Skip to main content

Ridge Bangla

রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল: একবিংশ শতাব্দীর ‘সাদা সোনা’ ও আগামীর বিশ্ব রাজনীতির চাবিকাঠি

​বিংশ শতাব্দী যদি হয় খনিজ তেলের যুগ, তবে একবিংশ শতাব্দী নিঃসন্দেহে ‘রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল’ বা দুষ্প্রাপ্য খনিজ উপাদানের যুগ। আমরা প্রতিদিন যেসব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করি- আমাদের পকেটে থাকা স্মার্টফোন, কানে থাকা ওয়্যারলেস ইয়ারফোন কিংবা পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি- এসবের প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে ১৭টি বিশেষ রাসায়নিক মৌলের মধ্যে। পিরিয়ডিক টেবিলের এই উপাদানগুলো আজ বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কেন এই ধাতুগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ? কেন এগুলোকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধের আবহ?

​রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল আসলে কী?

​নাম শুনে মনে হতে পারে এগুলো পৃথিবীতে খুব অল্প পরিমাণে আছে, কিন্তু ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। এই তালিকায় রয়েছে ১৫টি ল্যান্থানাইড সিরিজের মৌল (যেমন- নিওডিয়ামিয়াম, ল্যান্থানাম, সেরিয়াম) এবং এর সঙ্গে স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম। এগুলো আদতে সোনা বা রুপার মতো বিরল নয়, বরং ভূ-ত্বকের অনেক জায়গায় এদের পাওয়া যায়। তবে সমস্যা হলো, এগুলো সাধারণত আকরিকের মধ্যে অত্যন্ত পাতলা স্তরে এবং অন্যান্য খনিজের সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। এদের আলাদা করে বিশুদ্ধ অবস্থায় নিষ্কাশন করা অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণেই এদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘রেয়ার আর্থ’ বা দুষ্প্রাপ্য খনিজ।

​আধুনিক প্রযুক্তিতে এদের ভূমিকা

​রেয়ার আর্থ এলিমেন্টগুলোর (REE) বিশেষ চুম্বকীয়, অপটিক্যাল এবং লুমিনেসেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য কোনো ধাতু দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রায় অসম্ভব। একটি সাধারণ স্মার্টফোনে অন্তত ৮ থেকে ১০টি রেয়ার আর্থ উপাদান থাকে। এর ভাইব্রেশন মোটরের চুম্বক তৈরি হয় নিওডিয়ামিয়াম দিয়ে। স্ক্রিনের উজ্জ্বল রঙ তৈরি হয় ইউরোপিয়াম ও টার্বিয়াম দিয়ে। ফোনের স্পিকার ও মাইক্রোফোনেও ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী চুম্বক হিসেবে এদের ব্যবহার অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় বিশ্ব এখন ফসিল ফুয়েল ছেড়ে ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) এবং উইন্ড টারবাইনের দিকে ঝুঁকছে। একটি ইলেকট্রিক গাড়ির মোটরের জন্য শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক প্রয়োজন, যা নিওডিয়ামিয়াম এবং ডিসপ্রোসিয়াম ছাড়া তৈরি করা অসম্ভব। তেমনি বিশালকার উইন্ড টারবাইনগুলোর জেনারেটরেও প্রচুর পরিমাণে এই ধাতুগুলো ব্যবহৃত হয়।

​আধুনিক সমরাস্ত্রের মগজ বলা হয় এই ধাতুগুলোকে। যুদ্ধবিমানের জেট ইঞ্জিন, গাইডেড মিসাইল কন্ট্রোল সিস্টেম, লেজার রেঞ্জ ফাইন্ডার এবং নাইট ভিশন গগলসে রেয়ার আর্থ উপাদানগুলো অবিচ্ছেদ্য অংশ। উদাহরণস্বরূপ, একটি মার্কিন এফ-৩৫ ফাইটার জেটে প্রায় ৪২৭ কেজি রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল প্রয়োজন হয়। সুতরাং এই ধাতুগুলোর পর্যাপ্ত জোগান না থাকলে সামরিকভাবে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

​ভূ-রাজনীতি ও চীনের আধিপত্য

​বর্তমানে রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়ালের বিশ্ব বাজারে একক আধিপত্য বজায় রেখেছে চীন। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ রেয়ার আর্থ খনি চীনের দখলে থাকলেও, এর পরিশোধনের (Processing) প্রায় ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে তারা। ১৯৯০-এর দশকে চীনের অবিসংবাদিত নেতা দেং জিয়াওপিং বলেছিলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে তেল আছে, কিন্তু চীনের আছে রেয়ার আর্থ।” আজ তার সেই দূরদর্শী উক্তি বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

​যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের উচ্চ প্রযুক্তির জন্য চীনের ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাকে চীন প্রায়ই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ২০১০ সালে জাপানের সঙ্গে একটি দ্বীপাঞ্চল নিয়ে বিরোধের জেরে চীন রেয়ার আর্থ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল, যার ফলে বিশ্ববাজারে এই খনিজের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও চীন একই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে।

​পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ

​রেয়ার আর্থ আহরণ করা পরিবেশের জন্য এক বড় অভিশাপ। এক টন রেয়ার আর্থ উপাদান নিষ্কাশন করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য এবং তেজস্ক্রিয় থোরিয়াম উৎপন্ন হয়। পশ্চিমা দেশগুলো মূলত পরিবেশগত কড়াকড়ি এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে গত কয়েক দশকে তাদের খনিগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল, যার সুযোগ নিয়ে চীন এই শিল্পের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠে। এখন পরিবেশ রক্ষা করে কীভাবে এই খনিজ উত্তোলন করা যায়, তা বিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

​আগামীর পথ: বিকল্পের সন্ধান

​চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে এখন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত নতুন করে খনি উত্তোলনে বিনিয়োগ করছে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে (Deep Sea Mining) এবং এমনকি মহাকাশের গ্রহাণু (Asteroid Mining) থেকেও এই খনিজ সংগ্রহের কথা ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি পুরনো ইলেকট্রনিক্স পণ্য থেকে এই ধাতুগুলো ‘রিসাইকেল’ বা পুনরুৎপাদনের গবেষণাও চলছে জোরকদমে।

​রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল কেবল কতগুলো ধাতব মৌল নয়, এগুলো আধুনিক সভ্যতার মেরুদণ্ড। তেল যেমন গত শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, এই দুষ্প্রাপ্য খনিজগুলো আগামী শতাব্দীর বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করবে। যে দেশের হাতে এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তারাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ শক্তি এবং মহাকাশ গবেষণার দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। তাই রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল এখন আর কেবল রসায়নের বিষয় নয়, এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

This post was viewed: 38

আরো পড়ুন