলা করতে গিয়ে সেকাজে বিঘ্ন ঘটানোর কোনো ইচ্ছে ছিল না উসমানী অ্যাডমিরালের। ফলে তারা তীর ঘেঁষে ভিন্ন পথ ধরে ফাঁকি দেয় গ্রিমানিকে।

১২ আগস্ট জঞ্চিয়োর উপসাগরে রেইসকে আবার দেখতে পান গ্রিমানি। দ্রুত ব্যুহ রচনা করলেন তিনি। সামনে থাকল সবচেয়ে ভারী রণতরী, এদের আঘাতে শত্রুরা পালাতে থাকলে ধাওয়া করার জন্য পেছনে থাকল দ্রুতগামী ছোট জাহাজ। ভেনিসের কমান্ডার কড়া নির্দেশ জারি করলেন যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো লুটপাট করা যাবে না, এর অন্যথা হলে ঝুলিয়ে দেয়া হবে ফাঁসিতে। কোনো ক্যাপ্টেন যদি লড়াই করতে গা ছাড়া ভাব দেখায় তাকেও দেয়া হবে মৃত্যুদণ্ড।

প্রথমদিন ব্যুহ সাজিয়ে মুখোমুখি থাকল দুই পক্ষ। তবে প্রথম চাল দিচ্ছিল না কেউই। এর মধ্যেই ফরাসি সাহায্য হিসেবে হাজির হলো চারটি জাহাজ। ২০ তারিখ গ্রিমানি দুটো রণতরী পাঠালেন উসমানীদের বাজিয়ে দেখতে, ফাঁদে পা দিয়ে আক্রমণে গেল না তারা। এদিকে তার নিষ্ক্রিয়তায় নিজের বহরের লোকজনই বিরক্ত হয়ে ওঠে।

২২ তারিখ খণ্ডযুদ্ধ হয়ে যায়। তবে মূল লড়াই সংঘটিত হয় তিনদিন পর। গ্রিমানির লোকেরা বেশ কয়েকটা উসমানী রণতরী দখল করে। শত্রুর ওপর চাপ অব্যাহত না রেখে ব্যস্ত হয়ে ওঠে লুটপাটে। পরিস্থিতি সামলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন গ্রিমানি। তখন পাল্টা হামলা চালিয়ে সবগুলো জাহাজ ফিরিয়ে নেয় উসমানীরা। ফরাসিরা এই ঘটনায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে কেটে পড়ে। রোডসে গিয়ে নোঙ্গর ফেলে তারা।

ইত্যবসরে ভেনিসের সবচেয়ে বড় দুই জাহাজ আন্দ্রিয়া লরেডান (Andrea Loredan) আর অ্যাল্বান ডি’আর্মারের (Alban d’Armer) অধীনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুরাক রেইসের অধীনস্থ উসমানিদের সবচেয়ে বড় রণতরীর ওপর। ধাক্কাধাক্কির চোটে তিনটি জাহাজই পাশাপাশি আটকে যায়, শুরু হয়ে যায় হাতাহাতি মারামারি। চার ঘন্টা লড়াই চলার পর বুরাক রেইসের জাহাজে লেগে যায় আগুন। অগ্নিশিখা সম্ভবত বারুদের ঘরে পৌঁছে যায়, কারণ এরপরেই বিকট বিস্ফোরণে ডুবে যায় তিনটি রণতরী। উসমানীদের ছোট জাহাজগুলো দ্রুত নিজের লোকদের তুলে নেয় পানি থেকে, আর শত্রুদের ঘায়েল করে ফেলে। এরপর দিনশেষে লড়াই জারি না রেখে পিঠটান দেন গ্রিমানি।

এই সংঘর্ষের পর গ্রিমানিকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়। ভেনিস থেকে নির্বাসিত হন তিনি। ওদিকে লেপান্তোর দ্বিতীয় যুদ্ধেও কামাল রেইসের হাতে শোচনীয়ভাবে হেরে যায় ভেনিস। চূড়ান্ত জয়ের পাল্লা হেলে পড়ে উসমানীদের দিকে।

References
This post was viewed: 43

আরো পড়ুন