পরাশক্তি হিসেবে অবস্থান সুসংহত করার জন্য ভূরাজনৈতিক দিক থেকে অনেক কৌশলের প্রয়োজন হয়। চীন এদিক থেকে পিছিয়ে নেই। সমুদ্রে আধিপত্য ধরে রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের অন্যতম আলোচিত একটি কৌশল হলো ‘স্ট্রিং অব পার্লস’।
এটি মূলত একটি ভূ-রাজনৈতিক ধারণা, যা দিয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের কৌশলগত বন্দর ও সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি নেটওয়ার্ককে বোঝানো হয়। সহজ কথায়, এটি হলো ভারত মহাসাগরকে ঘিরে চীনের এমন কিছু কৌশলগত অবস্থান, যা দেখতে অনেকটা মুক্তোর মালার মতো। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং তার বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
‘স্ট্রিং অব পার্লস’ এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের গদর বন্দর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর, জিবুতিতে অবস্থিত চীনের নৌ ঘাঁটি, মিয়ানমারের কোকপ্যু বন্দর মূল ভূমিকা পালন পালন করছে।
পাকিস্তানের গদর বন্দর চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অংশ এবং এর মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরটি শ্রীলঙ্কা চীনের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়ে নির্মাণ করেছিল। কিন্তু ঋণ শোধ করতে না পারায় শ্রীলঙ্কা ৯৯ বছরের জন্য বন্দরটি চীনকে ইজারা দিতে বাধ্য হয়। আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে অবস্থিত নৌ-ঘাঁটিটি হলো চীনের প্রথম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি। লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে এর কৌশলগত অবস্থান চীনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও পায়রা সমুদ্র বন্দরে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ এবং প্রভাব ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
মিয়ামারের কোকপ্যু বন্দর চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর অংশ এবং এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চীন তাদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এই বন্দরগুলো শুধু বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে না, প্রয়োজনে এগুলো সামরিক কাজেও লাগানো যায়। এই দিকটি ভারতের নৌ-নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। চীন বার বার দাবি করে যে এই প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তাদের এই দাবি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে ভারতের ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে।
ভারতের জন্য চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল বেশ কয়েকটি কারণে বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই কৌশল ভারতকে ভৌগোলিকভাবে ঘিরে ফেলার একটি প্রচেষ্টা বলে মনে করে ভারত।
পাকিস্তানের গদর বন্দর থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পায়রা বন্দর এবং মিয়ানমারের কোকপ্যু পর্যন্ত চীনের উপস্থিতি ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব– উভয় উপকূলের জন্যই সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতের সিংহভাগ বাণিজ্য সমুদ্রপথ দিয়ে পরিচালিত হয়, যার একটি বড় অংশ ভারত মহাসাগর দিয়ে যায়। চীনের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি ভারতের বাণিজ্য পথের নিরাপত্তাকে রীতিমতো প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। আবার চীনের সিংহভাগ তেল এবং অন্যান্য পণ্য মালাক্কা প্রণালী দিয়ে চীনে প্রবেশ করে। এই প্রণালী ভারতের কাছাকাছি হওয়ায় এটি চীনের জন্য একটি বড় দুর্বলতা।
‘স্ট্রিং অব পার্লস’ মূলত কৌশল এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি চেষ্টা, যাতে বিকল্প পথ বা সামরিক রসদ সরবরাহের পথ তৈরি করা যায়। এর ফলে, মালাক্কা প্রণালীতে কোনো সংকট দেখা দিলেও স্ট্রিং অব পার্লসের কারণে চীনের বাণিজ্য বা সামরিক সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে না।
তবে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল মোকাবেলায় ভারতও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ভারতও তার নিজস্ব কৌশলগত উদ্যোগ এবং জোট গঠনের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে কৌশলগত বন্দর উন্নয়নে নতুন করে মনোনিবেশ করেছে। এর মধ্যে ইরানের চাবাহার বন্দর একটি অন্যতম উদাহরণ। এই বন্দর ভারতকে পাকিস্তানের গদর বন্দরের প্রভাব এড়াতে এবং আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করবে। ভারতীয় নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার উপস্থিতি জোরদার করছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া, নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়া
ভারত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটের মাধ্যমে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো কোয়াড (QUAD), বা চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপ। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া এই চারটি দেশ নিয়ে গঠিত কোয়াড ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি উন্মুক্ত ও অবাধ পরিবেশ বজায় জন্য সবগুলোর দেশের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করছে, যার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে আমেরিকা।
চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল এবং এর মোকাবিলায় ভারত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে জটিল করে তুলেছে। এটি এখন একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই হিসেবে পরিণত হয়েছে দুই শক্তিশালী দেশের মধ্যে।
ভারত তার কৌশলগত অবস্থান, ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে চীনের এই কৌশলকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যের লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে উভয় দেশই নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এই প্রতিযোগিতার ফলাফলই নির্ধারণ করবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক চিত্র।
তথ্যসূত্র:
১) China’s String of Pearls Policy: Implications for India
২) China’s String of Pearls Strategy
৩) China’s Strategy of ‘String of Pearls’ and South Asia