Skip to main content

Ridge Bangla

শহুরে স্ট্রিট ফুড ভ্লগিং: রুচির বিবর্তন নাকি সস্তা জনপ্রিয়তার আড়ালে স্বাস্থ্যঝুঁকি?

​রাজধানী ঢাকার টিএসসি, ধানমন্ডি ১৫ কিংবা খিলগাঁওয়ের কোনো একটি গলিতে এখন গেলে সাধারণ দৃশ্যের বাইরে একটি নতুন দৃশ্য চোখে পড়বে। একদল তরুণ-তরুণী হাতে ট্রাইপড আর স্মার্টফোন নিয়ে কোনো একটি ছোট দোকানের খাবারের রিভিউ দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, “বন্ধুরা, মাত্র ১০০ টাকায় আনলিমিটেড খাবার!” আবার কেউ খাবারের ওপর গলিত চিজের পাহাড় দেখিয়ে দর্শককে প্রলুব্ধ করছেন। বাংলাদেশের শহুরে জনজীবনে ‘স্ট্রিট ফুড ভ্লগিং’ এখন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই রঙিন ভিডিওর আড়ালে আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্য আসলে কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার সময় এসেছে।

​ভ্লগিং এবং খাবারের রুচির বিবর্তন

​এক সময় ঢাকার রাস্তার খাবার বলতে কেবল ফুচকা, চটপটি আর ঝালমুড়িকেই বোঝানো হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভ্লগারদের কল্যাণে স্ট্রিট ফুডের সংজ্ঞাই বদলে গেছে। এখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাওয়া যাচ্ছে মোমো, সুশি, কোরিয়ান রামেন কিংবা পেস্ট্রি কেক ও তিরামিসুসহ আরও অনেক খাবার, যেগুলো বেশিরভাগেরই উৎপত্তি বিদেশে। ভ্লগাররা শহরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট দোকানগুলোকে সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছেন। এর ফলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যেমন আলোর মুখ দেখছেন, তেমনি ভোজনরসিকদের সামনেও উন্মোচিত হয়েছে বৈচিত্র্যময় স্বাদের জগত। এই বিবর্তনটি ইতিবাচক, কারণ এটি আমাদের রন্ধনশিল্পকে বহুমুখী করেছে।

​সস্তা জনপ্রিয়তা ও অতিরঞ্জিত রিভিউ

​ফুড ভ্লগিংয়ের একটি বড় সংকট হলো ‘সস্তা জনপ্রিয়তা’ অর্জনের চেষ্টা। অনেক ভ্লগার খাবারের গুণগত মানের চেয়ে ভিডিওর ‘ভিউ’ বা দর্শক সংখ্যার দিকে বেশি নজর দেন। ফলে সাধারণ মানের কোনো খাবারকেও তারা ‘অসাধারণ’ বা ‘সেরা’ বলে প্রচার করেন। ভিডিওতে যখন দেখা যায় একজন ভ্লগার অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে খাবার খাচ্ছেন, দর্শকও তখন অবচেতন মনে সেই খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময়ই সেই রিভিউয়ের সাথে মেলে না। এই ধরণের ‘পেইড প্রমোশন’ বা অর্থ নিয়ে রিভিউ দেওয়ার সংস্কৃতি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং এক ধরণের কৃত্রিম খাবারের চাহিদা তৈরি করছে।

​চিজ ও সসের জোয়ার: স্বাস্থ্যঝুঁকির নেপথ্যে

​বর্তমান সময়ের স্ট্রিট ফুড ভ্লগগুলোতে একটি কমন বিষয় লক্ষ্য করা যায়- খাবারে অতিরিক্ত চিজ, মেয়োনিজ এবং সসের ব্যবহার। ভিডিওতে এই উপাদানের উপস্থিতি দেখতে খুব সুন্দর এবং মুখরোচক মনে হলেও, পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাস্তার ধারে সস্তায় পাওয়া এই চিজ বা মেয়োনিজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত নিম্নমানের উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট এবং লবণের এই কম্বিনেশন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্থূলতার অন্যতম কারণ। ভ্লগাররা যখন এগুলোকে ‘মুখরোচক’ হিসেবে প্রচার করেন, তখন তরুণ প্রজন্মও মনে করে যে অতিরিক্ত চিজ বা সস মানেই ভালো খাবার।

​পরিচ্ছন্নতা ও হাইজিন ফ্যাক্টর

​বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুডের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধি। খোলা রাস্তায় ধুলোবালির মধ্যে খাবার তৈরি করা, অপরিশোধিত পানির ব্যবহার এবং একই তেল বারবার ব্যবহার করা এখানে নিয়মিত চিত্র। ভিডিওতে সিনেমাটিক শট আর এডিটিংয়ের মাধ্যমে এই নেতিবাচক দিকগুলো ঢাকা পড়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, ভ্লগাররা যে গ্লাভসহীন হাতে বা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি করার দৃশ্য দেখান, তাতেই তারা উৎসাহ দিচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের খাবার টাইফয়েড, জন্ডিস এবং দীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়ার প্রধান উৎস।

​ভ্লগারদের নৈতিক দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা

​একজন ফুড ভ্লগার যখন একটি খাবারের ভিডিও আপলোড করেন, তখন হাজার হাজার মানুষ সেটি দেখে সেই খাবারটি গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত হন। তাই ভ্লগারদের ওপর একটি নৈতিক দায়িত্ব বর্তায়। কেবল স্বাদ নয়, বরং খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা এবং পুষ্টিগুণ সম্পর্কেও দর্শকদের সচেতন করা তাদের কর্তব্য। অনেক সময় দেখা যায়, ভ্লগাররা নিজেদের ‘লাইক’ বাড়ানোর নেশায় এমন সব চ্যালেঞ্জ করেন (যেমন- অতিরিক্ত ঝাল খাওয়া), যা সাধারণ মানুষের পাকস্থলীর জন্য মারাত্মক হতে পারে।

​ডিজিটাল বিপণন ও ভোক্তা অধিকার

​বাংলাদেশে বর্তমানে স্ট্রিট ফুড ভ্লগিং ডিজিটাল বিপণনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। রেস্টুরেন্ট মালিকরা তাদের প্রচারের জন্য ভ্লগারদের ব্যবহার করছেন। তবে এখানে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’-এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। বিভ্রান্তিকর তথ্য বা মিথ্যা রিভিউয়ের মাধ্যমে যদি কোনো ভোক্তাকে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণে প্ররোচিত করা হয়, তবে তার জন্য আইনি পদক্ষেপের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। দর্শকদেরও উচিত চোখ বুজে সব রিভিউ বিশ্বাস না করা এবং নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে খাবার নির্বাচন করা।

​স্ট্রিট ফুড ভ্লগিং আমাদের নাগরিক জীবনে বিনোদন ও নতুন স্বাদের খোঁজ দেয়- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রুচির এই বিবর্তন যেন আমাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। সস্তা জনপ্রিয়তার চেয়ে গুণগত মানকে প্রাধান্য দেওয়া এখন সময়ের দাবি। ভ্লগারদের উচিত তাদের ভিডিওতে সততা বজায় রাখা এবং দর্শকদের উচিত সচেতন হওয়া। রাস্তার ধারের সেই মুখরোচক খাবারটি যেন কেবল স্ক্রিনেই সুন্দর না থাকে, বরং পেটেও গিয়ে নিরাপদ থাকে- সেটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। সুস্থ জীবনের জন্য পরিমিতিবোধ এবং সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

This post was viewed: 28

আরো পড়ুন