Skip to main content

Ridge Bangla

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ: ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক প্রতিরোধের ইতিহাস

ইংরেজদের দুইশো বছরের শাসনে বেশ কয়েকবার উপমহাদেশের স্থানীয় মানুষজন কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত তারা ব্রিটিশদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হননি, তারপরও এসবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

ঔপনিবেশিক ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সংঘটিত এই বিদ্রোহ কেবল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথমদিকে সংঘটিত বড় আকারের প্রতিরোধই ছিল না, এটি ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক অসাম্প্রদায়িক লড়াইয়ের গল্প।

ইতিহাসের পাতায় এটি স্রেফ একটি বিদ্রোহ হিসেবে স্থান পেলেও এর ইতিহাস স্বাধীনতার আগপর্যন্ত পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অনুপ্রেরণা সঞ্চারী ঘটনা হিসেবে স্থান পেয়েছে।

ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে বেশ আগে পা রাখলেও পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে বাংলায় ইংরেজ শাসনের দৃঢ় ভিত্তি রচিত হয়। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর বাংলার অর্থনীতি রীতিমতো পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। অনাহার, দুর্ভিক্ষ আর ব্রিটিশদের কঠোর ভূমিরাজস্ব নীতি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে।

এই পরিস্থিতিতে মজনু শাহ এবং সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, এবং পরবর্তীতে মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহের মতো মানুষেরা সাধারণ কৃষক, তাঁতি, কারিগর, এমনকি ছোটখাট জমিদারদের একত্রিত করে এক বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সে সময়ের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অসংখ্য মানুষ তাদের ডাকে সাড়া দেয়।

একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত মুসলিম সুফি ফকির এবং হিন্দু নাগা সন্ন্যাসীরা। এটি বিদ্রোহের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি। ধর্ম আলাদা হলেও অত্যাচারী ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তাদের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন।

মজনু শাহ ছিলেন একজন প্রভাবশালী সুফি সাধক। তার অসংখ্য অনুসারী ছিল। অন্যদিকে, ভবানী পাঠক ছিলেন এক তেজস্বী সন্ন্যাসী নেতা, যার নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ন্যাসী ইংরেজদের ত্রাসের কারণ হয়েছিলেন। দেবী চৌধুরানী ছিলেন কিংবদন্তী নারী নেত্রী, সন্ন্যাসীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। তাঁর বীরত্ব পরবর্তীতে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।

এই নেতারা নিজ নিজ অনুসারীদের একত্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজদের খাজনা আদায়কারী কাচারি, শস্যের গুদাম এবং ব্রিটিশ বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাতেন।

তাদের মূল কৌশল ছিল গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করা। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যেত। এই কৌশলে ইংরেজ বাহিনী স্বাভাবিকভাবেই তাদের মোকাবেলা করতে হিমশিম খেত। তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন জেলা, বিশেষত রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, জলপাইগুড়ি এবং মুর্শিদাবাদে এই বিদ্রোহের ঢেউ আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করতে সমর্থ হন।

এই বিদ্রোহের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বরাবরই ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ (Divide and Rule) নীতি অবলম্বন করেছিল। কিন্তু ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ তাদের সেই নীতিকে শক্তভাবে আঘাত করে।

একদিকে মুসলিম সুফি ও ফকিররা তাদের ধর্মীয় উদারতার জন্য পরিচিত ছিলেন, তেমনি সন্ন্যাসীরাও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি সহনশীলতার পরিচয় দিতেন। শোষিত মানুষেরা তাদের ধর্ম-পরিচয় ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। এই বিদ্রোহ প্রমাণ করেছিল যে, ধর্মের দিক থেকে আলাদা হলেও অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে একসাথে প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালনা করা যায়।

ব্রিটিশরা ছিল সুসংগঠিত এবং আধুনিক সামরিক শক্তি। তাই প্রত্যাশিতভাবেই তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তারা ধীরে ধীরে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং বিদ্রোহ দমনের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৭৮৬ সালে মজনু শাহের মৃত্যু এবং পরবর্তীতে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর পতনের পর বিদ্রোহের তীব্রতা কমতে শুরু করে। ১৮০০ সালের মধ্যে এই বিদ্রোহ প্রায় সম্পূর্ণভাবে দমন করা হয়।

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও, এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এটি ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম গণপ্রতিরোধের ইতিহাস হিসেবে ভারতবর্ষের মানুষের মনে স্বাধীনতার পথে আশার সঞ্চার করেছিল। এই বিদ্রোহ পরবর্তীকালে সংঘটিত বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহ, এমনকি সিপাহী বিদ্রোহেরও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

এটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিল যে- অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। এটি কেবল একটা ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল প্রেরণাদায়ী ইতিহাসের সূচনা। এই বিদ্রোহের নায়কেরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবসময়ই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অত্যাচারীকে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিভাজন যে গৌণ হয়ে পড়ে, তা এই ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র:

১) ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভিত নাড়িয়ে দেয়া এক আন্দোলন

২) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ)

৩) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও ব্যর্থতার কারণ

This post was viewed: 42

আরো পড়ুন