Skip to main content

Ridge Bangla

শিক্ষা খাতের দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড শিক্ষা সচিব জুবায়ের অপসারিত

দীর্ঘদিনের অভিযোগ আর বিতর্কের পর শিক্ষা খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম ও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগে বহুল আলোচিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জুবায়েরকে অবশেষে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার রাতে তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সাংবাদিকদের তার অপসারণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে রাত ৯টা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।

গত বছরের ১০ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দায়িত্ব পান জুবায়ের। শিক্ষামন্ত্রী ও উপদেষ্টা পরিবর্তন হলেও তিনি বহাল ছিলেন। বই ছাপার কাগজ কেনায় কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য, সরকারি কলেজে পদায়ন বাণিজ্য, শিক্ষা প্রকল্পে ঘুষ বাণিজ্য, আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের রক্ষায় ভূমিকা, শিক্ষা বোর্ডকে অবজ্ঞা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে ছিলেন তিনি।

তার বিরুদ্ধে আনীত গুরুতর অভিযোগগুলো নিয়েই সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন।

১) পরীক্ষা স্থগিত না করায় ক্ষোভ

সোমবার রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩১ জন নিহতের ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়। এ প্রেক্ষিতে মঙ্গলবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের সুপারিশ করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড। কিন্তু সিদ্দিক জুবায়ের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাতেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রাত ৩টার দিকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পরীক্ষার স্থগিতাদেশ আসে। তবুও ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পরদিন সচিবালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। ঘটনার পরই সরকারের শীর্ষ মহলে সিদ্দিক জুবায়েরকে নিয়ে ক্ষোভ চরমে পৌঁছায় এবং তার অপসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

২) শিক্ষা বোর্ডকে অকার্যকর করার অভিযোগ

শিক্ষা বোর্ড আইনে বোর্ডগুলোকেই পরীক্ষা স্থগিত ও পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া আছে। ১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্স ২০২১ সালে সংশোধনের পরও এ ক্ষমতা বহাল রয়েছে। করোনার সময় সেই আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে অটোপাস ও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল।

অথচ এবার বোর্ডের সুপারিশ মানা হয়নি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দকার এহসানুল কবির সাংবাদিকদের বলেন, “বিষয়টি মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। আমরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, বোর্ড মৌখিক সম্মতির জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জানালেও অনুমোদন মেলেনি।

৩) কাগজ কেনাকাটায় ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতি

বই ছাপার কাগজ কেনাকাটায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সিদ্দিক জুবায়েরের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তাদের চাপ দিয়ে নির্দিষ্ট কাগজকল থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য করেন তিনি। বহিষ্কৃত আওয়ামীপন্থি নেতা সালাউদ্দিন তানভীরের মাধ্যমে বড় অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করেন তিনি।

অভিযোগ ওঠার পর এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও সচিবকে সরিয়ে দেওয়া হলেও সিদ্দিক জুবায়ের বহাল থাকেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি তদন্ত করছে এবং ৩৬ জন প্রেস মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এনসিটিবির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সিদ্দিক জুবায়ের অফিস শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এনসিটিবিতে যেতেন, কিন্তু কোনো ফাইল না দেখে শুধুই মিটিং করতেন।

৪) বিতর্কিত পদায়ন বাণিজ্য

শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিদ্দিক জুবায়ের সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি পান এবং অবসরের পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফিরে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন তিনি। নিজ জেলা নারায়ণগঞ্জের লোকদের এনে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান। শিক্ষা প্রকৌশলে ২০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে হাবিবুর রহমানকে উপপরিচালক পদে বসান।

ছাত্রদল-শিবিরপন্থি কর্মকর্তাদের হেনস্তা করাসহ রাজনৈতিক পক্ষপাতও তার বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ। শিক্ষা প্রকল্পগুলোতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্মার্ট টিভির পরিবর্তে ইন্টারেক্টিভ প্যানেল কিনে অতিরিক্ত অর্থ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বরিশাল সিটি মেয়রের আস্থাভাজন এহতেসাম উল হককে মাউশির মহাপরিচালক করা হলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে আবারও তাকে ফিরিয়ে আনেন জুবায়ের।

৫) আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের রক্ষক

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শিক্ষাভবনে অনুষ্ঠিত মিছিলে আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান দেন। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে জুবায়ের তাতে বাধা দেন। মাউশির পরিচালক ৪০ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি কাউকেই। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, সিদ্দিক জুবায়ের সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে “ব্লান্ডার” করার চেষ্টা করেছিলেন। পরীক্ষা স্থগিত নিয়ে টালবাহানাও ছিল তার ষড়যন্ত্রের অংশ।

৬) বদলি সিন্ডিকেট ও বিতর্কিত কোটা

আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে বদলি সিন্ডিকেট চালাতেন সিদ্দিক জুবায়ের। সরকারি কলেজগুলোতে পদায়নের বিনিময়ে বড় অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হতো। বিতর্কিত জুলাই কোটা চালু করেন তিনিই, পরে সমালোচনার মুখে তা বাতিল হয়।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করা অধ্যাপক মালেকা আক্তারকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন করেন। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের বাসিন্দা জুবায়েরের শামীম ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও আওয়ামী পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তাকে এতদিন রক্ষা করেছিল বলে অভিযোগ আছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিগগিরই তার স্থলাভিষিক্ত নতুন সচিবের নাম ঘোষণা করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “শুধু পরীক্ষা স্থগিত নিয়ে নয়, গত ১০ মাসে তিনি যা করেছেন, তার সবই ছিল অনিয়মে ভরা। তার অপসারণ সরকারের জন্য স্বস্তির।”

This post was viewed: 40

আরো পড়ুন