Skip to main content

Ridge Bangla

বেগম খালেদা জিয়াকে কেন ‘আপোষহীন নেত্রী’ বলা হয়?

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে গত চার দশকে যে কজন ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা ছিল দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। তবে তাঁর নামের সঙ্গে একটি বিশেষ বিশেষণ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে- ‘আপোষহীন নেত্রী’। কোনো পদক বা রাষ্ট্রীয় উপাধি না হওয়া সত্ত্বেও এই বিশেষণটি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​কেন তাঁকে ‘আপোষহীন’ বলা হয়- সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আশির দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং অনমনীয় মনোভাবের মধ্যে।

​১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এক চরম সংকটে পড়ে বিএনপি। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া। তাঁর প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল আশির দশকের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যখন নানা বিভক্তি ও সুবিধাবাদী অবস্থান দেখা গিয়েছিল, খালেদা জিয়া তখন নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া নিয়ে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দোলাচল ছিল, তিনি তখন ‘স্বৈরাচারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার’ কঠিন সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এই দৃঢ় অবস্থানই তাঁকে প্রথমবার জনগণের কাছে ‘আপোষহীন’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

​১৯৮২ থেকে ১৯৯০- এই দীর্ঘ নয় বছর রাজপথে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। বারবার গৃহবন্দি হওয়া, জেল-জুলুম এবং জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি সামরিক সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আপোষ বা সমঝোতায় যাননি। ১৯৯০ সালের ৩ নভেম্বর যখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটগুলো একযোগে আন্দোলনের ঘোষণা দেয়, তখন খালেদা জিয়ার আপোষহীন মনোভাব আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তাঁর দাবি ছিল একটাই- স্বৈরাচারের পতন এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। শেষ পর্যন্ত তাঁর এই অনড় অবস্থানের জয় হয়।

​বেগম খালেদা জিয়ার অনুসারীদের মতে, তাঁর ‘আপোষহীনতা’ শুধু ক্ষমতা বা নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায়ও এটি প্রতিফলিত। ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি চুক্তি বা সীমান্ত সমস্যার মতো বিষয়গুলোতে তিনি সবসময় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক স্লোগান ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ মূলত তাঁর এই জাতীয়তাবাদী দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে তাঁর সমর্থকরা তাঁর চরিত্রের আপোষহীন বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন সময় ছিল ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (১/১১) আমল। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে সপরিবারে দেশ ছাড়ার জন্য ব্যাপক চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। অনেক রাজনৈতিক নেতা তখন বিদেশে পাড়ি দিলেও খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছিলেন, “বিদেশে আমার কোনো জায়গা নেই, এ দেশই আমার সব।” কারাগারে যাওয়া নিশ্চিত জেনেও তিনি দেশ ত্যাগ না করে আইনি লড়াই ও কারাবরণ বেছে নেন। চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার এই মানসিকতা তাঁকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে তাঁর সমর্থকদের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে কয়েক বছর ধরে ষড়যন্ত্রমূলক দুর্নীতি মামলার দায়ে তিনি কারাবরণ করেছেন এবং তাঁকে তাঁর চিরচেনা বাড়ি থেকেও অনৈতিকভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তাঁর অনুসারীদের দাবি, রাজনৈতিক সমঝোতা করলে তিনি অনেক আগেই মুক্ত হতে পারতেন, কিন্তু তিনি নিজের নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে মাথা নত করেননি। সরকারের দেওয়া বিভিন্ন শর্ত বা প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখা বা পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ না করার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাকেই মূলত ‘আপোষহীনতা’র চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

​একজন রাজনীতিবিদের মূল্যায়ন মহাকাল করে থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ভুল-ত্রুটি বা বিতর্ক থাকলেও, তাঁর অনমনীয় জেদ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাথা নত না করার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দিয়েছে। ব্যক্তিগত ক্ষতি, পারিবারিক ট্র্যাজেডি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথে তিনি যে ‘নো কম্প্রোমাইজ’ বা আপোষহীন মনোভাব দেখিয়েছেন, তা কেবল তাঁর দলের কর্মীদেরই নয়, বরং সমালোচকদেরও ভাবিয়ে তোলে। মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার সংক্ষিপ্ত পথ না খুঁজে, বন্ধুর পথে হেঁটে নিজের দাবিতে অনড় থাকাই তাঁকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

This post was viewed: 20

আরো পড়ুন