Ridge Bangla

বিলুপ্তপ্রায় ভোঁদর সংরক্ষণে নীরব বিপ্লব নড়াইলে, টিকে আছে শত বছরের ঐতিহ্য

বাংলাদেশের জলাশয়, নদী ও বিলের বাসিন্দা এক আশ্চর্য প্রাণী ভোঁদর। দেখতে অনেকটা বিড়ালের মতো হলেও এটি আসলে এক ধরনের প্রভুভক্ত জলজ স্তন্যপায়ী, যাদের প্রধান খাদ্য মাছ। একসময় দেশের প্রায় সব নদ-নদী ও খাল-বিলে এই প্রাণীর দেখা মিলত। কিন্তু আজ তা দুষ্প্রাপ্য। জলাশয়ের গতিপথ পরিবর্তন, বনজঙ্গল ধ্বংস, নদীর তীর দখল, দূষণ ও কারেন্ট জালের শিকার হয়ে ভোঁদরের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে এসেছে। অথচ এই প্রাণীই শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখে নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে জেলেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভোঁদর সাধারণত নদী, বিল, খাল কিংবা জলাশয়ের পাশের ঝোপঝাড়ে বসবাস করে। মাছের পাশাপাশি ছোট কাঁকড়া, ঝিনুক ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও এদের প্রিয় খাদ্য। কিন্তু নদীর নাব্যতা হারানো, বন উজাড় এবং নদীর পাড়ে বসতি গড়ে ওঠায় ভোঁদরের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে প্রাণীটিকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণেও ভোঁদর ঝুঁকিতে। অনেকেই মনে করেন, ভোঁদর পুকুরের মাছ খেয়ে ফেলে, তাই সুযোগ পেলে প্রাণীটিকে মেরে ফেলেন। অপরদিকে চামড়ার ব্যবসার জন্য গোপন চক্রগুলো ভোঁদর ধরার নোংরা বাণিজ্যে লিপ্ত। এসব কারণেই আজ বিলুপ্তির পথে বাংলাদেশের ভোঁদর।

তবে এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায় নড়াইলের চিত্রা নদী পাড়ের গ্রামগুলোতে। এখানকার জেলেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভোঁদর পুষে মাছ ধরেন। এটি কেবল জীবিকার উপায় নয়, বরং এক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। ভোঁদর পালন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মাছ শিকারে ব্যবহার করার এই অনন্য পদ্ধতি প্রায় দুই শত বছরের পুরনো।

নড়াইল, খুলনা ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় Lutra perspicillata নামের একটি প্রজাতির ভোঁদর মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রভুভক্ত ও বুদ্ধিমান এই প্রাণীগুলোকে জেলেরা ছোটবেলা থেকে প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভোঁদর কখনও জালের মাছ খায় না; বরং মাছের ঝাঁককে তাড়িয়ে জালের দিকে নিয়ে আসে। এই কাজের সময় তিনটি ভোঁদর একসঙ্গে অংশ নেয়—দুটি প্রাপ্তবয়স্ক ও একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক।

বয়স্ক ভোঁদর দুটিকে দড়ি দিয়ে নৌকার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়, আর তরুণ ভোঁদরটি মুক্ত থাকে। তিনটি ভোঁদর মিলে পানিতে এক ত্রিভুজাকার এলাকা তৈরি করে, যার ভেতরে থাকা মাছেরা জালের দিকে যায়। একসময় মাছ ধরার পর ভোঁদরদের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ছোট মাছ। এভাবেই তারা মানুষ ও জালের প্রতি অনুগত হয়ে ওঠে।

