ঈদের আগে মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে একটি দ্রুতগতির বাসের ছাদ উড়ে যাওয়ার ঘটনা অনেককে বিস্মিত করেছিল। সেই ঘটনার পর থেকে সড়কে দুর্ঘটনার লাগামহীন প্রবাহ যেন আর থামছেই না। সর্বশেষ একটি যাত্রীবাহী বাসের পেছনে একটি ট্রাককে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় চারজন নিহত হন। এর আগেও মোটরসাইকেল আরোহী ও অ্যাম্বুলেন্স-বাস সংঘর্ষে বহু মূল্যবান প্রাণ ঝরে গেছে।
এই দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং সড়কে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব। উন্নত মানের অবকাঠামো থাকলেও চালক ও গণপরিবহনের মান সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
চার মাসে ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা বৃদ্ধি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় মহাসড়কে যেখানে ২০৯টি দুর্ঘটনা হয়েছিল, জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৬-এ। অর্থাৎ, মাত্র চার মাসে দুর্ঘটনার হার বেড়েছে ৪১.৬৩ শতাংশ।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে জাতীয় মহাসড়কে মোট ১,৩৯৭টি দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী:
জানুয়ারি: ২১৪টি
ফেব্রুয়ারি: ২০৯টি
মার্চ: ২২৮টি
এপ্রিল: ২১৩টি
মে: ২৩৭টি
জুন: ২৯৬টি
ফিটনেসবিহীন যান ও প্রশিক্ষণ ঘাটতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন হলেও তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা এবং দক্ষ চালকের অভাব রয়ে গেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, “মূল সমস্যা বিশৃঙ্খলা। অবৈধ ও অনুপযুক্ত যানবাহনের আধিক্য এই বিশৃঙ্খল অবস্থাকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।”
সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা তিন চাকার যানবাহনে
সেভ দ্য রোড-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ১৭,৯৫৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২,৭৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ১৭,৮২৬ জন। এর মধ্যে তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও অটোরিকশায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তিন চাকার যান দুর্ঘটনা: ৮,৮১২টি
নিহত: ৭৯৫ জন
আহত: ৮,৮১৫ জন
একই সময়ে ৩,৪০৪টি বাস দুর্ঘটনায় ৮২৫ জন এবং ৩,৭১৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৬৭৩ জন নিহত হয়েছেন।
আঞ্চলিক সড়কের ঝুঁকিও উদ্বেগজনক
জাতীয় মহাসড়কের বাইরেও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনক। গত ছয় মাসে আঞ্চলিক সড়কে রেকর্ড করা দুর্ঘটনার সংখ্যা ১,৪৮৫টি।
সর্বাধিক দুর্ঘটনা হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে—২৬৮টি
সর্বনিম্ন দুর্ঘটনা মে মাসে—২১৯টি
এই দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে রয়েছে অতিরিক্ত ছোট যানবাহনের চলাচল, তিন চাকার যানবাহনের অনিয়ম, যানবাহনের মানদণ্ড না মানা, ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং রাস্তার পাশে বাজার বসার প্রবণতা।
পাঁচ বছরে ৮০ শতাংশ বেড়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৮০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
২০২০ সালে মৃত্যু: ১,৪৬৩ জন
২০২৪ সালে মৃত্যু: ২,৬০৯ জন
একই সময়ে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ৬৩ শতাংশ বেড়ে ২৮ লাখ থেকে ৪৫ লাখে পৌঁছেছে। দ্রুতগতির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এই যানবাহন এখন সড়কে আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
নজরদারির অভাব ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, “মহাসড়কে এক ধরনের গতির প্রতিযোগিতা চলছে, কিন্তু সেটা নজরদারির আওতায় নেই। হাইওয়ে পুলিশ পর্যাপ্ত নয়, প্রযুক্তির ব্যবহারও দুর্বল।”
বর্তমানে ৩,০০০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক হাইওয়ে পুলিশের আওতায় থাকলেও বাকি ৬,০০০ কিলোমিটার প্রায় নজরদারিশূন্য। আঞ্চলিক সড়কের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়।
সমাধানে স্থানীয় সহায়তা ও সচেতনতা জরুরি
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (রোড সেফটি) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, “জাতীয় মহাসড়কের প্রতিটি অংশ কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা কঠিন। স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতাই দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর হতে পারে।”