Skip to main content

Ridge Bangla

প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়া যে কারণে হয়ে উঠেছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ এক শহর

আলেকজান্দ্রিয়া ছিল এক জ্ঞানের নগরী, যেখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, দার্শনিক ভাবনা আর সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটেছিল পাশাপাশি। গ্রিক, মিশরীয় ও ইহুদি সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই শহর একদিকে যেমন গড়ে তুলেছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার, তেমনি জন্ম দিয়েছিল গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা ও প্রকৌশলের পথিকৃৎদের। এখানে মানুষের চিন্তা আর কল্পনার কোনো সীমানা ছিল না। কোন কোন কারণে প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়া খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছিল, তা নিয়েই আজকের এই আলোচনা।

অ্যারিস্টটলের প্রভাব

জন্মলগ্ন থেকেই আলেকজান্দ্রিয়া ছিল কৌতূহল ও জ্ঞানচর্চার এক পরম আবাস। শহরের প্রথম শাসক অ্যারিস্টটলের ছাত্র টলেমি প্রথম, অ্যারিস্টটলের আদর্শে প্রভাবিত হয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক জ্ঞানের সাম্রাজ্য। অ্যারিস্টটল এথেন্সে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রন্থাগার ও জাদুঘরসমৃদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ‘লাইসিয়াম’, যা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বসূরি। এথেন্সের জ্যোতি ম্লান হয়ে এলে, আলেকজান্ডারের উত্তরসূরিরা আশ্রয় দিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ চিন্তকদের। বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার গড়ার লক্ষ্যে টলেমি শুরু করলেন বই ও নিদর্শন সংগ্রহের কাজ। অ্যারিস্টটলের যুক্তিনির্ভর, পর্যবেক্ষণভিত্তিক চিন্তাধারাই হয়ে উঠল টলেমীয় শাসনব্যবস্থার মূল দর্শন।

আলেকজান্দ্রিয়ার মহাগ্রন্থাগার

টলেমি প্রথম বিশ্ব জ্ঞানকে একত্র করার স্বপ্নে গড়ে তোলেন আলেকজান্দ্রিয়ার মহাগ্রন্থাগার। অ্যারিস্টটলের শিষ্য ডেমেট্রিয়াসকে দায়িত্ব দিয়ে শুরু হয় বই সংগ্রহের অভিযান। পাণ্ডুলিপি অনুলিপি করে আনতে রাষ্ট্রীয় খরচে পণ্ডিতদের পাঠানো হতো পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বন্দরে ঢোকা প্রতিটি জাহাজকেই তাদের বই জমা দিতে হতো। সেই বই নকল করার পর আসলটি ফেরত দেওয়া হতো। গ্রিক সাহিত্য ছাড়াও পাওয়া যেত ইরানি, মিশরীয় ও হিব্রু রচনার অনুবাদ। অনুমান করা হয়, এই গ্রন্থাগারের সংগ্রহে ছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ বই।

বৈচিত্র্য ও বাণিজ্যের শহর

আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাণশক্তি ছিল তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, যেখানে গ্রিক, মিশরীয়, ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর মিলনে গড়ে উঠেছিল এক জ্ঞাননির্ভর সমাজ। বিশাল বন্দরজুড়ে চলত শস্য ও বইয়ের বাণিজ্য। প্যাপিরাস উৎপাদনে এগিয়ে থাকা মিশর হয়ে উঠেছিল জ্ঞানের রপ্তানি কেন্দ্র। নানা জাতি-গোষ্ঠী ছুটে আসত এখানে; জ্ঞান, ব্যবসা আর ভবিষ্যতের সন্ধানে।

মিউজেয়ন: জ্ঞানের আশ্রম

টলেমিরা শুধু পাণ্ডুলিপি সংগ্রহে থেমে থাকেনি। তাঁরা চেয়েছিলেন জ্ঞানীদেরকে নিজেদের কাছাকাছি রাখতে। গ্রন্থাগারটি ছিল এক বিশাল বিদ্যাকেন্দ্রের অংশ। এর নাম ছিল মিউজেয়ন। অর্থাৎ, মিউজদের মন্দির। এখান থেকেই মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, সাহিত্য, নানান বিষয়ের পণ্ডিতেরা এখানে থাকতেন, রাজকোষ থেকে পেতেন বেতন। চিন্তার স্বাধীনতা ছিল স্বীকৃত, সুযোগ-সুবিধাও ছিল অসাধারণ। আলেকজান্দ্রিয়ায় যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের নামের তালিকা বিশাল।