নড়াইলের অনেক জেলে পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে ভোঁদরকে দেখে। শিশু বয়স থেকেই ভোঁদরের যত্ন নেয় পরিবারের সবাই। ভোঁদরের খাবার, চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ সবকিছুই চলে একান্ত যত্নে। তবে সময় বদলেছে, নদীতে মাছ কমেছে, জীবিকা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক জেলে পেশা বদলে অন্য কাজে চলে গেছেন। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে অনেক পরিবার আর ভোঁদর পালতে পারছেন না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় ভোঁদর বিক্রি করে দিচ্ছেন। পাচারকারী চক্রগুলোর নজরও এখন এসব জেলেপাড়ায়।

অন্যদিকে সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যুদের উৎপাত ও মাছ কমে যাওয়ায় জেলেদের পেশা হুমকিতে, আর সেই সঙ্গে বিলুপ্তির মুখে এই প্রাণীগুলিও। একটি পূর্ণবয়স্ক ভোঁদর সাধারণত ৩ থেকে ৪ কেজি ওজনের হয় এবং গড়ে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। স্ত্রী ভোঁদর বছরে একবার তিন থেকে চারটি শাবক প্রসব করে। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস ও খাদ্যের অভাবে তাদের বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে এই প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব এখন টিকে আছে মূলত নড়াইল ও সুন্দরবনের কিছু এলাকায়।

২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন’ পাস করে, যাতে বলা হয়, এই আইন কার্যকর হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে যাদের কাছে কোনো বন্য প্রাণী রয়েছে, তাদের অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে গ্রামের জেলেরা এই আইন সম্পর্কে অবগত নন। ফলে দেশের কোথায় কত ভোঁদর আছে, তার সঠিক রেকর্ডও নেই। আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই, আর সচেতনতার অভাবে ভোঁদরের সংরক্ষণ কার্যত থমকে আছে। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই প্রাণী নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ, সাজেদা বেগম ও মোহাম্মদ কামরুল হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভোঁদর ব্যবহার করে মাছ ধরা জেলেরা আসলে এই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর সংরক্ষণে নীরবে ভূমিকা রাখছেন। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রশিক্ষিত ভোঁদর বন্য পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। অর্থাৎ, যদি কৃত্রিমভাবে প্রজননকৃত কিছু ভোঁদরকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া যায়, তাহলে একদিকে ‘ইন-সিটু সংরক্ষণ’ (প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষণ), অন্যদিকে ‘এক্স-সিটু সংরক্ষণ’ (বন্য পরিবেশের বাইরে সংরক্ষণ) দুই পদ্ধতিই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

একসময় চিত্রা নদী ছিল নড়াইলের প্রাণ। এই নদীর দুই তীর সাজানো ছিল সবুজে, ফুলে আর গাছে। সেই সৌন্দর্যের কারণেই নদীর নাম হয়েছিল ‘চিত্রা’। কিন্তু আজ সেই নদী দূষণ, দখল আর স্থাপনা নির্মাণে হারিয়েছে তার স্রোতধারা ও নাব্যতা। ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ সিনেমার দৃশ্যগুলো এখন ইতিহাস। তবু সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছেন এই নদীর পাড়ের ভোঁদর জেলেরা। তারা এখনও প্রতিদিন সকালে নদীতে নামেন ভোঁদর নিয়ে, পুরনো দিনের ঐতিহ্য জিইয়ে রাখেন প্রাণান্ত পরিশ্রমে। হয়তো মাছ আগের মতো ধরা পড়ে না, কিন্তু তাদের এই অনন্য পদ্ধতি আজও বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত নিদর্শন।

প্রাণী-বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে যদি ভোঁদর সংরক্ষণ ও জেলেদের প্রশিক্ষণ প্রকল্প নেওয়া যায়, তাহলে একদিকে টিকে যাবে এই ঐতিহ্য, অন্যদিকে সংরক্ষিত থাকবে এক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি। কারণ, ভোঁদর শুধুমাত্র একটি প্রাণী নয়, এটি বাংলাদেশের নদীনির্ভর জীবনের প্রতীক, আমাদের সংস্কৃতির অংশ।

This post was viewed: 63

আরো পড়ুন