Skip to main content

Ridge Bangla

বিভক্ত সাইপ্রাস: তুর্কি ও গ্রীসের চলমান বিবাদের উৎস

ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী সাইপ্রাস সুপরিচিত এর উষ্ণ আবহাওয়া, বালুময় সৈকত আর সুস্বাদু খাবারের জন্য। মনোরম এই দ্বীপ হতে পারতো আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইপ্রাস নিয়ে দুই শক্তির দড়ি টানাটানি। বহু বছর ধরেই দক্ষিণ সাইপ্রাস নিয়ন্ত্রণ করছে গ্রীস আর উত্তর সাইপ্রাসে চলছে তুরস্কের শাসন। রাজধানী নিকোসিয়ার ঠিক মাঝ বরাবর চলে যাওয়া রেখা দুই অংশের সীমান্তস্থল, যেখানে শান্তি বজায় রাখে জাতিসংঘ।

পেছনের কথা

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ধারে অবস্থিত হওয়ায় সাইপ্রাস সবসময়ে বিভিন্ন শক্তির কাছে আকাঙ্ক্ষিত ছিল। আসিরিয়, মিশর, পারস্য, রোম, উসমানি সালতানাত এবং ব্রিটিশরাও কোনো না কোনো সময় এই দ্বীপে আধিপত্য বিস্তার করেছে। কালের পরিক্রমায় এখানকার নাগরিক বা সাইপ্রিয়টদের মধ্যে দুটি প্রধান জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল গ্রীক অভিবাসী, আর ছোট কিন্তু প্রভাবশালী  তুর্কি অভিবাসী দল। শতাব্দীর পর শতাব্দী শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করেছে তারা, কিন্তু ঊনবিংশ শতকে জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে সাথে চিড় ধরে এই সৌহার্দ্যে।

১৮৭৮ সালে যখন ব্রিটিশরা সাইপ্রাসের প্রশাসনিক দায়িত্ত্ব নেয় তখন দুই পক্ষের ফাটল প্রকাশ্য হয়। গ্রীক সাইপ্রিয়টদের সিংহভাগ গ্রীসের মূল ভূখণ্ডের অংশ হতে চাইত। স্বাভাবিকভাবেই তুর্কি সাইপ্রিয়টরা এতে রাজি ছিল না, তাদের ভয়- এর ফলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হবে। তারা চাইত হয় ব্রিটিশ শাসন অথবা জাতিগত পরিচয় অনুযায়ী সাইপ্রাসের বিভাজন।

বিংশ শতকের মধ্যভাগে গ্রিক সাইপ্রিয়টদের মধ্যে গ্রীসের সাথে একীভূত হওয়ার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ইওকেএ (EOKA) নামে একটি সশস্ত্র গেরিলা গ্রুপ গড়ে ওঠে যারা এই কারণ সামনে রেখে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। গেরিলাদের নেতৃত্বে ছিলেনব কর্নেল জর্জ গ্রিভাস (George Grivas), তাকে মদদ দিচ্ছিলেন সেখানকার আর্চবিশপ মাকারিওস (Makarios)। নিকোসিয়াতে বোমা হামলা থেকে শুরু করে সীমান্তবর্তী এলাকায় ঝটিকা আক্রমণ হেন কাজ নেই যা করেনি গেরিলারা। তুর্কি সাইপ্রিয়টরাও পরিণত হয় তাদের নিশানায়। প্রতিরোধের জন্য তারাও সশস্ত্র হয়, এবং সরকারি নিরাপত্তার জন্য দেনদরবার আরম্ভ করে।

১৯৬০ সালে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে সাইপ্রাস। নতুন সংবিধানে দুই পক্ষের মধ্যে সমতা বিধানের শর্ত রাখা হয়। গ্রীকদের থেকে প্রেসিডেন্ট এবং তুর্কিদের থেকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে, এবং প্রত্যেকের কাছেই ভেটো প্রদানের ক্ষমতা থাকবে। সরকারি পদ বন্টনেও আনুপাতিক ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে। তুরস্ক, গ্রীস, যুক্তরাজ্য আর সাইপ্রাস চার পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষর করে। সিদ্ধান্ত হয় সাইপ্রাসের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনে এরা হস্তক্ষেপ করতে পারবে।

মনোমালিন্যের সূচনা

সংবিধান লেখা যতটা সহজ, পালন করা ততটাই কঠিন। তিন বছরের মাথায় প্রেসিডেন্ট মাকারিওসের প্রস্তাবিত সংশোধন প্রস্তাব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় বচসা। তুর্কিরা সংসদ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। তীব্র উত্তেজনার মধ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতিতে ১৯৬৪ সালে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত হয় পরিস্থিতি।

