Skip to main content

Ridge Bangla

ভিয়েতনামের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি: বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী

​বিশ্ব পোশাক বাজারের মানচিত্রে গত এক দশকে যে পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো, তার মধ্যে অন্যতম হলো ভিয়েতনামের বিস্ময়কর উত্থান। একসময় যা ছিল কেবল কৃষিপ্রধান দেশ, আজ তা বিশ্ব পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। ‘মেড ইন ভিয়েতনাম’ লেবেলটি এখন বিশ্বজুড়ে গুণগত মান এবং আধুনিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ভিয়েতনাম এখন আর কেবল প্রতিবেশী কোনো প্রতিযোগী নয়, বরং বিশ্ববাজারে রাজত্ব টিকিয়ে রাখার পথে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

​ভিয়েতনামের সফলতার নেপথ্যে

​ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক খাতের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কোনো জাদুর কাঠি নেই, আছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং সরকারি নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন। ভিয়েতনাম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে তাদের ‘ইভিএফটিএ’ (EVFTA) চুক্তি এবং ‘সিপিটিপিপি’ (CPTPP) এর মতো বড় জোটের সদস্য হওয়া তাদের রপ্তানিতে বিশাল শুল্ক সুবিধা এনে দিয়েছে। যেখানে বাংলাদেশকে অনেক দেশে শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করতে হয়, সেখানে ভিয়েতনাম শূন্য শুল্ক সুবিধার কারণে এগিয়ে থাকছে।

বাংলাদেশ যেখানে মূলত কটন বা তুলাজাতীয় সাধারণ পোশাক (যেমন: টি-শার্ট, ট্রাউজার) তৈরিতে মনোযোগী, ভিয়েতনাম সেখানে অনেক আগে থেকেই কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবার (MMF) এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের (যেমন: জ্যাকেট, স্যুট, খেলাধুলার পোশাক) দিকে ঝুঁকেছে। তাদের কারখানায় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ শ্রমশক্তি উৎপাদনশীলতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

​এছাড়া ভিয়েতনামের গার্মেন্টস খাতের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রিত হয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দ্বারা। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের মতো দেশগুলো ভিয়েতনামে বড় বড় কারখানা স্থাপন করেছে, যা তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

আরেকটি বড় কারণ হলো ভিয়েতনামের অবকাঠামো এবং বন্দর ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। চীন সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় কাঁচামাল আমদানিতে তারা সময় পায় কম। ফলে একজন ক্রেতার অর্ডার পাওয়ার পর তা সরবরাহ করতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম সময় বা ‘লিড টাইম’ নেয়।

​বাংলাদেশ বনাম ভিয়েতনাম: এক অসম লড়াই?

​বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ২০২০ সালে সাময়িকভাবে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে টপকে গিয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে বাংলাদেশ তার অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে, তবে প্রতিযোগিতার তীব্রতা কমেনি।

​বাংলাদেশের প্রধান শক্তি হলো এর বিশাল শ্রমশক্তি এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যয়। এছাড়া বাংলাদেশে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ‘সবুজ কারখানা’ (Green Factory) রয়েছে, যা পরিবেশ সচেতন ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে। তবে ভিয়েতনামের সাথে তুলনায় বাংলাদেশ কিছু জায়গায় পিছিয়ে আছে। আমাদের কাঁচামাল নির্ভরতা মূলত তুলা আমদানির ওপর, যেখানে বিশ্ববাজার এখন কৃত্রিম তন্তুর দিকে ঝুঁকছে। ভিয়েতনামের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ আসে উচ্চ মূল্যের জ্যাকেট ও পাদুকা (Footwear) থেকে, যেখানে বাংলাদেশ এখনও শুরুর দিকে রয়েছে।

​এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন: বাংলাদেশের সামনে নতুন সংকট

​২০২৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করবে। এর ফলে বর্তমানে পাওয়া অনেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সুবিধা ও কোটা সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সাথে সমান তালে প্রতিযোগিতা করা বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে। শুল্কমুক্ত সুবিধা না থাকলে পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা ক্রেতাদের ভিয়েতনাম বা ভারতের দিকে সরিয়ে নিতে পারে।

​টিকে থাকতে বাংলাদেশের করণীয়

​ভিয়েতনামের এই অগ্রযাত্রার মুখে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন। কেবল টি-শার্ট বা ডেনিমে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃত্রিম তন্তু (Polyester, Nylon) এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশনেবল পোশাক তৈরিতে জোর দিতে হবে। এর পাশাপাশি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগেই প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। নয়তো সামনে বিশাল সংকট অপেক্ষা করছে দেশের জন্য।

উপরের করণীয়গুলো পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। ​চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরের জট নিরসন করতে হবে যেন লিড টাইম কমিয়ে আনা যায়। অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি ​নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। চলতি বছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট বাংলাদেশের শিল্পকারখানাগুলোকে বেশ ভুগিয়েছে। সর্বশেষ, শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং কারখানায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে।

​ভিয়েতনামের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রতিযোগী নয়, বরং এটি একটি শিক্ষণীয় উদাহরণও বটে। তারা দেখিয়েছে কীভাবে সঠিক পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক সংযোগের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বিশ্ববাজার দখল করা যায়। বাংলাদেশ এখনও তৈরি পোশাক খাতে এক মহীরুহ, কিন্তু সময় এসেছে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারবে, অন্যথায় ভিয়েতনামের মতো চটপটে দেশগুলোর কাছে বাজার হারানো কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

This post was viewed: 22

আরো পড়ুন