Skip to main content

Ridge Bangla

জুয়ার নেশায় নিঃস্ব মানুষ, নিয়ন্ত্রণে হিমশিম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর

দেশজুড়ে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। জুয়া নামের এই মহামারিতে আসক্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন সাধারণ চাকরিজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশেষজ্ঞরা একে নীরব সামাজিক মহামারি বলে অভিহিত করছেন, যা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে তরুণ-তরুণী, দোকানি, দিনমজুর, কৃষক এমনকি সচ্ছল শ্রেণির মানুষও যুক্ত হচ্ছেন এই অনলাইন জুয়ায়। খেলার মাঠ, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাসা-বাড়ি—সব জায়গায় চলছে অনলাইন বেটিং। এতে ভেঙে যাচ্ছে পরিবার, বাড়ছে সামাজিক অশান্তি ও কলহ।

কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী ইসহাক মুন্সির সঙ্গে, যার জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে এক ফেসবুক বিজ্ঞাপনের সূত্রে। ফেসবুকে ‘বাবু ৮৮৮’ নামের অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন দেখে তিনি প্রথমে ১ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে মুহূর্তেই জিতে যান ২৫ হাজার টাকা। এরপর থেকেই ক্রমান্বয়ে আসক্তি বাড়তে থাকে।

মাস খানেকের মধ্যেই ভিটেমাটি বন্ধক রেখে ১৮ লাখ টাকা হারান তিনি। পরে ধারদেনা করেন আরও ৯ লাখ। বর্তমানে ঋণের ভারে চাকরি ও স্বাভাবিক জীবন দুটোই হারিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গাইবান্ধার রতন চন্দ্র দেবনাথের পরিণতি আরও ভয়াবহ—ছোট পানের দোকান চালিয়ে সংসার চালালেও অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।

ডিবি ও সিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, এসব অনলাইন জুয়ার সাইট মূলত যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, চীন, দুবাই ও রাশিয়া থেকে পরিচালিত হয়। স্থানীয় ধনাঢ্য গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক বেটিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তি করে সাব-এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালায়।

বেটিং সাইটের নিজস্ব লেনদেন ও এজেন্ট নিয়োগের জন্য ‘পে-কিসমা’ নামে পরিচিত এক চক্র রয়েছে। এই চক্র মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা আদান-প্রদান করে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কিছু এজেন্ট ধরা পড়লেও মূল হোতারা দেশের বাইরে থাকায় অধরাই রয়ে গেছে।

সিটিটিসির এক মামলার তদন্তে দেখা গেছে, বহু বাংলাদেশি জুয়া হোতা বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করে বেটিং সাইট পরিচালনা করছে। তারা রেডিটিম নামক অ্যাপের মাধ্যমে দেশের এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে অনেকে বিদেশে পালিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে প্রধান বাধা হচ্ছে ভুক্তভোগীদের নীরবতা। যারা জুয়ায় অংশ নেন, তারাও অপরাধী। তাই নিজস্ব এই অপরাধভীতির কারণে কেউ মামলা করতে চান না, ফলে প্রমাণ সংগ্রহ ও ব্যবস্থা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়া মূল সার্ভার বিদেশে হওয়ায় আইনগত পদক্ষেপও সীমিত। অনেক এজেন্ট ভুয়া নামে সিম ও মোবাইল ব্যাংকিং রেজিস্ট্রেশন করে ব্যবসায়িক আয়ের আড়ালে জুয়া পরিচালনা করছেন। কিছু ক্ষেত্রে সেলিব্রেটিদের বেটিং সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়াও মানুষকে প্রলুব্ধ করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীদের ধরার সীমাবদ্ধতা ও সহজ অর্থের প্রলোভনে জুয়ার আসক্তি বাড়ছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, জুয়া একদিকে অপরাধ, অন্যদিকে মানসিক রোগ। পরিবারগুলোর উচিত আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা করানো।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, শুধু আইন প্রয়োগে জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়; এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, বিটিআরসির সহযোগিতায় জুয়ার সাইট বন্ধ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

This post was viewed: 74

আরো পড়ুন