কিন্ত ১৯৭৪ সালের জুলাইতে গ্রীস সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন মাকারিওস। উদ্দেশ্য ছিল গ্রীসের সাথে দ্বীপের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ। কিন্তু তুরস্ক এত সহজে নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি ছিল না। ১৯৬০ সালের চুক্তির দোহাই দিয়ে পাঁচ দিনের মাথায় তুর্কি সেনাবাহিনী অভিযান চালায়। ঝড়ের গতিতে সাইপ্রাসের ৩৭ শতাংশ এলাকা দখল করে নেয় তারা। সাইপ্রাস কার্যত ভাগ হয়ে যায় তুরস্কের ক্ষমতাধীন উত্তরাঞ্চল এবং গ্রীসের প্রতি অনুগত দক্ষিণাঞ্চলে। সংঘাতের ফলে প্রায় দুই লাখ গ্রীক এবং অর্ধ লাখ তুর্কি সাইপ্রিয়ট বাস্তুচ্যুত হয়।

১৯৮৩ সালে তুর্কি প্রজাতান্ত্রিক উত্তর সাইপ্রাস আত্মপ্রকাশ করে। তবে তুরস্ক ছাড়া প্রথমে আর কেউই তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল সাইপ্রাসের বিভক্তিকে ন্যায্যতা না দিয়ে অখণ্ড সাইপ্রাসকেই বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে।

ফলাফল

পশ্চিমাদের সমর্থনপুষ্ট দক্ষিণ সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে যুক্ত হয় সহজেই, ২০০৪ সালে তারা ইউরোপিয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যও হয়। ফলে তাদের অর্থনীতি আর অবকাঠামোর তরতর করে এগিয়ে চলে। মজার কথা হলো ইইউ কিন্তু দক্ষিণ সাইপ্রাস নয়, বরং সাইপ্রাসকে ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করেছে, কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলে তাদের আইনকানুন নিষিদ্ধ করে রাখা। ফলে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক অচলাবস্থা।

উত্তর সাইপ্রাসের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক ছিল তুরস্ক, ফলে তাদের উন্নয়ন ছিল অত্যন্ত ধীর। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেও পিছিয়ে পড়ে তারা। সামাজিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। একসময় যে গ্রীক আর তুর্কি সাইপ্রিয়টরা একত্রে বসবাস করত, এই ভাগাভাগি দুই সম্প্রদায়কে ঠেলে দেয় দুই মেরুতে। পারস্পরিক সহমর্মিতা পাল্টে যায় নিরর্থক হিংসা-বিদ্বেষে।

শান্তির চেষ্টা

দ্বিখণ্ডিত সাইপ্রাস জিইয়ে রেখেছে গ্রীস আর তুরস্ক। তাদের মধ্যে মিটমাট করতে ১৯৭৪ সাল থেকে আজ অবধি বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপিয় ইউনিয়ন ইত্যাদি সংস্থা চেষ্টার ত্রুটি করেনি। ২০০৪ সালে তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কোফি আনান দুই অংশের মধ্যে একটি ফেডারেশন প্রস্তাব করেছিলেন। তুর্কি অংশ সেটা মেনে নিলেও গ্রীক সাইপ্রাস প্রত্যাখ্যান করে।

দুই পক্ষের মধ্যে মন কষাকষির অন্যতম অনুষঙ্গ জমিজমা। বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষের সয়সম্পত্তির নিষ্পত্তি আদালতের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক থেকে উত্তর সাইপ্রাসের নতুন অভিবাসনের স্রোতও গ্রীক সাইপ্রাসের জন্য উপাদেয় বিষয় নয়।

তবে এত কিছুর মধ্যেও আশার আলো নিভে যায়নি। ২০০৩ সাল থেকে দুই অংশ পরপ্সরের নাগরিকদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ হয়তো একসময় রাজনীতিবিদদেরও মনোভাব পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারে। তবে এই মুহূর্তে গ্রীস ও তুরস্ক উভয়েই ভূরাজনৈতিক কারণে সমঝোতায় আগ্রহী নয়।

জাতিসংঘ এখনো দুই অংশের মধ্যে ফেডারেশনকেই সেরা সমাধান মনে করে। এর বাইরে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমঝোতার কথাও আলাপ হয়েছে। একটা বড় অংশ অবশ্য মনে করেন বর্তমান বিভক্তি চলমান থাকবে যতোক্ষণ অবধি কোনো পরাশক্তির স্বার্থহানি না হয়।

This post was viewed: 22

আরো পড়ুন