Skip to main content

Ridge Bangla

এস-৪০০: পাক-ভারত সংঘর্ষে আলোচিত মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম

বর্তমানে যুদ্ধ কিংবা সশস্ত্র সংঘর্ষ হয় বহুমাত্রিক। অতীতে যেখানে প্রতিপক্ষের আক্রমণ কিংবা পাল্টা আক্রমণ সম্পর্কে আগেই ভালো ধারণা পাওয়া যেত, সেখানে বর্তমানে এত বেশি ফ্রন্টে যুদ্ধ হয়, যে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের আক্রমণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞানের তুমুল অগ্রগতির ছোঁয়া এসে লেগেছে সামরিক যন্ত্রপাতি কিংবা মারণাস্ত্রের ক্ষেত্রেও। রাষ্ট্র ও বিভিন্ন অস্ত্রনির্মাতা কোম্পানি বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে সামরিক উদ্ভাবনী খাতে, যার ফলে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রের উদ্ভাবন হয়েছে। আবার এসব অস্ত্র ও সরঞ্জামকে প্রতিহত করতেও বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে পাল্টা অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় কেউই পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে এসবের জন্য।

আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এক অনন্য নিদর্শন হচ্ছে ‘মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম’। অতীতে যখন উড়োজাহাজ আবিষ্কার হয়নি, তখন প্রতিপক্ষ নৌপথ ও স্থলপথে আক্রমণ করতো। কিন্তু বর্তমানে প্রতিটি রাষ্ট্রেরই রয়েছে নিজস্ব বিমানবাহিনী। বিমানবাহিনীর চৌকস পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধবিমান চালনায় অভিজ্ঞ করে তোলা হয়। আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো এতটাই শক্তিশালী যে শব্দেরও আগে এই বিমানগুলো ছুটে চলে, রাডারে অনেক ক্ষেত্রে এদের অস্তিত্বই নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না।

শত্রুর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে আবার নিরাপদে ফিরে আসতে পারে এই দ্রুতগতির বাহনগুলো এছাড়াও আকাশপথে আক্রমণের ক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে ড্রোন বা UAV (Unmanned Aerial Vehicle) মনুষ্যবিহীন উড়োযান নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আকাশপথে যু্দ্ধবিমান, ড্রোন বা ইউএভি (UAV) ইত্যাদি হুমকির বিরুদ্ধে যে জিনিসটি নিরাপত্তা প্রদান করে, তাকেই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম বলা হয়। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।

বর্তমান বিশ্বে ‘মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম’ এর মালিকানা রয়েছে বেশ কিছু দেশের। মূলত যে দেশগুলো সামরিক দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষস্থানে থাকে, সে দেশগুলোই এই অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি নিজেদের হাতে নিয়ে আসতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যেমন আমেরিকা ‘থাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা’ (THAAD)  তৈরি করেছে। ইসরায়েলের রয়েছে নিজস্ব মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ‘আয়রনডোম’। রাশিয়ার মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ‘এস-৪০০’ পুরো বিশ্বেই খ্যাতি অর্জন করেছে।

সম্প্রতি সামরিকখাতে অভাবনীয় উন্নয়ন করা চীন ‘এইচকিউ-৯’ সাড়া জাগিয়েছে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মাঝে। এছাড়া জার্মানি, ভারত ও ফ্রান্সও নিজস্ব মিসাইল সিস্টেম তৈরি করার জন্য বিনিয়োগ করেছিল এবং সীমিত পরিসরে সফলও হয়েছে। কিন্তু তাদের কোনোটাই রাশিয়ার এস-৪০০ কিংবা আমেরিকার থাড ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমের মতো সামর্থ্য অর্জন করতে পারেনি।