চিকিৎসায় নবযুগ

টলেমির শাসনামলে প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যা পৌঁছেছিল উন্নতির শিখরে। গ্রিক চিকিৎসকেরা দার্শনিক তত্ত্বে দক্ষ হলেও শরীরবিজ্ঞানে পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু মিশরীয়রা মমি তৈরির কারণে শরীরের গঠন সম্পর্কে অনেক বেশি বাস্তব জ্ঞান অর্জন করেছিল। তবে মানবদেহ বোঝার প্রকৃত উপায় ছিল শবব্যবচ্ছেদ এবং  জীবন্ত শরীরের উপর ছুরি-কাঁচি চালানো। গ্রিক-রোমান সমাজে এটি ধর্মীয় কারণে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু টলেমিরা জ্ঞান অর্জনকে ধর্মের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন। ফলে কারাবন্দিদের উপর জীবন্ত ব্যবচ্ছেদের অনুমতি দেয়া হয়। নিষ্ঠুর হলেও এর মাধ্যমে চিকিৎসাবিদ্যায় বিপুল অগ্রগতি আসে। বিশেষ করে চিকিৎসাবিদ্যার দুই পথিকৃৎ হেরোফিলাস ও ইরাসিস্ত্রাটাস প্রথমবারের মতো মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড, রক্তসঞ্চালন ও চোখের স্নায়ু সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা দেন।

গণিত ও প্রকৌশলের জাদুকররা

আলেকজান্দ্রিয়ার মাটিতে গণিত শুধু পুথিগত বিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল বাস্তব জীবনের হাতিয়ার। ইউক্লিডের ‘ইলিমেন্টস’ গ্রন্থটি আজও গণিতের মেরুদণ্ড। আর আর্কিমিডিস শুধু প্লবতা নয়, যুদ্ধ আর প্রযুক্তিতে জ্ঞানের আলোর প্রদর্শন দেখিয়েছিলেন। দড়ি-চাকার ক্রেন, ঘড়ির আদিরূপ, এমনকি বাতিঘর নির্মাণেও ছিল তাঁদের অবদান।

সৌরজগতের মডেল

এই আলেকজান্দ্রিয়াতেই টলেমি পৃথিবীকেন্দ্রিক আকাশের নকশা এঁকে এমন একটি সৌরজগতের মডেল দাঁড় করিয়েছিলেন, যা কোপার্নিকাস আসার আগ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কিন্তু তারও আগে অ্যারিস্টার্কাস নামের এক দূরদর্শী বিজ্ঞানী সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্ব মডেলের কথা বলেছিলেন। টেলিস্কোপ না থাকলেও, অ্যাস্ট্রোল্যাব ও গোলীয় মডেল দিয়ে তারা-নক্ষত্র চিহ্নিত করতেন তৎকালের বিজ্ঞানীরা।

দর্শনের শেষ দীপ্তি

রোমান শাসনের শেষদিকে, গোটা পৃথিবী যখন ধর্মমুখী হয়ে উঠছে, আলেকজান্দ্রিয়া তখনও ছিল দর্শনের আলোয় আলোকিত। প্লেটো-পিথাগোরাসের ভাবধারায় জন্ম নেয় নিও-প্লাটোনিজম, যেখানে গণিত ছিল আধ্যাত্মিকতার সিঁড়ি। ৩য়-৫ম শতকে এই ধারণা ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এই দর্শনচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল আলেকজান্দ্রিয়া।

ধর্মতত্ত্বের উত্থান

পুরনো ধর্মবিশ্বাস ও নতুন খ্রিষ্টধর্মের মিলনভূমি হয়ে উঠেছিল আলেকজান্দ্রিয়া। মিশরের ধ্যানজ্ঞান ও আত্মনিবেদনের ধারা খ্রিষ্টধর্মকে গভীরতা দেয়। জন্ম নেয় সন্ন্যাসবাদের মহান পথিকৃৎ সেন্ট অ্যান্টনি ও সেন্ট পাচোমিয়াসের। তবে শহরের রাস্তায় যখন দার্শনিক ও সাধুরা বিতর্কে জড়াতেন, তখন তার পরিণতি সবসময় শুভ ছিল না। দর্শনের দীপ্তিমান রমণী হাইপেশিয়া একদল ধর্মান্ধের হাতে প্রাণ হারান। তবু এই বেদনার মধ্য দিয়েই উঠে আসে মহান খ্রিষ্টীয় চিন্তাবিদ, ওরিজেন ও সেন্ট ক্লেমেন্ট, যাঁরা দর্শন আর ধর্মকে মিলিয়ে গড়েছেন এক নতুন জ্ঞানের ধারা।

আলেকজান্দ্রিয়ার জ্ঞান কেন্দ্র ছিল এমন এক পরীক্ষাগার, যেখানে ধর্ম, বিজ্ঞান ও শিল্প একত্রে সহাবস্থান করেছিল অসম্ভব এক ভারসাম্যে। হেরো বা ইউক্লিডদের মতো চিন্তাবিদেরা ভবিষ্যতের সভ্যতার রূপরেখা তৈরি করে গেছেন এখানেই। এমনকি আধুনিক গবেষণা পদ্ধতির অনেক উপাদান, যেমন, সরকারপ্রধানদের পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণা সহযোগিতার পরিবেশ, মুক্তচিন্তার অনুমোদন, এসবের সূচনা ঘটে এই নগরীতেই।

তথ্যসূত্র:

1. Alexandria | History, Population, Map, & Facts – Britannica
2. Alexandria, Egypt – World History Encyclopedia
3. What Made Alexandria the Intellectual Capital of the Ancient World?
4. Alexandria: The City That Changed The World – History Hit
5. 10 Reasons Ancient Alexandria Was An Intellectual Powerhouse

This post was viewed: 44

আরো পড়ুন