Skip to main content

Ridge Bangla

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে নামার পেছনের গল্প

২০২২ সালে শারজায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। শেষ ওভারে নাসিম শাহের দুটি ছয়ে ফাইনালে পা রাখে পাকিস্তান। কিন্তু ম্যাচটি আলোচনায় আসে একটি ভিন্ন কারণে। ম্যাচ শেষে আফগানিস্তান দর্শকেরা পাকিস্তানের দর্শকদের সাথে মারামারিতে জড়িয়ে যায়। স্টেডিয়ামে তারা ‘আফগানিস্তান জিন্দাবাদ’ বলার সাথে সাথে পাকিস্তানিদের দিকে চেয়ার ছুঁড়ে মেরেছিলেন। হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানিরা আফগানদের ‘অকৃতজ্ঞ’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ ইত্যাদি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আফগান ও পাকিস্তান নাগরিকদের মধ্যে যে পরস্পরবিরোধী গভীর বিদ্বেষ রয়েছে, তা বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছিল এই ঘটনাটিতে।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে মিল রয়েছে অনেক দিক থেকে। একসময় দুটি দেশই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর দুটি দেশই বিভিন্ন বিশৃঙ্খলাময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। মার্কিন দখলদারিত্বের সময় লাখ লাখ আফগান শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল পাকিস্তান। এছাড়া দুটি দেশের সীমান্তবর্তী স্থানের অধিবাসীদের জাতিগত মিল রয়েছে। ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে প্রচুর মিল রয়েছে। কিন্তু এত মিলের পরও কিছু ঐতিহাসিক কারণ ও সাম্প্রতিক সময়ের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে নেমেছে।

১৮৯৩ সালে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত আলাদা করার জন্য ব্রিটিশরা যে সীমারেখা নির্ধারণ করেছিল, সেটিকে ‘ডুরান্ড লাইন’ বলা হয়। বলা হয়ে থাকে, তৎকালীন আফগান শাসক আমির আব্দুল্লাহ খানকে এই সীমারেখা মেনে নিতে বাধ্য করেছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিটি আফগান সরকার এই সীমারেখা মানতে নারাজ। তাদের মতে, ব্রিটিশরা আফগান জনগণের সমর্থন ছাড়াই এই সীমারেখা নির্ধারণ করেছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বালুচ ও পশতুন জাতিসত্ত্বার মানুষদের ঐক্য। এই সীমারেখার কারণে সীমান্তবর্তী পশতুনরা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেককে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যেতে হয়েছিল, অনেকের সহায়-সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল এই বিভাজনের ফলে। একটি বৃহৎ জাতিসত্ত্বার মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করার ব্যাপারটা সীমান্তের দুই পাশের কেউই মেনে নিতে পারেনি।

পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার জন্য পশতুন জাতীয়তাবাদ একটি বড় হুমকি। পাকিস্তান সবসময়ই চেয়েছে কাবুলে পাকিস্তানের স্বার্থের প্রতি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে– এরকম কোনো শাসককে ক্ষমতায় বসাতে। এজন্য আশির দশকে আফগানিস্তানে যখন ধর্মীয় কট্টরপন্থার উত্থান ঘটে, তখন পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। আফগানিস্তানের বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানের অনেকেই পাকিস্তানে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। পাকিস্তানের ধারণা ছিল- আফগানিস্তানে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ চাপা পড়ে গেলে তা পাকিস্তানের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখবে। মার্কিন দখলদারিত্বের সময় পাকিস্তানের এই কৌশল কাজে দিলেও বর্তমানে তা পাকিস্তানের কপালে ভাঁজ ফেলে দিচ্ছে।

মার্কিন দখলদারিত্বের হাত থেকে আফগানিস্তান মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির সাথে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছিল। কিন্তু এগুলো বেশ দুর্বল প্রকৃতির হওয়ায় কার্যকর ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি। উল্টো টিটিপি পশতুনদের জাতিগত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদের দিকে ধাবিত করেছে।

টিটিপি মূলত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে পাকিস্তান ও আফঘানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে। পাকিস্তান যখন দমন করার জন্য তাদের উপর অপারেশন চালায়, তখন তারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তান টিটিপির কার্যক্রম যেন বিস্তার লাভ না করতে পারে, সেজন্য আফগানিস্তানকে অনুরোধ করলেও তাদের দিক থেকে তেমন ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, কাবুল মূলত ভারতের পরামর্শ পাকিস্তানের সীমান্তে গোলযোগ সৃষ্টি করতে টিটিপি ও অন্যান্য সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, সহায়তা প্রদান করছে।

গত বছরের জুলাই মাসে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন- সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তান তার প্রতিবেশী আফগানিস্তানে সামরিক অপারেশন চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দেন। মার্কিনিরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার সময় প্রচুর উন্নত অস্ত্রশস্ত্র রেখে যায়, যেগুলো এই সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর হাতে আসে। বর্তমানে এদের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হতাহতের ঘটনাও বেশি হচ্ছে মূলত এই কারণে। ইসলামাবাদের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের মধ্যে গত বছর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বেশি সদস্য নিহত হয়েছে সন্ত্রাসবাদ দমন করতে গিয়ে। ৯৫০ জন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সদস্যের মৃত্যুর বিপরীতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্য মারা গিয়েছে ৫২৭ জন। এছাড়া ৪৮৯ জন বেসামরিক নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছে।

তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর দেশটির ধসেপড়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার ছিল। পাকিস্তানের অর্থনীতির বেহাল দশার কারণে তার পক্ষে সেদিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না। এই সুযোগ নেয় ভারত। আফগানিস্তানে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে তারা। এর ফলে দুটি দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন হয়, যেটি ইসলামাবাদ মোটেও ভালো চোখে দেখেনি। মার্কিনিদের প্রস্থানের পর পাকিস্তানের যে প্রত্যাশা ছিল আফগানিস্তানের প্রতি, তা পূরণ তো হয়ইনি, বরং বিভিন্ন কারণে আরও নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। সীমান্ত সমস্যা, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ দমনে মতানৈক্য ও ভারতের সাথে আফগানিস্তানের ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা দেশ দুটির সম্পর্ককে তলানিতে নামাচ্ছে।

তথ্যসূত্র:

১) Pakistan-Afghan Taliban relations face mounting challenges

২) Pakistan-Afghanistan Relations Deteriorate Further

৩) Once firm friends, Afghanistan and Pakistan are now at each other’s throats. Here’s why

This post was viewed: 54

আরো পড়ুন