রাশিয়ার মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ‘এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ’ এর নির্মাতা হলো আলমাজ সেন্ট্রাল ডিজাইন ব্যুরো। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে রাশিয়া এস-৪০০ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম তৈরি করার কাজ শুরু করে। এর মূল তত্ত্বাবধানে ছিলেন ড. আলেক্সান্ডার লেমানস্কি। ১৯৯৩ সালে প্রথমবারের মতো মিসাইল সম্পর্কে ঘোষণা আসে রুশ সরকারের পক্ষ থেকে। এর ছয় বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো সফল পরীক্ষা চালানো হয়।

ধারণা করা হয়েছিল ২০০১ সাল থেকেই রুশ সেনাবাহিনী এই এই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করার অনুমোদন লাভ করবে। কিন্তু সবকিছু বিবেচনা করে সেসময় অনুমোদন দেয়া হয়নি। অবশেষে ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো রুশ সামরিক বাহিনী এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করে। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো চীন এই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম কেনার জন্য রাশিয়ার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। এরপর তুরস্ক, ভারত ও বেলারুশও এটি অর্জনের জন্য রাশিয়ার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়।

মিসাইল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলো মূলত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। এর দ্বারা প্রথমে আকাশপথে আসা কোনো মিসাইল, ড্রোন বা যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এরপর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটির গতিবিধি নির্ণয় করে সেই অনুযায়ী সিগন্যাল পাঠানো হয়। সিগন্যাল পাঠানোর পর সে অনুযায়ী মিসাইল নিক্ষেপ করে শত্রুপক্ষের হুমকি ধ্বংস করা হয়।

এস-৪০০ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৬০০ কিলোমিটার দূর থেকে প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমান, মিসাইল, ড্রোন কিংবা ইউএভির উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। মোটামুটি এস-৪০০ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের একটি ইউনিটের ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে ও ৩০ কিলোমিটার উচ্চতার মধ্যে আকাশপথে কোন হুমকি প্রবেশ করলে সেটি দক্ষতার সাথে নিষ্ক্রিয় করার সামর্থ্য রয়েছে এই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের।

প্রতিপক্ষের হুমকি নিষ্ক্রিয় করতে এস-৪০০ সিস্টেমে চার ধরনের মিসাইল ব্যবহার করা যায়। 48N6DM মিসাইলের পরিসীমা ২৫০ কিলোমিটার। 40N6 হচ্ছে আরেকটি মিসাইল, যার পরিসীমা ৪০০ কিলোমিটার। চারটি মিসাইলের মধ্যে এটির পরিসীমা সবচেয়ে বেশি। আর দুটি হলো 9M96E ও 9M96E2, যাদের পরিসীমা হলো ১২০ কিলোমিটার।

চারটি মিসাইলই কোন চলমান যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ইউএভিকে সফলভাবে আঘাত করে ভূপাতিত করতে সক্ষম। এছাড়া এটি একইসাথে ৮০টি হুমকি শনাক্ত করতে সক্ষম ও একসাথে ৩৬টি লক্ষ্যে হামলা চালাতে পারে। সাধারণ যুদ্ধবিমান তো বটেই, মার্কিন এফ সিরিজের দুর্দান্ত সব বিমানের জন্য হুমকি এই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম।

সাম্প্রতিক ভারত ও পাকিস্তানের যে সংঘর্ষ চলছে, তাতে ভারতের আকাশ সুরক্ষায় এস-৪০০ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে খবরে এসেছে। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে এস-৪০০ এর কল্যাণে অনেকগুলো ইউএভি, ড্রোন এবং মিসাইল নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে৷ ভারতের দাবি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে সামনের দিনগুলোতে এই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের চাহিদা আরও অনেক গুণ বেড়ে যাবে। ২০১৮ সালে ভারত ৩৫ হাজার কোটি রূপির বিনিময়ে রাশিয়ার সাথে এই অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি কিনতে চুক্তিবদ্ধ হয়।

তথ্যসূত্র:

১) S 400 Missile System

২) S-400 Triumf

This post was viewed: 34

আরো পড়ুন