Skip to main content

Ridge Bangla

২০২৫: বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক বছর

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে ২০২৫ সালটি কেবল একটি পঞ্জিকা বর্ষ নয়, বরং এটি একটি ‘ঐতিহাসিক’ বছর হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বিচার বিভাগ যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজে পেয়েছে, তার ভিত্তি রচিত হয়েছে এই বছরেই।

২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সাহসী পদক্ষেপগুলো ২০২৫ সালে এসে আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিবর্তন কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিচার বিভাগের প্রতি হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার এক মহত্তম প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

​২০২৫ সালটি কেন ‘ঐতিহাসিক’? এর উত্তর নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের বিচারিক ব্যবস্থার বিবর্তনের মধ্যে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কথা বলা হলেও বাস্তব অর্থে বিচার বিভাগ দীর্ঘদিন ছিল নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ। ২০০৭ সালের মাসদার হোসেন মামলার রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে সেই অসম্পূর্ণ কাজগুলো পূর্ণতা পেতে শুরু করেছে। এ বছর কেবল লোক দেখানো সংস্কার নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি এবং শৃঙ্খলার বিষয়টি নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বিচার বিভাগের এই ‘মুক্তিশপথ’ ২০২৫ সালকে বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবে।

​রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষে গঠিত ‘বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন’ ২০২৫ সালে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশমালা পেশ করে, যা বিচারিক ইতিহাসে এক মাইলফলক। সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিচার ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছে। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই উচ্চ ও নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা, ই-জুডিশিয়ারি এবং বিচারিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কমিশনের বৌদ্ধিক পরামর্শগুলো ২০২৫ সালের এই ঐতিহাসিক যাত্রার রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করেছে।

​সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ: মেধার জয়গান

​বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় রাজনৈতিক দলকানা বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। ২০২৫ সালে জারি করা ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এই দীর্ঘস্থায়ী অচলায়তন ভেঙে দিয়েছে। এই অধ্যাদেশের মূল প্রেক্ষাপট হলো উচ্চ আদালতে স্বচ্ছতা, মেধা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে বিচারক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইন পেশায় অভিজ্ঞতার বছর এবং সততার এক সুনিশ্চিত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।

​এই অধ্যাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। এর ফলে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিটি বা জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যারা কেবল মেধা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করবে। এটি উচ্চ বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রথম পদক্ষেপ। বিচারপ্রার্থীদের আস্থার জায়গা সুদৃঢ় করতে এবং সংবিধানের ৯৫(২) অনুচ্ছেদের প্রকৃত চেতনা রক্ষায় এই অধ্যাদেশটি ২০২৫ সালের বিচারিক বিপ্লবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপকরণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

​বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়: স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি

​বাংলাদেশের বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল নিজস্ব সচিবালয়। ২০২৫ সালে এই সচিবালয় স্থাপন বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছে। এতদিন বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, বাজেট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো, যা পরোক্ষভাবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত।

এখন থেকে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে নিজস্ব সচিবালয় বিচারকদের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করবে। এর ফলে নির্বাহী বিভাগের কোনো আমলা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর বিচারিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ফান্ডের অনুমোদন বা প্রশাসনিক নির্দেশের জন্য আর সচিবালয়ে ফাইল চালাচালি করতে হবে না, ফলে সময় বাঁচবে। ​এছাড়া বিচারকদের বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ হবে, যা তাদের নির্ভীকভাবে রায় প্রদানের সাহস যোগাবে।

ফৌজদারি ​কার্যবিধি সংশোধন: মামলাজট ও দীর্ঘসূত্রিতা নিরসন

​বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বর্তমান মামলাজট প্রায় ৪০ লক্ষাধিক। এই জট কমাতে এবং বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে ২০২৫ সালে ‘ফৌজদারি কার্যবিধি’ এবং ‘দেওয়ানি কার্যবিধি’-তে যুগান্তকারী কিছু সংস্কার আনা হয়েছে। ​ফৌজদারি কার্যবিধিতে তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তদন্তের ক্ষেত্রে সময় এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। বছরের পর বছর ধরে মামলা ঝুলে থাকার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ​এছাড়া বিনাবিচারে বছরের পর বছর জেল খাটা বন্ধ করতে জামিন যোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অটোমেটিক বেইল বা বিশেষ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করানোর ক্ষেত্রেও এখন বাধ্যতামূলক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

দেওয়ানি কার্যবিধি (CPC) সংস্কার

আমাদের দেশে ভুয়া মোকদ্দমার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা একটি বহুল-চর্চিত সমস্যা। দেওয়ানি কার্যবিধিতে বিধান রাখা হয়েছে যেন এটার বিরুদ্ধে আদালত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আগে অতি নগণ্য জরিমানার বিধান থাকলেও বর্তমানে এটি বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। বিনা কারণে সময়ের আবেদন করার জন্য মোকদ্দমায় দীর্ঘসূত্রিতা একটি দীর্ঘকালীন সমস্যা ছিল। বর্তমানে এটার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা বেধে দেয়া হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার করে ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সমন জারির আইনি বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। ফলে মান্ধাতা আমলের ডাকযোগে সমন প্রদানের বিধানের পরিবর্তে আধুনিকায়ন করা হলো।

​গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ: মানবাধিকারের নতুন সুরক্ষা

​বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে ‘গুম’ ছিল এক বিভীষিকার নাম। ২০২৫ সালে গুম হতে সকল ব্যক্তির সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদের আলোকে যে বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা মানবাধিকার রক্ষায় এক অনন্য অর্জন। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘গুম’ শব্দটিকে সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এটি একটি জামিনঅযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র এই নিশ্চয়তা দিয়েছে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো নাগরিককে আর কখনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা অন্য কেউ নিখোঁজ করতে পারবে না।

​আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল (ICT) আইনের সংস্কার

​২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার সুচারুভাবে করতে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩’-এর ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে ২০২৫ সালে। ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা হয়েছে যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। বিবাদী পক্ষের অধিকার রক্ষা, বিদেশী আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ এবং বিচারিক কার্যক্রম অডিও-ভিজুয়াল পদ্ধতিতে রেকর্ড করার আইনি সংস্থান রাখা হয়েছে। ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে যাতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটানো অপরাধও এর আওতায় আসে।

২০২৫ সাল কেবল সংস্কারের বছর নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনেরও বছর। সাধারণ মানুষের মাঝে এই বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে, আদালতে গেলে কেবল ‘তারিখ’ নয়, ‘বিচার’ পাওয়া যায়। বিচার বিভাগ সচিবালয় পৃথক হওয়া, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ আইন প্রণয়ন, গুম বিরোধী কঠোর অধ্যাদেশ এবং কার্যবিধি পরিবর্তনের এই সমন্বিত ফল আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০২৫ সালের এই ঐতিহাসিক সংস্কারগুলো যদি সঠিক বাস্তবায়নের পথে থাকে, তবে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিচারিক ব্যবস্থার দেশ, যেখানে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও প্রতিফলিত হবে।

This post was viewed: 26

আরো পড়ুন