বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কী নেই? প্রশ্নটা শুনে নিশ্চিত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছেন! খাওয়ারই কথা। অর্থ আছে, আভিজাত্য আছে, চাকচিক্য আর বিলাসিতার তালিকা করলে শেষ হবে না। নাম আছে, খ্যাতি আছে। ক্রিকেটাররা এখন কেবল তারকা নয়, মহাতারকা। ক্রিকেট দলের কম খ্যাতিমান খেলোয়াড়রটাও রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে লোকে তাকে ঘিরে ধরে। আপনিই এবার পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়তে পারেন, কী নেই তাহলে?
প্রশ্ন যেহেতু ছোঁড়া হয়েছে, উত্তরও তৈরি। সেই উত্তর আবার ঝাঁঝালো। বাংলাদেশ ক্রিকেটে আসল জিনিসটাই নেই। ‘পারফরম্যান্স।’ ‘সাফল্য।’ ‘জয়ের মানসিকতা।’ এবার বোধহয় দ্বিমত করার আগে ভাববেন! আসলেই তো! যে দলটাকে দেখলে এত আলোকিত মনে হয়, তাদের বাতির নিচে অন্ধকার।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কবিতা আছে না? ওই যে, ‘কেউ কথা রাখেনি।’ সেই কবিতার কয়েকটি লাইনের সঙ্গে বাংলার ক্রিকেটের দারুণ মিল।
“মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাব
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে!
নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো?
আমার মাথা এই ঘরের ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে
তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে?”
কবিতার লাইনগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ দলের মিল খুঁজছেন? যদি বাংলাদেশের ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখেন, তাহলে নিশ্চয়ই জানেন, আমরা মুখে মুখে বড় দল। অর্জনের খাতায় বিশাল শূন্য বাদ দিয়ে আমাদের সবই আছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোটামুটি ২৫ বছর পার হয়েছে বাংলাদেশের। শিক্ষানবিশকাল ধরলে আরও বেশি। কিন্তু, আমাদের শিক্ষা নেওয়া শেষই হয় না যেন। শিক্ষাটাও হচ্ছে যাচ্ছেতাই।
বাংলাদেশের মানুষের যত আবেগ, তার সিংহভাগ ওয়ানডে ক্রিকেটকে ঘিরে। টেস্টে আমরা পারি না, টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ার হিটিং নেই। ওয়ানডেটা ৫০ ওভারের হওয়ায় দেখেশুনে খেলা যায়। মাঝেমধ্যে জেতাও যায়। অথচ, সবচেয়ে প্রিয় ফরম্যাটে বাংলাদেশ দলের অবস্থান এখন ১০ নম্বর। সামনের ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। তারচেয়ে ভয়ানক কথা, ২০০৪ সালের পর এবারই প্রথম এতটা নিচে বাংলাদেশ! কালে কালে যেখানে এগিয়ে যাওয়ার কথা, তালে তালে সেখানে আমরা কেবল নামছিই। চোরাবালিতে যেমন তলিয়ে যায় আরকি।
ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়েছে। বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য সুবিধা তো আছেই। এ দেশে ক্রিকেটের মতো লাক্সারি এবং অল্পতে জনপ্রিয়তা অন্য কোনো সেক্টরে কেউ পায়নি। কিন্তু, ক্রিকেটাররা মামাবাড়ির সেই নাদের আলীর মতো। কথা রাখে না। রাখতে জানে না।
দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ দলের দৃশ্যমান উন্নতি নেই, উল্টো দিন দিন অবনতি ঘটছে। ক্রিকেট কাঠামো বলতে কিছু একটা থাকা দরকার। যা আছে, তার মান কতটা উন্নত, সেটি জাতীয় দলের পারফরম্যান্স দেখলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
সেদিনের পুঁচকে আফগানিস্তান এখন অস্ট্রেলিয়াকে চোখ রাঙায়। ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে তারা আছে সাত নম্বরে। একসঙ্গে একঝাঁক নক্ষত্র নিভে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। এরপর মুখ থুবড়ে পড়ে তারা। খোদ বাংলাদেশই তাদের সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নিত। খেলতে পারেনি সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তারা এখন র্যাঙ্কিংয়ের চারে! ঐতিহ্য আর আভিজাত্য হারিয়ে ধুঁকতে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আছে নবম অবস্থানে।
আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ–তিন দেশই ক্রিকেটীয় সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে। সব দিয়েও আমাদের কিছুই হচ্ছে না। সমস্যাটা কোথায়, সেটিই ভাবছেন?
গণ্ডগোলটা গোড়ায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) হচ্ছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। বছরখানেক আগেও এখানে বিজ্ঞাপনের বাজার ছিল রমরমা। সম্প্রচার স্বত্ব ছিল ঝাঁ চকচকে। খেলা মাঠে গড়ালে ফুলেফেঁপে উঠত বিসিবির কোষাগার। লোকমুখে প্রচলিত, বিসিবির কাছে ৯০০ কোটি টাকা আছে। সেটি যে বাড়িয়ে বা বানিয়ে বলা হয়েছে, ব্যাপারখানা এমন নয়। বর্তমান সভাপতি ফারুক আহমেদের নামের সঙ্গেই জড়িয়েছিল বোর্ডের প্রায় ২৫০ কোটি টাকার গড়মিলের বিতর্ক। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা ক’জন বিশ্বাস করেছে প্রশ্ন থেকে যায়।
সেখান থেকে ক’দিন আগে শেষ হওয়া জিম্বাবুয়ে সিরিজ আয়োজনের জন্য বিসিবি পায়নি কোনো চ্যানেল। যেতে হয়েছে বিটিভির কাছে। ভাবতে পারছেন? ক্রিকেটাররা পারফর্ম করতে না পারলেও চলবে। লোকে তাদের চেনে। বাজারে কদর আছে। মাঠে নিতেই হবে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। চলতি মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ। নতুনভাবে অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়েছে লিটন দাসকে। নাজমুল হোসেন শান্ত দলে আছেন ঠিকই, যদিও তার থাকার কথা নয়। প্রধান নির্বাচক জানান, অভিজ্ঞতার কারণে দলে আছেন শান্ত। সর্বশেষ ২৯ ইনিংসে যার ফিফটি মাত্র একটি, সর্বশেষ ১৮ ম্যাচে দেখেনইনি ফিফটির মুখ।
এভাবেই চলছে দেশের ক্রিকেট। যেভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে দিন দিন, কমছে দর্শক আগ্রহ, অচিরেই মানুষ পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অযত্নে, অবহেলায় কজনই বা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে গলা ফাটাবে? তবু প্রবোধ দেওয়া যেত, যদি তারা সত্যিই চেষ্টা করত ভালো করার! মিথ্যে আশ্বাসের ফাঁকা বুলির খেল লোকে ধেরে ফেলেছে। বিজ্ঞাপনের বাজারে তাই ভীষণ লোকসান।