Skip to main content

Ridge Bangla

দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা: বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তে বিমান বাহিনী

২০২৫ সালের ২১ জুলাই সোমবার দুপুরে উত্তরার নীল আকাশে যেন এক কালো মেঘ নেমে এসেছিল। আচমকা এক অদৃশ্য লেলিহান আগুনের শিখায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। এফ-৭বিজিআই, মাঝ আকাশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা বিধ্বস্ত হলো ঢাকার মাইলস্টোন কলেজ চত্বরে।

মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে, কোমলমতি শিশুদের আর্তচিৎকারে পুরো শহর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ৩২ জনের করুণ মৃত্যু আর ১৭১ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এটি শুধুই একটি দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। এটি বাংলাদেশের সামরিক অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা না থাকার ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি। যেখানে পুরনো যুদ্ধবিমানকে ওড়ানো হয় জনবহুল শহরের আকাশে, আর শিশুদের প্রাণ যায় দুর্নীতির বলি হয়ে।

বিশ্বে যখন পঞ্চম প্রজন্মের সুপারসনিক জেট নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এখনো চলছে অর্ধশতাব্দীর পুরনো প্রযুক্তির বিমান। এটা কি শুধুই বাজেট ঘাটতির ফল? না, এটি একটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ব্যর্থতা, লুটপাটের ফলাফল। যেখানে আধুনিকায়নের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, সেখানে নিরাপত্তা সংস্কার বা প্রশিক্ষণ বিমান আপডেটের কোনো অগ্রাধিকার নেই।

পরিশেষে, বিমান বাহিনীর ব্যর্থতায় প্রাণ গেল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম ও মাইলস্টোনের কোমলমতি শিশুদের।   চীনে নির্মিত এফ-৭ আসলে ১৯৬০-এর দশকের সোভিয়েত মিগ-২১-এর একটি সংস্করণ। যখন আধুনিক বিশ্বের বিমানবাহিনী পঞ্চম প্রজন্মের জেটে প্রশিক্ষণ চালায়, তখন বাংলাদেশে উড়ছে ‘উড়ন্ত কফিন’। ৪২ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও এই বিমানগুলি বদলানোর কোনো উদ্যোগ নেই, বরং চলছে দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয় ও অকার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে প্রতিটি দেশ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে। যুদ্ধবিমান, রাডার, সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত সামরিক ক্রয় হচ্ছে বিরাট পরিসরে। কিন্তু এসব কেনাকাটায় দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। বাংলাদেশেও সামরিক কেনাকাটায় রাজনীতির দাপট ও দুর্নীতির অভিযোগ বহু বছর ধরে তীব্র হয়েছে।

১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে রাডার কেনাকাটায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যদিও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর ২০১৭ সালে তাকে খালাস দেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যা পরবর্তীতে আদালতে খালাস পায়। এসব কেলেঙ্কারির মূল উৎস হিসেবে রাজনৈতিক প্রভাবকে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন।

ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, “রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া বড় ধরনের দুর্নীতি সম্ভব নয়। এক টাকার জিনিস দশ টাকায় কেনা হচ্ছে, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি আরও বলেন, সামরিক খাতের গোপনীয়তা দুর্নীতির সুযোগ বাড়িয়ে দেয়, তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় খুবই সীমিত। বিমান বাহিনীর হাতে ৪৪টি যুদ্ধবিমান রয়েছে, যার অধিকাংশই পুরনো মডেলের এফ-৭ এবং মিগ-২৯। প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত রুশ ইয়াক-১৩০ যুদ্ধবিমানও পুরনো প্রযুক্তির। আধুনিক স্টেলথ প্রযুক্তি ও উন্নত কমব্যাট সক্ষমতায় এগুলো অপ্রতিযোগিতামূলক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সময় এসেছে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় আধুনিকতা ও কার্যকারিতা বিবেচনায় নেয়া। মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর মনে করেন, “আমাদের এমন যুদ্ধবিমান কিনতে হবে যা অন্তত পঞ্চম প্রজন্মের নীচে না হয়।”

প্রতিবেশী দেশগুলো আধুনিক সামরিক উপকরণ কেনায় ব্যয় বাড়িয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে সামরিক বাজেট বৃদ্ধি সত্ত্বেও অস্ত্র আমদানির পরিমাণ একেবারেই অপ্রতুল। বাজেটের বড় অংশ খরচ হচ্ছে পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানায়, ২০১৮-২২ সালের মধ্যে অস্ত্র আমদানি প্রায় ৪৮ শতাংশ কমেছে। ‘গভর্নমেন্ট ডিফেন্স ইন্টেগ্রিটি ইনডেক্স ২০২০’ অনুসারে, বাংলাদেশসহ ৬২ শতাংশ দেশ প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ১০০ স্কেলের মাত্র ২৫ পেয়ে দুর্নীতির সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘ই’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, “বিভিন্ন দেশে সামরিক কেনাকাটায় কমিশন বাণিজ্য প্রচলিত হলেও বাংলাদেশে এসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়, যা সমস্যা সৃষ্টি করে।” তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে সাজানো এসব মামলা সামরিক আধুনিকায়নে বাধা হিসেবে কাজ করে, কারণ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ভয় পান। এ ধরনের সংস্কৃতি সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা।

এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন বলেন, “রাজনৈতিকীকরণ সামরিক দুর্নীতির মূল কারণ। বড় অংকের সামরিক কেনাকাটায় রাজনৈতিক চাপ এত প্রবল যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়।” তিনি জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি উল্লেখ করে বলেন, “শক্তিশালী ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে সেনা, বেসামরিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে সামরিক ক্রয়ের পরিকল্পনা করা উচিত। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।”

লেফটেন্যান্ট তৌকিরের আত্মত্যাগ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার প্রতি নীরব প্রতিবাদ। তার এই আত্মত্যাগ এখন নাগরিক সমাজ, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্যে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যায়। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে জননিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার আহ্বান উঠেছে, যেখানে দুর্নীতির নামে কেউ ক্ষমা পাবে না এবং মানুষের জীবন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হবে।

 

This post was viewed: 42

আরো পড়ুন