Ridge Bangla

শাহেদ-১৩৬: আধুনিক যুদ্ধে ইরানের তৈরি নীরব ঘাতক যে আত্মঘাতী ড্রোন

​আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির জয়গান এখন আর শুধু ব্যয়বহুল স্টিলথ ফাইটার বা বিশাল সাবমেরিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে সামরিক কৌশলের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে ছোট, সস্তা এবং আত্মঘাতী ড্রোন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ-১৩৬’ (Shahed-136)। সম্প্রতি ইসরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা আক্রমণ এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে এই ড্রোনটি এখন সমরবিদদের গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​নির্মাণ ও গবেষণার ইতিহাস

​শাহেদ-১৩৬-এর শেকড় প্রোথিত ইরানের কয়েক দশকের ড্রোন গবেষণার ভেতরে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া ইরান তাদের বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে ব্যর্থ হয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে। ১৯৮০-র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ইরান প্রথম ড্রোন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ’ এই গবেষণার নেতৃত্ব দেয়। ​শাহেদ-১৩৬ মূলত শাহেদ-১৩১ ড্রোনের একটি উন্নত ও বড় সংস্করণ। ধারণা করা হয়, ২০২০ সালের দিকে এটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে, যদিও এর উন্নয়ন কাজ অনেক আগে থেকেই চলছিল। ইরান তাদের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে এমন একটি অস্ত্র তৈরি করতে চেয়েছিল যা রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে পারবে এবং যার উৎপাদন খরচ হবে অবিশ্বাস্যরকম কম।

​নকশা ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

​শাহেদ-১৩৬ একটি ‘লয়টারিং মিউনিশন’ (Loitering Munition), যাকে সাধারণ ভাষায় ‘কামিকাজে’ বা ‘আত্মঘাতী ড্রোন’ বলা হয়। এর ডেল্টা-উইং (Delta-wing) বা ত্রিভুজাকৃতির নকশা একে অনন্য করে তুলেছে। ড্রোনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১.৫ ফুট এবং ওজন প্রায় ২০০ কেজি। এটি ৩০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক বহন করতে পারে। তবে ​এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ইঞ্জিন। এটি একটি সাধারণ মোপেড বা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের মতো ছোট ফোর-সিলিন্ডার পিস্টন ইঞ্জিন দ্বারা চালিত। যদিও এটি বেশ শব্দ করে, কিন্তু এর রাডার সিগনেচার বা ‘রাডার ক্রস সেকশন’ অত্যন্ত কম। এটি প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম এবং এর নেভিগেশনে জিপিএস (GPS) ও আইএনএস (INS) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা একে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সাহায্য করে।

​ইরানি ড্রোন ওয়ারফেয়ারের অবিচ্ছেদ্য অংশ

​ইরান কেন শাহেদ-১৩৬-কে তাদের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে রাখল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ বা ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ (Asymmetric Warfare) কৌশলে। ইরানের শত্রুরা সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ইরান বুঝতে পেরেছিল, একটি বড় দামী মিসাইল বা বিমানের চেয়ে একসঙ্গে শত শত সস্তা ড্রোন দিয়ে আক্রমণ করলে শত্রু পক্ষ হিমশিম খাবে।

​শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। যেখানে এর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি পশ্চিমা ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের (যেমন- প্যাট্রিয়ট) খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলার। শত্রুপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে নিঃশেষ করে দেওয়া এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখার এই কৌশলই ইরানকে ড্রোন ওয়ারফেয়ারে শক্তিশালী করে তুলেছে।

​শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকারিতার রহস্য

​শাহেদ-১৩৬-এর কার্যকারিতার প্রধান কারণ এর ‘সোয়ার্ম অ্যাটাক’ (Swarm Attack) বা দলবদ্ধ আক্রমণ সক্ষমতা। ইরান এই ড্রোনগুলোকে একটি ট্রাকের পেছনে থাকা র‍্যাক থেকে সেকেন্ডের ব্যবধানে উৎক্ষেপণ করতে পারে। যখন ২০ থেকে ৩০টি ড্রোন একসঙ্গে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে যায়, তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেও সবগুলো ড্রোন খুঁজে বের করে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া এটি খুব নিচ দিয়ে উড়তে পারে (Low altitude flying), যার ফলে পাহাড় বা ভৌগোলিক গঠনের আড়ালে থেকে এটি রাডারকে ফাঁকি দেয়। এমনকি কিছু ড্রোন ধ্বংস হলেও, যদি দু-একটি ড্রোনও লক্ষ্যে আঘাত করতে পারে, তবে তা বিপুল ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করে।

​ব্যবহারিক সাফল্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

​শাহেদ-১৩৬-এর সক্ষমতা বিশ্ব প্রথম ব্যাপকভাবে অনুধাবন করে ইয়েমেন যুদ্ধে এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার সময়। তবে এটি বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ শুরুর পর।

রাশিয়া ইরানের কাছ থেকে এই ড্রোন সংগ্রহ করে এবং ‘গেরান-২’ (Geran-2) নামে এটি ব্যবহার শুরু করে। ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বেসামরিক স্থাপনায় এই ড্রোনগুলো ভয়াবহ তাণ্ডব চালায়। ​সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও এই ড্রোনের ব্যবহার দেখা গেছে। ইসরায়েল ও আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির মুখে ইরান তাদের শাহেদ ড্রোনের ঝাঁক পাঠিয়ে জানান দিয়েছে যে, তারা এখন দূরপাল্লার যুদ্ধের জন্য আর কেবল বড় ব্যালিস্টিক মিসাইলের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে এই ড্রোনের সাফল্য এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করতে দামী অস্ত্রের চেয়ে চতুর ও সস্তা অস্ত্র অনেক সময় বেশি কার্যকর।

​শাহেদ-১৩৬ কেবল একটি ড্রোন নয়, এটি সামরিক বিজ্ঞানের একটি নতুন দর্শনের নাম। এটি প্রমাণ করেছে যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তির জটিলতার ওপর নির্ভর করে না, বরং কার্যকর প্রয়োগ ও কৌশলগত দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করে। ইরানের এই উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এখন অনেক শক্তিশালী দেশও তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটে এই ধরনের কামিকাজে ড্রোন অন্তর্ভুক্ত করছে। শাহেদ-১৩৬ আগামী দিনের যুদ্ধক্ষেত্রে ‘লো-কস্ট, হাই-ইমপ্যাক্ট’ বা ‘স্বল্প খরচে উচ্চ প্রভাব বিস্তারকারী’ অস্ত্রের মডেল হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।

This post was viewed: 20

আরো পড়ুন