‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামটি শুনলেই সোনালি চুলের ফর্মাল স্যুট পরা এমন এক ব্যক্তির অবয়ব ভেসে ওঠে, যিনি তার বিভিন্ন মন্তব্য ও কাজকর্মের দ্বারা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিতে ভালোবাসেন। তার কথা শুনলে অনেকের কপালে ভাঁজ পড়ে, আবার অনেকের মুখে ফোটে বিদ্রুপের হাসি।
কিন্তু তাকে অস্বীকার করা যায় না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। প্রথম মেয়াদের পর তাকে তিনি জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হন। অনেকেই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষটা দেখে ফেলেছিলেন তখন।
কিন্তু এরপর আবার দুর্দান্তভাবে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে ভিন্ন ধাঁচের এক ‘পাগলাটে’ মনে হওয়া কৌশল দিয়ে তিনি বিশ্ব মঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। আর এই কৌশলের মূলে রয়েছে সেই বহুল আলোচিত ‘ম্যাডম্যান থিওরি’।
‘ম্যাডম্যান থিওরি’ (Madman Theory) কোনো নতুন ধারণা নয়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এই তত্ত্ব ব্যবহার করেন। তার কৌশল ছিল সবার সামনে এমন এক ভাবমূর্তি তৈরি করা, যাতে তার বিরোধী পক্ষ মনে করে তিনি যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর ফলে প্রতিপক্ষের মনে ভয় ঢুকে যেত এবং তারা প্রেসিডেন্ট নিক্সনের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হতো।
ট্রাম্প আদতে সেই পুরনো থিওরিই নতুন মোড়কে, নিজস্ব শৈলীতে হাজির করেছেন। তিনি যা বলেন বা করেন, তা অনেক সময় এতটাই অপ্রত্যাশিত যে আন্তর্জাতিক মহলে সবাই হতবাক হয়ে যায়। তার হঠাৎ টুইট, মিত্রদের প্রতি আক্রমণাত্মক মন্তব্য, কিংবা প্রতিপক্ষকে অপ্রত্যাশিতভাবে তোষামোদ- এসবই তার ‘ম্যাডম্যান’ ভাবমূর্তির অংশ।
তবে এবারই প্রথম এই নীতি অবলম্বন করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প– এটি মনে করলে ভুল হবে। প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই তার এই কৌশল স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। সেই মেয়াদে তিনি উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করেন, যা একসময় অকল্পনীয় ছিল। তিনি একদিকে যেমন কিমকে ‘রকেট ম্যান’ বলে কটাক্ষ করেছেন, তেমনই আবার তার সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করে সবাইকে চমক লাগিয়ে দিয়েছেন।
অর্থাৎ যে বিষয়টি কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, সেটি তিনি করেছেন, অপ্রত্যাশিতভাবেই। তার এই পদক্ষেপগুলো কিমের মনে এমন এক ধারণা তৈরি করে থাকতে পারে যে ট্রাম্প সত্যিই যেকোনো কিছু করতে পারেন। কে জানে, হয়তো এই অনিশ্চয়তাই কিমকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছিল।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ জড়িয়ে পড়া কিংবা ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা- ট্রাম্পের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল একধরনের অনিশ্চয়তা আর চমকের মিশেল। প্রচলিত কূটনীতির যে ধারা, সেটার ধার ধারেননি। আন্তর্জাতিক চুক্তি, জোট বা প্রথাগত রীতিনীতিকে তিনি অনায়াসে অস্বীকার করেছেন। এতে এই জোট, চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসবের অংশীদারেরা বিব্রত হয়েছে।
জি-৭ সম্মেলন হোক বা ন্যাটোর বৈঠক, ট্রাম্পের আচরণ ছিল অনেকটাই অপ্রথাগত। তার এই আচরণ অনেক সময় মিত্রদের মধ্যে বিরক্তিও তৈরি করেছে। কিন্তু তা প্রতিপক্ষকে ঠিকই চিন্তায় ফেলে দিত। কারণ, তারা বুঝতে পারত না এরপর ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে যাচ্ছে। তাদের এই না-বোঝা বা অপ্রত্যাশিত আচরণের শঙ্কাটাই ট্রাম্পের শক্তি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই ম্যাডম্যান থিওরি কি সত্যিই কার্যকর? এর উত্তর বের করতে গেলে বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাপারটি দেখতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে এই কৌশল তাকে অপ্রত্যাশিত সফলতা এনে দিয়েছে। যেমন, উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসী পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছুটা হলেও লাগাম টানতে এই কৌশল হয়তো সহায়তা করেছে। আবার চীনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় আমেরিকাকে ভিন্ন অবস্থানে নিয়ে যেতেও এই কৌশল কাজ দিয়েছে।
একইসাথে এই কৌশলের বিপদও কম নয়। যখন একজন নেতাকে ‘পাগলাটে’ মনে হয়, তখন তার সিদ্ধান্তগুলো বিপজ্জনক বা অস্থির প্রকৃতির হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে আমেরিকাকে এখনও ‘অভিভাবক’ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এরকম একটি শক্তিশালী দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত আচরণ বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি করে। এতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও জটিল হওয়ার সুযোগ রয়েছে। মিত্র দেশগুলোর মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে, যা কৌশলগত দিক থেকে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বা ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার মতো সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
ট্রাম্পের প্রতিটি বিবৃতি, জনসভা, এমনকি প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ম্যাডম্যান থিওরি আসলে একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো। একদিকে এটি যেমন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অপ্রত্যাশিত ক্ষমতা ও প্রভাব এনে দিয়েছে, অন্যদিকে এটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঝুঁকিও তৈরি করেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের প্রভাবকে কেবল ‘পাগলামি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এর পেছনে রয়েছে এক সুচিন্তিত কৌশল, যদিও অপ্রথাগত, কৌশল যা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে বারবার। ভবিষ্যৎ বিশ্ব রাজনীতিতে এই ‘ম্যাডম্যান’ থিওরির প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
তথ্যসূত্র
১) How Trump is using the ‘Madman Theory’ to try to change the world (and it’s working)
২) Madman or Mad Genius? The International Benefits and Domestic Costs of the Madman Strategy
৩) Trump’s madman tactics and the psychology of bluffing